মঙ্গলবার, , ২৬ মার্চ ২০১৯ ইং

এন এন তরুণ

১১ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৬:৪২

সাংবাদিকের সাথে ড. কামাল হোসেনের অসদাচরণ ও আমাদের বিতর্ক-জ্ঞান

বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ড. কামাল হোসেনের আন্তরিকতা নিয়ে বা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আনুগত্য নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন করেন, সন্দেহ প্রকাশ করেন, তাঁরা ভুল করেন। এ বিষয়টি দি এশিয়ান এজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ বদরুল আহসান ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ ঢাকা ট্রিবিউনে তাঁর ‘দি ডার্টি ওয়ার এগেন্‌স্‌ট কামাল হোসেন’ শীর্ষক কলামে পরিষ্কার করেছেন। তথ্য-প্রমাণসহ তিনি জানাচ্ছেন যে, বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালিতে, কামাল হোসেন তখন একই দেশের হরিপুরে— দু’জনেই অন্তরীন।

সৈয়দ বদরুল আহসানের ঐ কলামে আরও উল্লেখ আছে যে, পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে পৌঁছে ১৯৭২-এর ০৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যে সংবাদ সম্মেলন করেন, সেখানে তিনি জানিয়েছিলেন যে, ১৯৭১-এ মিয়ানওয়ালিতে গঠিত গোপন ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য সামরিক জান্তা কামাল হোসেনের উপর তীব্র চাপ প্রয়োগ করেছিল; কিন্তু কামাল তা করতে অস্বীকার করেন। সৈয়দ বদরুল এ-ও জানাচ্ছেন যে, মুক্তি পেয়েই বঙ্গবন্ধু ভুট্টো সরকারের কাছে দাবি জানান তাঁর সংবিধান বিষয়ক উপদেষ্টাকে অর্থাৎ ড. কামাল হোসেনকে তাঁর সামনে হাজির করার জন্য।

বঙ্গবন্ধু হত্যার দুই মাস আগে একটা বিদেশি সংস্থায় চাকুরি নিয়ে ড. কামাল হোসেন ‘দেশের বাইরে চলে যান’ বলে যখন তাঁর বিরুদ্ধে সন্দেহের তীর নিক্ষেপের চেষ্টা করা হয়, তখন সৈয়দ বদরুল আহসান আমাদের জানান যে, বঙ্গবন্ধুর অনুমতি নিয়েই কামাল হোসেন মন্ত্রীর পদ থেকে ছুটি নিয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে একটা গবেষণার কাজ করার জন্য যান। এই সময়কালে বঙ্গবন্ধু ড. হোসেনের জায়গায় নতুন কোন মন্ত্রী নিয়োগ দেন নি। ১৯৭৫-এর জুলাই মাসে বঙ্গবন্ধু কামাল হোসেনকে ফিরে আসতে বললে, তিনি ফিরে এসে স্বপদে যোগ দেন এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক ইউরোপ সফরে যান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দিন তিনি যুগোস্লাভিয়া সফরে ছিলেন।

ড. কামাল হোসেনের রাজনীতির বা তাঁর কোন কর্মকাণ্ডের বা অসদাচরণের সমালোচনা করার জন্য, বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা নিয়ে ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ করা অন্যায়। এ কথা সত্যি যে, ড. কামাল হোসেন কোনদিনই বিএনপির রাজনীতিকে সমর্থন করেন নি। ১৯৮১ সালে তিনি যখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন, তখন বিএনপি ভোট ডাকাতি করেই তাঁকে হারিয়েছিল বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। একান্ত আলাপচারিতায় বিএনপি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বিএনপিকে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করার পরিবর্তে এটাকে একটা প্লাটফর্ম হিসেবে গণ্য করা বেশি সমীচীন মনে করতেন, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ এসে জমায়েত হয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রদত্ত সংজ্ঞার আলোকে তিনি বলতেন, ‘একটা রাজনৈতিক দলের একটা অখণ্ড রাজনৈতিক দর্শন থাকতে হয়, না হলে এটাকে রাজনৈতিক দলই বলা যায় না।’ এ রকম মনোভাব যাঁর এক সময় ছিল, সেই তিনি এখন যখন বিএনপিকে নিয়ে জোট করেন, জোটের প্রতীক হিসেবে বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষকে বেছে নেন এবং যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বা সাকা চৌধুরীর ছেলেকে ধানের শীষে নির্বাচন করার সুযোগ করে দেন, কেয়ারটেকার সরকারের দেয়া দুর্নীতির মামলায় দীর্ঘ দিন ধরে চলা শুনানির পরে সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার জেলমুক্তি তাঁর আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে সামনে আনেন, তখন জন-মানসে খটকা লাগে বৈকি, তাঁর রাজনৈতিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় বৈকি।

একজন বিশুদ্ধ পুঁজিবাদীর একটা উন্নত আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের যে প্রত্যয় থাকে, যে বুর্জোয়া উদারতার কথা তত্ত্বে উল্লেখ করা হয় তা, ড. কামাল হোসেনের মধ্যে আছে বলে বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে। একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নির্মাণে তাঁর আন্তরিকতাও সর্বজনবিদিত। কিন্তু বিএনপি ও নিবন্ধন বাতিল হওয়া দল জামায়াতের সদস্যদের নিয়ে তিনি যখন যৌথ নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করেন, তখন ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাঁর আন্তরিকতা যৌক্তিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় কারণ এই দল দু’টি কাগজে কলমেই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে না।

যে জামায়াত, যে যুদ্ধাপরাধী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে, বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে, তাঁদেরকে তাঁর রাজনীতিতে যুক্ত করা প্রসঙ্গে, তাদেরকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয় বরং এ রকম প্রশ্নের সম্মুখীন তাঁকে তো হতেই হবে কারণ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সমাধিতে ফুল দিতে আসা ও তাঁর বর্তমান রাজনীতি পরিষ্কারভাবেই পরস্পর-বিরোধী। এ রকম প্রশ্ন তাঁর জন্য খুবই বিব্রতকর বটে কারণ তাঁর এ কাজটি লজ্জাজনক।

একজন রাজনীতিক, যিনি মানুষের জন্য রাজনীতি করেন, তাঁকে সাংবাদিক তো বটেই, দেশের যে কোন নাগরিক যে কোন প্রশ্ন করার অধিকার রাখেন। সে প্রশ্ন যতই বিব্রতকর হোক না কেন, সে প্রশ্নের জবাব দেয়া তাঁর কর্তব্য। একান্তই তিনি যদি উত্তর দিতে না চান, তাহলে তাঁকে কৌশলে তা এড়িয়ে যেতে হবে। যখন কোন রাজনীতিক কোন বিব্রতকর প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চান বা কোন তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে চান, তখন পত্রিকায় খবর আসে ‘তিনি মুখ খোলেন নি’ অথবা ইংরেজিতে ‘হি/শী ওয়াজ টাইট-লিপ্‌ড’।

‘ওয়াটার গেইট’ কেলেঙ্কারি বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট নিক্সন, চীন-ভারত যুদ্ধকালীন সময়ে চীন থেকে চৌয়েন লাইয়ের ভারত সফর প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলেও নেহেরু এভাবে টাইট-লিপ্‌ড ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক বার টাইট-লিপ্‌ড থেকেছেন। এঁরা কেউই সাংবাদিকদের সাথে অসদাচরণ করেন নি।

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের সাথে যে আচরণ ড. কামাল হোসেন করেছেন, যে সব বাক্য ব্যবহার করেছেন, যেভাবে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, ‘কার টাকা খেয়ে এ রকম প্রশ্ন করছ?’ বলে তাঁদেরকে যেভাবে অপমান করেছেন, কিছুতেই তিনি তা করতে পারেন না।

আমরা দেখছি, সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পত্র-পত্রিকায় অনেকেই ড. কামাল হোসেনের এ আচরণ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তাঁরা বলছেন, ‘এ এরকম প্রশ্ন শেখ হাসিনাকে কোন সাংবাদিক করার সাহসই কখনও পাবে না। যদি কেউ করে, তাহলে তাঁর সাথে হাসিনা এর চেয়েও বেশি খারাপ আচরণ করবে বা ঐ সাংবাদিকের বিপদ হবে।’। এ রকম মন্তব্যে বিতর্কের সাধারণ নিয়ম ভেঙে পড়ে কারণ এখানে প্রতিপাদ্য হল, ড. কামালের আচরণ সঠিক ছিল কিনা। এটা বিচার করতে অন্য একজনের কাছে এ রকম প্রশ্ন করলে তিনি কী করেছিলেন বা কী করতেন- তার অবতারণা করার মধ্যে ড. কামাল হোসেনের এ আচরণের প্রতি সমর্থন প্রকাশ পায় এবং এটাও প্রকাশ পায় যে, এ আচরণকে সঠিক প্রমাণের জন্য কোন যুক্তি তাঁর কাছে নেই বলেই তিনি আরেকজন এ পরিস্থিতিতে কী করেছেন বা করতেন- তার অবতারণা করছেন।

ড. কামাল হোসেনের এ আচরণ বিচার করতে হবে সর্ব-জন গৃহীত, রাজনীতিতে ও সাংবাদিকতায় প্রতিষ্ঠিত যে ইউনিভার্সাল নর্ম বা ফ্রেইমওয়ার্ক- তার ভিত্তিতে, অন্য কারও সাথে তুলনা করে নয়। শেখ হাসিনা যদি এ রকম আচরণ করেন, তাহলে তারও সমালোচনা করতে হবে আলাদা একটা ঘটনা হিসেবে — ড. কামাল হোসেনের সাথে বা অন্য কারও সাথে তুলনা করে নয়।

মনে রাখতে হবে, মানুষ রক্ত-মাংসে তৈরি। এই মানুষের ভুল-ত্রুটি হতে পারে, মতিভ্রম হতে পারে, পদস্খলন হতে পারে, চিন্তায়-দর্শনে বাঁক পরিবর্তন ঘটতে পারে। ‘অমুকে ভাল মানুষ’, ‘অমুকে ঋষিতুল্য’, ‘অমুকে জঘন্য’- এ রকম পূর্ব-ধারণা বা প্রি-কন্‌সিভ্‌ড আইডিয়া জ্ঞানচর্চার ও সত্য অনুসন্ধানের পথে বিরাট বাধা। আমাদেরকে এ বাধা অতিক্রম করতে হবে। একই মানুষের কিছু ভাল কাজ থাকতে পারে, কিছু খারাপ কাজ থাকবে। একই ব্যক্তির ভাল কাজের প্রশংসা করতে হবে, আবার তাঁর খারাপ কাজের সমালোচনাও করতে হবে। নাহলে, খারাপ কাজ উৎসাহিত হবে এবং ভাল কাজ নিরুৎসাহিত হবে। তবে, সমাজে বিতর্ক চলতে দিতে হবে। সবাইকে সবার কথা বলতে দিতে হবে কারণ বিতর্ক মানুষের মেধাকে শাণিত করে, সমাজে গতির সঞ্চার করে আর এই গতিই সমাজকে, দেশকে ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতার নিয়মে প্রগতির দিকে নিয়ে যাবে।

  • এন এন তরুণ: অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত