মাইদুল রাসেল

২১ জুলাই, ২০১৫ ২০:২৫

সুনামগঞ্জে বেড়ে চলেছে বখাটেদের দৌরাত্ম্য : ইভটিজিংয়ে জর্জরিত মেয়েরা

সুনামগঞ্জে দিন দিন বেড়েই চলেছে বখাটেদের দৌরাত্ম্য। প্রতিদিন শহরের ১০টি পয়েন্টে স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রীরা ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি বখাটেপনার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। কিছুদিন আগে একটি বেসরকারি সংস্থার ভারতীয় এক নারী শহরের ওয়াবদা রোডে বখাটেপনার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় কঠোর অবস্থানে এখন পুলিশ।

শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে মটরসাইকেল নিয়ে দলবেধে ইভটিজিংয় করত বখাটেরা। এই বখাটপেনা রোধে ঈদের দিন থেকে পুলিশ শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে রেজিষ্ট্রেশন বিহিন মোটর বাইকের বিরোদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। এতে আটক করা হয় প্রায় ৩০ টি মোটরবাইক। আর মামলা দেয়া হয়েছে আরো ৬০ জনের বিরোদ্ধে। বিভিন্ন স্থানে সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ নিজে উপস্থিত থেকে অভিজান পরিচালনা করতে দেখা গেছে। এদিকে পুলিশের একটি সূত্রের দাবি আটক ও মামলা দেয়া মোটর বাইকের মালিক অধিকাংশই সরকার দলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা কর্মী।

কয়েক মাসে বখাটেপনা ও ইভটিজিংয়ের অভিজোগে এখন পর্যন্ত ৬টি মামলা হয়েছে। পুলিশ ৪ জনকে আটক ও করেছে। তবে লোকলজ্ব্যা ও পরবর্তীতে হয়রানির ভয়ে অনেকে অভিযযোগ না করে নীরবে সয়ে যাচ্ছেন এসব ঘটনা।

সম্প্রতি সুনামগঞ্জে আশংকাজনক ভাবে বেড়েছে ইভটিজিং ও বখাটেপনা। শহরের ১০টি পয়েন্টে এই ঈভটিজিং হয় সবচেয়ে বেশি। স্কুল কলেজের মেয়েরা ছারাও অনেক অভিবাবকও এর শিকার হচ্ছেন। এ ব্যাপারে পুলিশ বলছে যেযে এলাকায় ঈভটিজিং হচ্ছে সেখানে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। ঈভটিজাররা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে ছদ্দবেশে আবারও একই কাজ করছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই সমাজের চোখে ভদ্র লোকের সন্তান।

ভুক্তভোগী পরিবার, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, পৌর শহরের নবীনগর পয়েন্ট, আলীপাড়া পয়েন্ট, হাসপাতাল পয়েন্ট, বিহারি পয়েন্ট, হোসেন বখত চত্বর, ষোলঘর ওয়াবদা রোড, বৈঠাখালি খেয়াঘাট, চান্দিঘাট, শিল্পকলা একাডেমি রোড, বাধনপাড়া মহিলা কলেজ রোড হয়ে স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছাত্রীরা নিয়মিত যাতায়াত করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও কোচিংয়ে আসা যাওয়ার সময় ছাত্রীদের টিজিং করা হয়। এসব ঘটনায় বখাটেদের পরিবারে বিচার দেওয়ার পর ছাত্রীদের পরিবার আরো হয়রানির মুখে পড়ছেন। ষোলঘর ওয়াবদা রোডে গত ২০ দিন আগে একটি বেসরকারি দাতা সংস্থার এক ভারতীয় নারী প্রতিনিধি একটি কটেজে থাকার সময় ঈভটিজিংয়ের শিকার হয়েছেন। এর আগে ওই রোডে একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে এবং ইউরোপ ফেরত স্থানীয় এক তরুণিও বখাটেপনার শিকার হন।

বখাটেপনার শিকার হয়ে গত ১৩ জুলাই পৌর শহরের বলাকা আবাসিক এলাকার এক অভিভাবক তার কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে উত্যক্ত করা ও মেয়েকে না পেয়ে তাকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকির অভিযোগে থানায় মামলা করেছেন। মামলা সূত্রে জানাগেছে, মেয়েটি এবার সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। কলেজে আসা যাওয়ার সময় প্রায়ই তাকে উত্যক্ত করত পৌর শহরের আরপিননগর এলাকার মৃত রফিক মিয়ার ছেলে নাঈম (২২)।

গত ১৩ জুন মেয়েটি সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়ে বাসায় যাওয়ার পথে বলাকাপাড়া মসজিদের পাশে পথ আটকিয়ে নাঈম তার শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে। পরে লোকজন আসতে দেখে সে চলে যায়। এ অবস্থায় পরীক্ষা শেষে মেয়েটিকে সিলেটে পাঠিয়ে দেয় পরিবার। কিন্তু নাঈম এলাকায় গিয়ে মেয়েটির খোঁজ করতে থাকে। মেয়েটির বাবা জানান গত ১২ জুলাই রাত ১১টার দিকে আরও তিনজনকে সাথে নিয়ে নাঈম তাঁর বাসায় এসে ডাকাডাকি করে তার মেয়ে কোথায় জানতে চায়। এ সময় তিনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নাঈম এক পর্যায়ের তার সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে লিপ্ত হয়। পরে এ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাঁকে গুলি করার হুমকি দেয়। বিষয়টি রাতেই পুলিশকে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে তার বাসায় যায়। পুলিশ উপস্থিত থাকা অবস্থায়ও আবার নাঈম ফোন করে তাঁকে হুমকি দেয়।

মেয়েটির বাবা বলেন,“আমি তাদের বুঝিয়েও শান্ত করতে পারিনি। এক পর্যায়ে নাঈম আমাকে গুলি করবে বলে হুমকি দেয়। আমাকে গুলি করলে নাকি সুনামগঞ্জে তাকে কেউ কিছু করতে পারবে না”।

এর আগে গত ৪ জুলাই শহরের নতুনপাড়া এলাকায় প্রাইভেট পড়া শেষে বাসায় ফেরার সময় বখাটেরা দুই কলেজ ছাত্রীকে রাস্তা আটকিয়ে বলে “এক তাকি দশ পর্যন্ত গনমু এরমাঝে কবুল ক’, ভালাবাসি ক, না অয় চাক্কু তর পেটের মাঝে ডুকাই দিমু”। তখন উত্যক্ত হওয়া মেয়েটি স্কেল দিয়ে বখাটের হাতে আঘাত করলে হাত থেকে চাকু পড়ে যায়। এতে দুই বখাটে আরো ক্ষীপ্ত হয়ে মেয়েদের উড়না, হাতের ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টানা হেঁছড়া করে এবং ওড়না ও ব্যাগ ছিড়ে ফেলে। সেদিন রাতেই এ ব্যাপারে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ঐ দুই কলেজ ছাত্রীর বাবা।

লিখিত অভিযোগে মোক্তার পাড়া আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সিকন্দর মিয়ার ছেলে জয় (২১) এবং একই এলাকার আব্দুসালামের ছেলে রাজ (২৫) এবং আরো কয়েক জনকে আসামী করা হয়েছে।
বখাটেপনার এসব ঘটনায় অনেক অভিভাবকই এখন আতঙ্কিত। কোনন কোন অভিবাবক নিজেই মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছেন। আবার কেউবা স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে বাসায়ই পড়াচ্ছেন। শহরের হোসেন বখত চত্তর, ষোলঘর ওয়াবদা রোড, শিল্পকলা একাডেমি রোড, বাধনপাড়া মহিলা কলেজ রোডেই স্কুল কলেজের মেয়েরা বখাটেপনার শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এ রাস্তাগুলো শর্টওয়ে হিসেবে বেশি ব্যবহার করে শিক্ষার্থিরা।

সরকারি কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিগ্রির ছাত্রী বলে, প্রতিদিন সকালে আমি পড়তে যাই, যেখানে একটু নির্জন জায়গা থাকে, সেখানেই কোন না কোন বখাটে দাঁড়ানো থাকে এবং অশ্লিল মন্তব্য করে। সুযোগ পেলে অশ্লিল কথাবার্তা লিখা কাগজ ছুঁড়ে দেয়। নতুনপাড়া থেকে হাসননগর যেতে কয়েকবার এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।

নবম শ্রেনীর এক শিক্ষার্থীর পিতা মইনুল হোসেন বলেন, শহরে উভটিজিং ভয়ানক ভাবে বেড়েছে। নিজের মেয়েকে নিয়ে স্কুল থেকে আসা যাওয়ার সময় যে মন্তব্য শুনি খুব বিব্রত অবস্থায় পড়তে হয়।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, আমরা বখাটেপনা ঠেকানোর জন্য নানা কৌশল গ্রহণ করেছি। গত দুদিনে প্রায় প্রতিটি মোড়ে পুলিশ বখাটেপনা রোধে মোটরবাইক নিয়ন্ত্রনে অভিজান করা হয়েছে। এতে প্রায় ৬০টি মামলা দেয়া হয়েছে। আটক করা হয়েছে ২১টি মোটর বাইক। এটি নিয়মিত চলবে থাকবে। যেখানেই এমন কিছু চোখে পড়বে সাথে সাথে পুলিশ সুপারকে জানানোর জন্য সবার প্রতি অনুরোধ করেছেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত