রেহানা ফেরদৌসী

১১ অক্টোবর, ২০২৫ ১১:১৬

নিষ্ঠুর গল্পের নাম বেকারত্ব

বেকারত্ব শুধুমাত্র অর্থের অভাব নয়, এটি আত্মসম্মান, আশা আর স্বপ্নভঙ্গের এক কঠিন বাস্তবতার গল্প। আজকের দিনে অনেক তরুণ-তরুণী লেখাপড়া শেষ করেও কাজের অভাবে হতাশায় ভুগছেন। একজন মানুষ যখন বেকার থাকে, তখন সে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সংকটে ভোগে না, তার প্রতি লোকের সম্মানও নষ্ট হয়ে যায়। পরিবার তার উপস্থিতি মেনে নেয় অভ্যাসবশত, আর সমাজ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। তার দিন কাটে অপমান আর অপারগতায়। ধীরে ধীরে সে সমাজের চোখে অদৃশ্য হয়ে যায়!

মা-বাবা অনেক আশা নিয়ে সন্তানকে লেখাপড়া করায়। তাদের স্বপ্ন থাকে সন্তান একদিন ভাল চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করে যখন বেকার থাকে, তখন সে সন্তান আর মুখ দেখাতে পারে না। নিজে নিজে দুমড়ে মুচড়ে যায়। হাতে টাকা থাকে না। বন্ধুদের কাছে তার ধারের পরিমাণ দিনদিন বাড়তে থাকে। তার পৃথিবী দিনদিন ছোট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে রুদ্ধ হতে থাকে সবক'টি দুয়ার। বেকারদের তেমন বন্ধু থাকে নাম, হাতেগোনা কয়েকজন। যাদের সাথে শুধু মনের অব্যক্ত কথাগুলো খুলে বলা যায়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, আরেকটা দিন গেল, কিন্তু কিছুই বদলাল না। তারপর কাজ খুঁজতে বের হয়, আশায় থাকে কেউ একটা সুযোগ দেবে। কিন্তু দরজার পর দরজা বন্ধ হয়, কেউ বিশ্বাস করতে চায় না যে সে পারবে! ‘তোমার অভিজ্ঞতা নেই’, ‘আমাদের লোক লাগবে না’, ‘তুমি আনফিট’—এই কথাগুলো তার আত্মবিশ্বাস শেষ করে দেয় তিলে তিলে।

বাড়িতে ফিরে দেখে, মা মুখ নিচু করে চুপচাপ বসে আছে, বাবা মুখ ঘুরিয়ে নেন, ছোট ভাইবোনের চোখেও এক ধরনের প্রশ্ন—‘তুমি আসলে করছ কি?’ ভালোবাসার মানুষটিও ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। কারণ, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে টাকা রোজগার করা শিখতে হয়, নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হয়। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে প্রেমও টাকা ছাড়া কিছু চেনে না!

বাবা বলেন, অনেক তো পড়ালেখা করলে, আর কতদিন! নিজে কিছু করার চেষ্টা করো। সরকারি চাকরি করা লাগবে না, নিজে ভালভাবে বাঁচার চেষ্টা করো। সন্তান মাথা নিচু করে থাকে। মা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, আর কত বসে থাকবি? এবার কিছু একটা কর। সংসারের হালটা যে তোকেই ধরতে হবে। বেকার সন্তান কিছু বলতে পারে না। বুক ফেটে বোবা কান্না আসে। ছোট ভাই-বোন মলিন মুখে কাছে এসে বলে ভাইয়া/আপু তুমি কবে চাকরি করবে? তোমার চাকরি হলে কিন্তু আমরা অনেক মিষ্টি খাব। বেকার সন্তান মুখে শুকনো হাসি দিয়ে বলে, এইতো হয়ে যাবে, চিন্তা করো না। বেকার ছেলেটার জন্য বোনের বিয়েটাও আটকে থাকে আর বেকার মেয়ের ভালো জায়গা থাকে বিয়ের প্রস্তাব আসে না। প্রেমিকা মন খারাপ করে কাছে এসে বলে, বাড়ি থেকে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলছে, কিছু একটা অন্তত করো! বেকার ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। চোখের কোন বেয়ে অশ্রু ঝরে প্রেমিকা বুঝতে পারে না। ছোট ভাই হাসি মুখ নিয়ে বলে আপু বিয়ে বসবে না, তোমার বয়স তো অনেক হয়ে গেল। তোমার বিয়েতে আমরা অনেক মজা করব, যে কোন একটা চাকরিতে ঢুকে পড়ো। বেকার মানুষটি সবার কথায় এক টুকরা হাসি দিয়ে বলে চেষ্টা তো করছি, আর কয়েটা দিন অপেক্ষা করো, সবই হবে।

বেকারদের কেউ বুঝতে চায় না। না সমাজ, না পরিবার। মানুষটি রাতের আঁধারে চোখের অশ্রু ঝরায়, কেউ দেখতে পায় না, বুঝতে পারে না। চেষ্টার তো কোন ত্রুটি নেই, তবুও কেন চাকরি হয় না। চাকরির বাজার খুব কঠিন। মামা-চাচা নেই, তাই চাকরি নেই। ভালো একটা চাকরির আশায় মানুষটি প্রহর গুনতে থাকে। বিশ্বাস করে, অবশ্যই একদিন ভালো চাকরি হবে। এত দুঃখ, কষ্ট, পরিশ্রম বৃথা যাবে না।

এদিকে প্রতিদিনই চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে যে গাড়ি ভাড়া আর চাকরির জন্য জরুরি কাগজ পত্র ফটোকপি করতে করতে ২০০ টাকা চলে যাচ্ছে এবং এদিকে চাকরিটা হচ্ছে না। এই খরচ কোথা থেকে আসবে যা ইন্টারভিউ দিতে গেলে প্রতিবারই হয়। এমতাবস্থায় সে যে মানসিক চাপে ভুগছে এটা কেউ বুঝতে চায় না।

সময়ের সাথে সে নিজেকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। একদিন সে আর কোনো স্বপ্নই দেখে না, কারণ সে জানে, স্বপ্ন শুধু বিত্তবানদের জন্য! এই দুনিয়া শুধু সাফল্যের গল্প শুনতে চায়। এখানে বেকার হয়ে বেঁচে থাকা মানে অভিশাপ বয়ে বেড়ানো। অভাবের যুদ্ধে সবাই টিকে থাকতে পারে না। কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ কাপুরুষের মতো জীবন কাটায়, আর কেউ মেনে নেয় ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’!

বেকার জীবন খুবই ভয়ানক, কারণ এতে শুধু অর্থনৈতিক চাপই নয়, বরং মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাস হারানো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পরিবার ও সমাজের সমালোচনার শিকার হওয়ার মতো গুরুতর সমস্যাও তৈরি হয়। বেকারত্বের কারণে সমাজে অপরাধ প্রবণতা এবং অস্থিরতা বাড়তে পারে। বেকারদের সংখ্যা বাড়ার কারণে সরকারি সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচির উপর নির্ভরতা বাড়ে। অন্ধকারের নিচেই আলো থাকে! মেঘের পরেই তো সূর্য হাসে আমরা এ কথাগুলো যেন ভুলে না যাই।

  • রেহানা ফেরদৌসী: সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (কেন্দ্রীয় পুনাক), ঢাকা।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত