২৫ অক্টোবর, ২০১৬ ২০:৫২
জাতীয় পার্টি দলীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান কর্তৃক নারায়ণগঞ্জের বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তকে অপমানের ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছে নিজের অপমানের প্রতিকার চেয়েছেন এ শিক্ষক।
এ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করে বলেছেন, 'আমি ধর্ম নিয়ে কোনো কটূক্তি করিনি। যে আমাকে অপমান করেছে, তা আপনারা সবাই দেখেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা জড়িত, সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।'
মঙ্গলবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছে ঘটনা সম্পর্কে নিজের বক্তব্য দিয়ে বেরিয়ে এসে গণমাধ্যমকে শ্যামলকান্তি এসব কথা বলেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কল্যানদী এলাকার হাজী পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্ত লাঞ্ছিতের ঘটনায় দ্বিতীয় দিনের মতো বিচার বিভাগীয় তদন্তে এসে মোট ১২ জনের বক্তব্য নিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) শেখ হাফিজুর রহমান। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাজহারুল ইসলাম ও গোলাম নবী। মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ সার্কিট হাউসে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চলে এই বক্তব্য গ্রহণ।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছে শুরুতেই নিজের বক্তব্য প্রদান করেন প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্ত। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তিনি বক্তব্য দিয়ে বের হয়ে আসেন।
এসময় তিনি গণমাধ্যমের কাছে বলেন, 'আমি ওই দিনের পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছি। আমি কোনো ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করিনি।'
দুপুরের মধ্যাহ্ন বিরতির আগে ও পরে একে একে বক্তব্য প্রদান করেন বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী হাবিব, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, এএসপি মাসুদুজ্জামান, বন্দর থানার ওসি, বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আতাউর রহমান মুকুল, বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশীদ, জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আবু জাহের, স্থানীয় ইউনিয়ন (কলাগাছিয়া) পরিষদের চেয়ারম্যান দোলোয়ার হোসেন প্রধান, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য সামসুজ্জামান, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী শাহীন, ময়েজ উদ্দিন মেজু।
এদিকে প্রথম দিনের মতো মঙ্গলবার সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তের শাস্তির দাবিতে ফ্যাস্টুন ও ব্যানার নিয়ে কর্মসূচি পালন করেছেন সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমানের সমর্থকরা।
উল্লেখ্য, গত ১৩ মে বন্দর উপজেলার কল্যানদী এলাকায় ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তকে কান ধরে উঠবস করানো হয়। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সেদিন মাইকে ঘোষণা দিয়ে একদল ব্যক্তি শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছিত করার পর বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি তাকে পদচ্যুত করেছিল। এরপর দেশজুড়ে নিন্দা-প্রতিবাদের মধ্যে দুই দিনের মাথায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে। নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করা হয়।
দীর্ঘদিন ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ৯ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে কড়া পুলিশ পাহারায় শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে নগরীর খানপুর এলাকার ভাড়া বাড়িতে দিয়ে যায় পুলিশ।
এই ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জেলা ও পুলিশ প্রশাসন তদন্ত করে। পরে গত ১০ আগস্ট হাইকোর্টের বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাশের ডিভিশন বেঞ্চ নারায়ণগঞ্জের পুলিশ কর্তৃক দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।
ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমকে এই ঘটনা তদন্ত করে ৩ নভেম্বর হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়। আগামী ৬ নভেম্বর হাইকোর্টে আদেশের ওপর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
আপনার মন্তব্য