সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ ইং

মিহির রঞ্জন তালুকদার

২৬ মে, ২০১৯ ১৯:০১

প্রিয়াঙ্কা ছিল হৈমন্তীর প্রতিচ্ছবি

নারী নির্যাতন যে শুধু দারিদ্র্যতার জন্য হয় সেটাও কিন্তু নয়। অনেকেই চরম দারিদ্র্যতার মাঝেও সুখ খুঁজে নেয়। আবার সুশিক্ষার অভাবেও নারী নির্যাতন হয় (সুশিক্ষা এজন্য বললাম কারণ আজ যার কথা লিখতে চলেছি সেখানে শিক্ষার (পুঁথিগত) কোনো অভাব ছিল না।) আমাদের সমাজে দারিদ্রতা এখন অনেকটা হ্রাস পেয়েছে, কিংবা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেকটা এগিয়ে গেছে কিন্তু কুসংস্কারাচ্ছন্নটা থেকে সমাজ এখনো বেরোতে পারছে না। শশুর, শাশুড়ি আর ননদ সবাই মিলে ঘরের বউকে ক্রীতদাসী মনে করবে। সে যেন এক পরম্পরা।

গত ১২ মে সিলেট নগরীর পশ্চিম পাঠানটুলার পল্লবী ‘সি’ ব্লকের ২৫ নম্বর বাসা থেকে ডা. প্রিয়াঙ্কা তালুকদারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শশুরবাড়ির দাবি সে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু আমি যখন লিখাটি লিখছি তখন আর এটাকে আত্মহত্যা বলতে চাই না। আমি বলবো প্রিয়াঙ্কা তালুকদার শান্তাকে নিয়মিত নির্যাতন করতেন তার শ্বশুর ও শাশুড়ি। রিমান্ডে পুলিশের কাছে এমনটি স্বীকারও করেছেন তারা। কাজেই এটি একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড বলতেই হবে।

মেধাবী শিক্ষার্থীরাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার হয়। কাজেই তাদেরকে বুঝানোর প্রয়োজন নেই যে, আত্মহত্যা পাপ নয়, বরং এটি মহাপাপ।

বিভিন্ন উৎস থেকে যতটুকু জানতে পারলাম ডা. প্রিয়াঙ্কা তালুকদার সিলেট পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ছিল। তাঁর বাবা হৃষীকেশ তালুকদার সুনামগঞ্জের নতুন পাড়ার বাসিন্দা। আমার বাসা থেকে তাদের বাসার দূরত্ব বেশি না হলেও তাদের সাথে পরিচিত নই। সুনামগঞ্জের খুব কম সংখ্যকই উচ্চ শিক্ষিত, বড় চাকুরীজীবী। ফলে মোটামুটি সবাই তাদের সম্পর্কে জানেন, চিনেন। কাজেই এ বিষটি নিয়ে আমারও খোঁজ খবর নিতে তেমন সমস্যা হয়নি। ডা. প্রিয়াঙ্কাও ছিল সুনামগঞ্জের গর্ব। তারও ইচ্ছে ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। কিন্তু তাঁকে বিসিএসের কোচিং এ ভর্তি হতে দেয় নি তার শশুরবাড়ির লোকজন।

আর সে কিনা করবে আত্মহত্যা? তাছাড়া তাঁর তিন বছরের একটি ফুটফুটে ছেলেও রয়েছে, নাম কাব্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে মায়ের কোলে ছেলের মায়াময় চাহনির একটি ছবি। যা সবার হৃদয়কে বিমোহিত করছে। ছেলেকে বাঁচানো জন্য মা আত্মহত্যা করতে পারে, কিন্তু ছেলেকে রেখে মায়ের আত্মহত্যা?  সমাজে অনেক অঘটনই ঘটে থাকে কিন্তু এমন কথা বললে সমাজে মায়েদের প্রতি চরম অন্যায় করা হবে।

শশুর বাড়ীতে ডা. প্রিয়াঙ্কা ছিল অসহায়, নির্যাতিত এক নারী। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হৈমন্তী’ ছিল উনবিংশ শতাব্দীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের নির্যাতিত নারী। গৌরিশঙ্কর বাবুর একমাত্র মেয়ে ছিল হৈমন্তী। সেই দ্বিতীয় সীতা বিসর্জনের কাহিনী ডা. প্রিয়াঙ্কা যেমন জানত, তেমনি জানত তার স্বামী দিবাকর দেব কল্লোল বাবুও, জানতেন প্রিয়াঙ্কার শশুর-শাশুড়িও। তথাপি আমাকে তৃতীয় সীতা বিসর্জন নিয়েই লিখতে হচ্ছে।

বিভিন্ন জনের মন্তব্য থেকে জানা যায়- ডা. প্রিয়াঙ্কা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাসার যাবতীয় কাজ, পূজা-অর্চনা, নাস্তা তৈরি করে যেতেন কলেজে। দুপুর ২ টায় কলেজ ছুটির পরই তাড়াহুড়া করে আসতেন বাসায়। আবার রান্না করতেন সবার জন্য, ঘর পরিষ্কার করতেন, বাসার সবাইকে খাওয়াতেন, তারপর নিজে খেতেন। এতো কিছুর পরও পান থেকে চুন খসলে  চলতো অকথ্য মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। বিকালবেলা ঘুমানোরও অবকাশ ছিলনা তাঁর। কারণ তার একটি দুধের বাচ্চা রয়েছে তাকেও সময় দিতে হতো। তারপরও আবার মুরগি লালন-পালনের দায়িত্বও ছিল তারই উপর।

বাসায় কোনো কাজের মহিলা রাখার প্রয়োজন মনে করতো না পরিবারের লোকজন। প্রতিদিনই প্রিয়াঙ্কাকে না খেয়ে কোচিং এ যেতে হতো  (পোস্ট গ্রাজুয়েশনের কোচিং)। বাসার রান্না শেষ করে বাসা থেকে বের হয়ে দোকান থেকে একটা কেক আর একটা ম্যাংগো জুস কিনে খেতো ক্ষুধা নিবারণের জন্য। ঘটনার আগের রাত ৪ টা পর্যন্ত ঐ বাসা থেকে কান্নার আওয়াজ শুনেছেন প্রতিবেশীরা। তাই আর সন্দেহ থাকল না, যে তাঁর উপর নির্যাতন হয়েছিল কিনা?

উচ্চবিত্ত, উচ্চশিক্ষিত সমাজে যে নারী নির্যাতনগুলো হয় তা আমাদের চক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। এর প্রধান কারণ হলো তারা শিক্ষিত, তারা ধৈর্যশীল, তারা ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না। তারা কাঁদতে চাইলেও কাঁদতে পারে না। কি জানি পাড়া-প্রতিবেশী শুনে ফেলে? পরিবারের বদনাম হবে।  তাই শিক্ষিত মেয়েগুলো নীরবে বয়ে বেড়ায় নির্যাতনের জ্বালা। কেউ কেউ এ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বেঁচে নেয় আত্মহত্যার মত পথ। যখন একটি মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়, তখন বুঝতে কারো বাকি থাকে না তাঁর উপর কী ধরনে শারীরিক, মানসিক, নির্যাতন হয়েছিল?

আমরাও চাই দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আর যেন সীতা বিসর্জনের কাহিনী শুনতে না হয়। কাব্যর মতো আর কারো যাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মায়ের হত্যাকারীর বিচার চাইতে না হয়। এই অমানবিক দৃশ্য আমরাও দেখতে চাই না। অবশেষে বলতে চাই কাব্য আহলেই  সৌভাগ্য নিয়েই জন্মেছিল, বাবা ইঞ্জিনিয়ার আর মা ডাক্তার। ঈশ্বর তাকে ভাল রাখুক।

  • লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষক, বালাগঞ্জ সরকারি কলেজ, সিলেট।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত