রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

সানজিতা শারমিন

৩০ আগস্ট, ২০১৯ ২২:৫৪

স্বজনপ্রীতি নয়, দায়িত্ববোধ থেকে লিখছি

যারা সাধারণ জনগণ তাদের বেশিরভাগই মেডিকেল বিষয়াদি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন এটা সম্ভবও না। যারা এই সেক্টরে আছেন তারাই ভালো জানবেন এটাই স্বাভাবিক। আজ একটা অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে লিখছি। এটাকে কেউ স্বজনপ্রীতি ধরবেন না, এটা লিখছি দায়িত্ববোধ থেকে।

প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকালেও হাসপাতালে কর্তব্যরত ছিলাম আমি। কাজে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে আমার এক সিনিয়র আপু ডাকলেন আমায়। বললেন, “ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) আসো, তোমার সাহায্য লাগবে।” কি কারণ তা না জেনেই দৌড়ে ঢুকলাম ওটির ভেতরে। গিয়ে দেখি এক নারীকে অপারেশন টেবিলে শুইয়ে রাখা হয়েছে সিজারের জন্য।

এনেস্থিসিয়া দিয়ে মাত্র ইনসিশন দেওয়া হয়েছে। ইনসিশন দেওয়া মাত্রই প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছিল রোগীটির। আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে শুরুতেই এরকম ভাবে ব্লিডিং হয় না কোন রোগীর। ততক্ষণে অপারেশন থিয়েটারে থাকা সবাই ধারনা করে নিয়েছি রোগী যেহেতু পূর্বের সিজারের সেহেতু দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে ব্যথার দরুন অনেক রোগীরই জরায়ু ফেটে যায়। এখানেও হয়তো তাই হয়েছে, তা না হলে এত ব্লিডিংইবা হবে কেনো? এখানে একটু বলে নিই, রোগীকে টেবিলে তোলার আগ পর্যন্তও তার ইন্টারনাল ব্লিডিংয়ের ব্যাপারে কিছুই বোঝা যায়নি। তার মানে ব্লিডিং শুরু হয়েছে ঘণ্টা দেড় ঘণ্টার মতো।

এমতাবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে মেমব্রেন ফুটো করে আগে বাচ্চা বের করা হল এবং বাচ্চা সুস্থ ভাবেই প্রসব হয়েছে। যাক কিছুক্ষণের জন্য হাঁফ ছাড়লাম যে বেশিক্ষণ ভেতরে ব্লিডিং হয়নি। যদি ব্লিডিং অনেক্ষন ধরে হতো তাহলে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে যেত। এরপর ডাক্তাররা যখন প্লাসেন্টা আউট করতে গেলেন তখনই দেখা যায় প্লাসেন্টা জরায়ুর ফান্ডাসের সাথে আটকে আছে। কোন ভাবেই প্লাসেন্টা বের করা যাচ্ছেনা। টানলে উলটে জরায়ুটাই চলে আসতে চাচ্ছে। এদিকে ব্লিডিং হইয়েই যাচ্ছে। প্লাসেন্টাটা বের করে নিয়ে না আসা পর্যন্ত  সেলাইও দেওয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে রোগীর স্বজনদের ডেকে বিষয়টি অবগত করা হল।

তাদের বোঝানো হল এবং রোগীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানানো হল। তাদের আরও বলা হল তাড়াতাড়ি কয়েক ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করতে। এই দিকে সাহায্যের জন্য শিশু কনসালটেন্ট আরএম ও সহ সিনিয়র নার্সসহ আমরা যারা আছি সবাইকে ডাকা হল। কখন কার দরকার লাগে বোঝা যাচ্ছেনা আগে থেকে। জরায়ুর লোয়ার স্যাগমেন্টে  ব্লিডিং পয়েন্ট থাকায় বেশি ব্লিডিং হচ্ছে। যত সেলাই দেওয়া হচ্ছে ব্লিডিং অফই হয় না। এদিকে পালস রেট, স্যাচুরেশন কমে যাচ্ছে। দুইটা চ্যানেলের একটাতে আগে এনে রাখা ব্লাড অন্য চ্যানেলে দুই হাতে চেপে চেপে স্যালাইন, প্লাজমাসল দিচ্ছিলাম। জরুরী সকল মেডিসিনই দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে চিকিৎসক যথা সম্ভব ব্লিডিং বন্ধ করার জন্য সেলাই দিচ্ছেন। আমরা বুঝতে পারছিলাম তাড়াতাড়ি আরও ব্লাড দিতে না পারলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। রোগীর স্বজনদের আবারও ডেকে পাঠালাম আরও রক্ত মেনেজ করতে। এরই মধ্যে আমি নিজেও কয়েক জায়গায় ফোন করলাম রক্তের জন্য। একজন দিতে পারবে সে ও অনেক দূর থেকে আসবে। সঠিক সময়ে আসতে পারবে না। আমাদের নার্স-মিডওয়াইফ ঝর্না দি ব্লাড দিতে চাইলেন কিন্তু হাসপাতালে ব্লাড কালেক্ট করার ব্যবস্থা নেই। এমনকি একটা বিশাল উপজেলায় একটা ব্লাড ব্যাংক নেই যে ওখান থেকে দ্রুত চার পাঁচ ব্যাগ কালেক্ট করা যাবে।

দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করতে পারলে হয়তো আমরা আমাদের বাকি চেষ্টা টুকুও করে যেতে পারতাম। কোন রকম দুই ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ হল। বাকিটুকু স্যালাইন দিয়ে ফ্লুয়িড ভলিউম ঠিক রাখার চেষ্টা করি আমরা। দীর্ঘ দুই ঘণ্টাকে তখন মনে হচ্ছিলো অনেক লম্বা পথ, যেন শেষই হতে চাচ্ছিল না। এই যুদ্ধ আজ থামবার নয়। অবশেষে কোনভাবে সেলাই করে ব্লিডিং বন্ধ করা গেলো। কিন্তু ভয় ছিল যেকোনো সময় আবার ব্লিডিং হতে পারে। যে কারণে ভ্যাজাইনাল প্যাক ও দেওয়া হয় ভালোভাবে। যেহেতু এই একটা উপজেলা হাসপাতালে বাকি ম্যানেজমেন্ট করা সম্ভব না তাই সিদ্ধান্ত হল রোগীকে জরুরী ভাবে সিলেট পাঠানো হবে। ওখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখার জন্য সাজ্জাদ স্যার ফোন দিলেন সব ব্যবস্থা করে এম্বুল্যান্সে উঠানো হল ব্লাড আর স্যালাইনসহ। পেছনে হেল্পলেস একদল ডাক্তার নার্স তাকিয়ে আছে। মনে মনে সকলেই যার যার সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছি যেন নারীটি বেঁচে যায়। এমন তীব্রভাবে দীর্ঘদিন কারো বেঁচে থাকার জন্য বোধহয় সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি নিজেও চাইনি।

সে সময় কি পরিমাণ স্নায়ুচাপ ছিল ওটিতে থাকা সবার, কি আপ্রাণ চেষ্টা ছিল তাকে বাঁচিয়ে রাখার। কিন্তু মানুষের হাতে তো সবকিছু থাকে না। যদি থাকতো তাহলে সিজারের ঘণ্টা খানেক আগেই কেন তার জরায়ু ফেটে যাবে। কেন ওপেন করার পর দেখা যাবে। যদি আগেই বোঝা যেত তাহলে নিশ্চয়ই এত ঝুঁকি মাথায় নিয়ে উপজেলা সরকারি হাসপাতালে সিজার করার কথা না ভেবে সদরে রেফার করা হতো।

যাক এতো ঝক্কি ঝামেলার পর বিকেলে শুয়ে আছি এমন সময় একজন ফোন দিয়ে জানালেন রোগীটি ওসমানী মেডিকেলে মারা গেছেন। লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। মনে হচ্ছে হাত পা কাঁপছে আমার। যদিও আশংকা আগেই ছিল কতটুকু বেঁচে যাবে এই নিয়ে তাও ক্ষীণ আশা ছিল অন্তত ওখানে গেলে হয়তো বেঁচেও যেতে পারে।

ফেসবুকে ঢুকে দেখি আসল ঘটনা না বুঝেই অনেকে অনেক মন্তব্য করছেন। জানি এমনই হবে। এই টার্মটাই দুর্বোধ্য, সবার পক্ষে সব সিচুয়েশন বোঝা সম্ভব না। রোগীর লোকের পক্ষে তো আরও সম্ভব না। তারা এমনিতেই উদ্বিগ্ন থাকেন তাদের স্বজনকে নিয়ে। কোন যুক্তি কোন সত্যিই তখন প্রিয়হারা ব্যক্তির কাছে টেকে না।

আজ আমি যদি নিজে ওটিতে না থাকতাম যদি শুরু থেকে নিজে না দেখতাম তাহলে হয়তো তাদেরকে সবার মতো আমিও ঘটনাটিকে প্রশ্নের জায়গায় রাখতাম। নিজের চোখকে কি করে অস্বীকার করি। এতগুলো মানুষের ডেডিকেশনকে কি করে না দেখে না বলে থাকি।

অথচ আজ আমরা ডাক্তার-নার্সদের দিকে প্রশ্ন না তোলে প্রশ্ন তুলতে পারতাম ব্লাড ব্যাংক কেন নেই? কেন আমার প্রিয় ব্যক্তির অপারেশনের জন্য আগে থেকে ব্লাড ডোনার ম্যানেজ করি নি?

  • সানজিতা শারমিন: নার্সিং অফিসার

আপনার মন্তব্য

আলোচিত