মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯ ইং

রিপন দে

১১ এপ্রিল, ২০১৯ ১৫:৫৮

পোশাকের দোষ নাই পুরুষ, নুসরাতকে দেখো

প্রতিটি ধর্ষণের বা নারী নিপীড়নের পর একটি পক্ষ আদাজল খেয়ে মাঠে নামে ধর্ষকের পক্ষে। ধর্ষককে আড়াল করতে বা অবচেতনভাবে ধর্ষক আড়াল হয়ে যায় তাদের প্রচারে। প্রচারটাও খুব ব্যতিক্রম ঘটনার পরপর ভিকটিমের ফেসবুক টাইমলাইন ঘেঁটে বা অন্য মাধ্যমে তার ২/১ টা ছবি নিয়ে প্রচার শুরু হয় এমনভাবে যেন ধর্ষণের জন্য মেয়েটি দায়ী। মেয়েটি পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয় যেহেতু সে বোরখা পরেনি তাই ধর্ষণ সে হতেই পারে। বাস্তবিকভাবে এই যুক্তিকে অজ্ঞতা আর মূর্খতার প্রতীক মনে হলে বর্তমানে তা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে অবজ্ঞা করার উপায় নেই। অনেক শিক্ষিত মানুষজন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বড় একটা অংশ এই পক্ষে। এবং মাঝে মাঝে এমন দেখা যায় যে মেয়েদের একটি পক্ষও তাদের পক্ষে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্য দেয় "গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না"। "গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" বলতে এখানে বুঝানো হয়েছে যারা বিভিন্ন পাবলিক বাসে বা অন্য জায়গায় গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর সুযোগ নিয়ে মেয়েদেরকে যৌন নিপীড়ন করতে তারা যেন গা ঘেঁষে না দাঁড়ায়। পাবলিক বাসে বা বিভিন্ন জায়গায় সুযোগ পেলেই কিছু যৌন বিকৃত মানুষের হাত চলে যায় মেয়েদের দিকে। ভিড়ের মধ্য মেয়েদের গায়ে একটু হাত দিতে পারলেই যেন সুখ অনুভব করে।

পাবলিক বাসে মেয়েদেরকে যৌন নিপীড়নের ঘটনা বারবার গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এর পক্ষে ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে। ২০১৮ সালে ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির 'নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক' শীর্ষক এক গবেষণায় যে তথ্য উঠে এসেছে তা এতটাই ভয়াবহ, যা কোন সভ্য দেশে কল্পনাও করা যায়না। তাদের দেওয়া তথ্য মতে দেশে গণপরিবহনগুলোতে ৯৪ ভাগ নারী যাত্রী মৌখিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। এই যে ৯৪% নারী তারা কারা? নিশ্চয়ই আমাদের কারো বোন, কারো মেয়ে, কারো বউ বা কারো প্রেমিকা। কিন্তু ৯৪ % নারী যৌন হয়রানীর শিকার হলেও এর প্রতিবাদ এই দেশে হওয়া বরং নারী গায়ে হাত দেবার অধিকার প্রকাশ্যে চায়।

প্রকাশ্যে অধিকার চায় বিষয়টা শুনে অবাক হচ্ছেন? তাইলে একটু ব্যাখ্যা দেই। যেহেতু আপনি ইতিমধ্যে জেনেছেন দেশে ৯৪% নারী গণপরিবহনে যৌন নিপীড়নের শিকার হয় সেখানে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন যখন এর প্রতিবাদ হিসেবে "গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না" লেখা একটা টি-সার্ট গায়ে দিয়ে প্রতিবাদ করে তখন এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেলো সমাজের বিরাট একটি অংশ। বিভিন্ন যুক্তিতে এমনকি টি-সার্টের লেখাকে বিকৃত করে তারা তারা প্রচার করতে থাকল। মেয়েরা যদি বলে গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না আর সেখানে এত বড় একটি অংশ এর বিপরীতে দাঁড়ায় তাহলে তারা কী চায়? নিশ্চয়ই তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নারীদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানোকে সমর্থন করছে।

নারী নিপীড়ন অন্যায় কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রতিবাদ হয়না মাঝে মাঝে এর শিকার নারীদের কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে ঘুরে ফিরে আবার তারেই দোষী বানানো হয়। তার চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন আসে, নিপীড়নের শিকার মেয়েরা সামাজিক মাধ্যমে নোংরা আক্রমণের শিকার হয়। গবেষণার তথ্যেও এই প্রমাণ মেলে নিপীড়িতদের অধিকাংশই প্রতিবাদ করেন না আরও হয়রানি হওয়ার ভয়ে। নিপীড়িত মেয়েদের পাশে থেকে হাতে হাত রেখে প্রতিবাদ করা যেখানে নৈতিক দায়িত্ব সেখানে পুরুষদের একটি অংশের কাছে দায়ী মেয়েদের পোশাক।

তাহলে মেয়েদের পোশাক কী হবে? সোজা উত্তর বোরখা, যদিও বোরখা পরা মেয়েরাও বাদ যাচ্ছেনা যৌন নিপীড়ন থেকে। ৪ দিন আগে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয় সেখানে দেখা যায় বোরখা পরিহিত একটি মেয়ের পাশে পাবলিক বাসে দাঁড়িয়ে আছেন দাঁড়ি মুখে থাকা এক মধ্য বয়স্ক লোক। সে বারবার বোরখা পরিহিত মেয়ের শরীরে তার শরীরের বিশেষ অংশ বারবার ঘর্ষণ করছে। পোশাক কি মেয়েকে রক্ষা করল? নাকি পুরুষের বিকৃত যৌন মানসিকতা দায়ী? নিশ্চিত সে বিকৃত যৌনতা চর্চা করছে। একেতো মেয়েটিকে অমতে সে যৌন নিপীড়ন করেছে তার উপর মেয়েটি রাজি থাকলেও সে নিশ্চয়ই পাবলিক বাসে এমন যৌন চিন্তা করতে পারেনা এর মানে পুরুষটি মানসিক ভাবে বিকৃত যৌন চিন্তার মানুষ।

একটি স্বাধীন দেশে কে কী পরবে করবে সেটা তার ব্যাপার, আপনার আমার বা সমাজের ক্ষতি না করে রাষ্ট্রীয় আইনের ভেতরে থেকে সে সব করতে পারে। এই দেশ একটি স্বাধীন দেশ এখানে প্রায় ৭৫ টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী সহ এই দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সহ অনেকেই বসবাস করে, যদি পোশাকের দোষ হয় তবে অন্য ধর্মের বা বর্ণের মেয়েরাও বোরখা পরবে?

পোশাকের দোষ যারা দেখেন সেই সব পুরুষ কি তনুকে দেখেছেন? তারা ঘুমন্ত ধর্ষিতা মায়ের কথা ভেবেছেন? তারা কি নুসরাতকে দেখেছেন?

নুসরাত বোরখা পরা মাদ্রাসার ছাত্রী ছিল, ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে গত ৬ এপ্রিল ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার ছাদে আগুন ধরিয়ে পুড়ানো হয়। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে সারাদেশকে কাঁদিয়ে সে না ফেরার দেশে চলে যায় বুধবার রাতে। তার মৃত্যুতে সারা দেশে কাঁদছে। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে নুসরাতকে জীবন দিতে হয়েছে। নুসরাত বোরখা পরত, সে মাদ্রাসার ছাত্রী ছিল। যে হত্যার পেছনে যে যৌন হয়রানি তার নায়ক সে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার কাছে নুসরাত নিজের মেয়ের মত নিরাপদ থাকার কথা ছিল, হয়তো এই শিক্ষক তার জীবনে অনেক বার তার পশুত্ব ঢাকতে নারীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেছে হয়তো সেও টি-সার্ট বা জিনস দেখে অনেক মেয়েকে বেশ্যা বলেছে। তার পচে যাওয়া মগজের দায় অন্য মেয়েদের উপর চাপিয়েছে। কিন্তু সে যে শিক্ষক হয়ে নিকৃষ্টমনের চাওয়া আড়াল করতে পারেনি। আর তার তার শিকার বোরখা পরা মেয়েটি। উদ্ধার হওয়া এক চিঠির মাধ্যমে জানা যায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ধর্ষণে করতে ছেয়েছিলেন এই মাদ্রাসার শিক্ষক। কিন্তু প্রতিবাদী নুসরাত এর বিপক্ষে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। আর এতেই ক্ষিপ্ত সে নরপশুর আগুনে নুসরাতের দেহের আশি শতাংশ পুড়ে যায়। মুমুর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু বাঁচানো গেলনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও।

নুসরাত এমন একটা সময়ে মারা গেল যে সময়ে দেশে একটি যৌন নির্যাতন বিরোধী ক্যাম্পেইন 'গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না' চলছিল আর তাতেই অনেকের গায়ে জ্বলুনি ধরে গেছে। এর বিপক্ষে গিয়ে অনেকেই মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর পক্ষে ইনিয়ে বিনিয়ে যুক্তি দেখিয়েছেন। কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করছে। ভাবটা এমন এই দেশে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে মেয়েরা কি ধরনের হেনস্তার শিকার হবে এটা স্বাভাবিক ঘটনা।

নুসরাত একটি প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে, নুসরাতের মত যত মেয়েরা প্রতিবাদ করতে পারবে আর তার পাশে পুরুষদের পাবে ততই এই সমাজ নারীদের জন্য নিরাপদ হবে। আপনার নীরবতা একদিন আপনাকে নুসরাতের ভাইয়ের বা বাবার জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেবে। প্রতিটা মেয়েই নুসরাত সে কারো বোন, কারো প্রেমিকা, কারো মেয়ে। আমাদের সম্মেলিত প্রতিবাদ এই দানব থেকে মুক্তি দিতে পারে।

নুসরাত এবং তার পরিবার অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। তারা ভয়ে বা লজ্জায়, সামাজিক চাপে আর দশটা সাধারণ পরিবারের মত মুখ বুজে থাকে নি, এই অন্যায়কে হজম করে ফেলেনি। তারা মামলা করেছিল ওই শয়তানের বিরুদ্ধে। কিন্তু হাজারো নুসরাত নীরবে কেঁদে মরছে, এই দেশে শুধু প্রতিবাদ করতে গিয়ে হয়রানি শিকার হবে বলে। প্রতিবাদের ক্ষেত্রটা পুরুষকে তৈরি করতে হবে। ধর্ষণের জন্য মিছে মিছে পোশাককে দায়ী করলে যেমন ধর্ষণে উৎসাহ যোগানো হবে তেমনি মেয়েদের পাশে থেকে প্রতিবাদ করলে আপনার-আমার ঘরে থাকা নুসরাতরা নিরাপদ থাকবে।

  • রিপন দে: গণমাধ্যমকর্মী।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত