শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ ইং

তারেক আহমদ

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ১৪:২৩

মহাকালের মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু

স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই মহাপুরুষ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক বনেদি মুসলিম পরিবারে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমা এখন একটি জেলা। শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মৎ সায়রা বেগম দম্পতির ৬ সন্তানের মধ্যে ৩য় সন্তান হলেন শেখ মুজিব। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। রাষ্ট্রটি স্বাধীন হলেও তখনো স্বাধীন হতে পারেননি এই রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি।

১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী পাকিস্তানের লায়ালপুরের সামরিক জেলে বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার করল। তথাকথিত এই বিচারে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হল। তখন পৃথিবীর বিভিন্ন শান্তিপ্রিয় দেশ বিশ্বের সকল মুক্তিকামী জনতা বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তার দাবি জানালো। ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কালবিলম্ব না করে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদানের দাবি জানানো হল। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলা হল- শেখ মুজিব বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের স্থপতি। তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের জনক। তাকে বন্দি করে রাখার কোনো অধিকার পাকিস্তান সরকারের নেই।

বিশ্ব জনমতের চাপে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিল। সেদিন জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করলেন। ঐদিনই বঙ্গবন্ধু লন্ডন যাত্রা করলেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর সাথে মিলিত হলেন। লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু ভারতের দিল্লিতে যাত্রা বিরতি করলেন। দিল্লি এয়ারপোর্টে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানালেন। ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি সকালে দিল্লির প্যারেড গ্রাউন্ডে বাঙালি জাতির জনককে সংবর্ধিত করেছিল ভারত সরকার। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান তার জাতিকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছিলে এবং তিনিই তা বাস্তবায়ন করেছিলেন।

বিজয়ের সেই অনবির্চনীয় মুহূর্তে দিল্লির লাখো জনতার তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী আরও বলেছিলেন- ভারতের প্রতিজ্ঞা ছিল বাংলাদেশকে মুক্ত করা, শেখ মুজিবকে মুক্ত করা এবং চূড়ান্ত ভাবে শরণার্থীদের স্বদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। ইন্দিরা গান্ধীর এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পরেই বক্তব্য প্রদান করলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্যারেড গ্রাউন্ডের স্বতঃস্ফূর্ত জনতা বিপুল করতালি আর জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানায় বাঙালি জাতির মুক্তি মহানায়ককে। বঙ্গবন্ধু প্রথমে ইংরেজিতে তার বক্তব্য শুরু করলেও উপস্থিত জনতা তাকে বাংলা ভাষায় বক্তব্য দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু জনতার আহবানে সাড়া দিয়ে বাংলা ভাষায় তার তেজদীপ্ত ভাষণ শুরু করলেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ঢাকা পৌঁছালে তাকে এক অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এয়ারপোর্ট থেকে বঙ্গবন্ধু সরাসরি রেসকোর্স ময়দানে গেলেন। লক্ষ লক্ষ জনতার সমাবেশে অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। বঙ্গবন্ধুর আগমনে শুধু যে জনতার মাঝে আনন্দের ঢেউ নামল তা নয়, তার আগমনে বাংলার অবারিত প্রকৃতিও যেনো হেসে উঠল।

দেশে ফেরার পর, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুকে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করতে হল। প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সংবিধান প্রণয়ন, ১ কোটি মানুষের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাস্তাঘাট মেরামত, শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত নাম মাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করার মতো কঠিন কাজগুলোতে বঙ্গবন্ধুকে আত্মনিয়োগ করতে হল। এছাড়া মদ, জুয়া, ঘোড়া দৌড় সহ সমস্ত ইসলাম বিরোধী কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, ১১০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সহ ৪০০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ, দুস্থ মহিলাদের কল্যাণের জন্য নারী পুনর্বাসন সংস্থা স্থাপন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণের মতো কঠিন কাজগুলোও বঙ্গবন্ধুকে সম্পন্ন করতে হয়েছে।

সারা দেশ জুড়ে শুধু সমস্যা আর সমস্যা। পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক-বীমা ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিট জাতীয়করণ ও চালুকরণের মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারীর কর্মসংস্থান, ঘোড়াশাল সারকারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন, বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো চালু করণ সহ বিভিন্ন সমস্যার মোকাবেলা করে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করে দেশকে একটি গণমুখী সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলার জন্য এসময় বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালেন। অর্থনৈতিক ভাবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী করার লক্ষে সকল কর্মপ্রযুক্তি ঢেলে সাজালেন।

বঙ্গবন্ধু চাইলেন স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে। সাধারণ মানুষের আহার, কাপড়, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের লক্ষে দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দিলেন। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির লক্ষ ছিল দুর্নীতি দমন, ক্ষেত খামার ও কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষে দ্রুত অগ্রগতি অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু সকল রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী সহ সকল মহলকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি মঞ্চ বা প্লাটফর্ম তৈরি করলেন। এই মঞ্চের নাম দেয়া হল, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল। বঙ্গবন্ধু দলটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন। সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণের আহবানে বঙ্গবন্ধু গোটা জাতির অভূতপূর্ব সাড়া পেলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করল। মিল-কলকারখানা গুলোতে দেখা দিল কর্মচাঞ্চল্য। উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে শুরু করল। এদেশে বন্ধ হলো চোরাকারবার। মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হলো। স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌছাতে শুরু করল।

কিন্তু অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস! অচিরেই মানুষের সকল সুখ শান্তি ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। ১৫ আগস্ট ভোরে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবনে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী ও উচ্চাবিলাসী বিশ্বাস ঘাতক অফিসারের হাতে সপরিবারে নিহত হলেন। তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তখন দেশের বাইরে থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে গেলেন। ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়ায় কবর দিল। ঘাতকের দল ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে দেবে। কিন্তু তারা জানত না যে, আকাশকে যেমন তার মেঘ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, নদীকে যেমন তার জলরাশি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, পাখিকে যেমন তার কুহু কলতান থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, ফুলকে যেমন তার সৌরভ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, তেমনি বাঙালি জাতির সমস্ত চেতনা, ঐতিহ্য ও সত্তা থেকে বঙ্গবন্ধুকেও বিচ্ছিন্ন করা যায় না। আর কোন দিন যাবেও না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত