বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ ইং

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ১৫:৪১

স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে রেখেই চলতে হয়!

দেশ ছেড়ে আসলেও দেশ আমাকে ছাড়ে না। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই দেখি ইনবক্স বার্তায় ভরে গেছে। রবীন্দ্রনাথের অনুষ্ঠান উপলক্ষে খালেদা জিয়া সিলেট আসছেন। কারাগারে আটক খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেতে পারেন, এমন ধারনা অমূলক নয়। তবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুষ্ঠানে এসে হাজির হবেন- এমন সংবাদ দেখেই বিভ্রমে পড়তে হয়। অবশ্য দ্রুতই বিভ্রম কাটে।

আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট একজন আমিনুল ইসলাম লিটন। বক্তৃতা দেয়ার সময় ভুল করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জায়গায় 'দেশনেত্রী খালেদা জিয়া' বলে ফেলেছেন। ভুল মানুষের হয়। ভুলের জন্য মূল্যও দিতে হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রবীণ জননেতা আবুল মাল আবদুল মুহিত এমন বক্তৃতা দিতে গিয়ে নিজেও ভুল করেছেন। কথাটি বলে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেছেন। গুরুজন হিসেবে এ দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। কিন্তু ভুলটি যাদের আহত করেছে, তারা থামছেন না। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি শুরু হয়েছে। অনেকেই দূর দেশ থেকেও অনুরোধ করেছেন এ নিয়ে যেন একটা প্রতিক্রিয়া জানাই।

এমন অনুরোধ প্রায়ই আসে। যারা করেন, তারা আমার স্বজন। তাদের নিয়ে আমার দীর্ঘ বিচরণ ছিল বলেই এমনটি দাবি করেন। বলতে পারিনা- দেশে আমি আর নাই, যে সমাজ থেকে এখন অনেকটাই বিচ্ছিন্ন- সেখানকার নানা বিষয়ে খুব বিচক্ষণ কথা বলার কি কোন সুযোগ আছে আমার?

এমন আবদার আগেও এসেছে। তখন বিএনপি ক্ষমতায়। একজন লিটনের ভিডিও পাঠালেন। দেখা যাচ্ছে, প্রয়াত সাইফুর রহমান জল পান করছেন। লিটন ঢোক গিলছেন। সঙ্গে আরও কতো কথা। 'দেখেন আপনাদের লিটনের কী অবস্থা?' যখন কেউ এভাবে বলেন, আমি ওড়িয়ে দিতে পারিনা। কাউকে অস্বীকার করিনা, সে আপাতত দূরে সরে গেলেও!

আমিনুল ইসলাম লিটনকে প্রথম আমাদের ছাত্র সংগঠনে যুক্ত করি, সে কথাটি ভালোই মনে আছে । আজকের মতো 'জয় বাংলা' স্লোগান দেয়ার প্রচুর লোক তখন ছিলেন না। আমারা জাসদ বাসদ ছাত্রলীগ করি। প্রদীপ ভট্টাচার্য কলেজ ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট। আমাদের পক্ষে আমি সে সময়ে আমিনুল ইসলাম লিটনকে আমরা কলেজ সংসদের নাট্য সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন দিই। সেই থেকে লিটন আমাদের লোক!

এরপর সুরমা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। আমরা ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলন করেছি। জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের সময় আমার বিচরণ যেমন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ছিলো, তেমনই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও। চরম বৈরী পরিবেশে ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলন করতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে টানা আন্দোলন মোটেই মসৃণ ছিল না।

দুই দশকের মঞ্চ আর রাজপথের চলমান সময়ে বেশ কিছু 'মঞ্চবালক' সৃষ্টি হতে দেখেছি। এরা কখনো সংস্কৃতির নামে, কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে নিজেদের জাহির করতে চেয়েছে। এসব মঞ্চবালকরা রাজনীতিতে বা সংস্কৃতির প্রবাহে টিকে থাকে আপন মহিমায়। আবার ঝরেও পড়ে বিপাক দুর্বিপাকে। এদের নির্মূল করার সাংস্কৃতিক পরিবেশ আমরাই সৃষ্টি করতে পারিনি। এ দায় আমাদের। যখন আমার সাথে আছে, আমি বগলদাবা করে বেড়াবো। যখন অন্যজনের আস্তিন ধরে হাঁটছে, আমি বিরূপ হই!

আমরা এখন আর কাউকে নীতিগত কারণে অচ্যুত মনে করছি না। সমাজ সংস্কৃতি আর রাজনীতিতে একই অবস্থা। সবাই মিলে মিশে আনন্দ আয়োজন আর ভাগাভাগিতে মত্ত আমরা। এমন সময়ে লিটনের মুখ ফসকে যাওয়া বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দেবে ঠিকই, তাকে ভাসিয়ে নেবে না।

রবীন্দ্র আয়োজনে লিটন যুক্ত থাকলেও রবীন্দ্র চেতনা ব্যাহত হবে না। সরে গেলেও সব শুদ্ধ হয়ে যাবে না। সবাইকে ম্যানেজ করে একটা উৎসব হোক। বাজার অর্থনীতির চাঙ্গা এ সময়ে সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে রেখেই যে চলতে হয়!

  • ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক; সংগঠক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত