সিলেটটুডে ডেস্ক

২৫ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:১৪

‘দুদকে কচ্ছপ গতি’

সম্পদের তথ্য বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে কোনো ব্যক্তিকে নোটিশ দেওয়ার পর তা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাই কোর্ট। আদালত বলেছেন, দুদকের অনুসন্ধানের কাজ এক্সপ্রেস গতিতে নয়; কচ্ছপ গতিতে চলছে।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার দুর্নীতির অনুসন্ধান বন্ধে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দেওয়া এক চিঠির বৈধতা প্রশ্নে রুলের শুনানিতে এ কথা বলেন।

শুনানিতে হাইকোর্ট নিযুক্ত দুই অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) বলেছেন, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের দুর্নীতি অনুসন্ধান বন্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন যে চিঠি দিয়েছে, তা আইন বহির্ভূত। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন এ ধরনের কোনো চিঠি দিতে পারে না।

দ্বিতীয় দিনের মতো অনুষ্ঠিত রুলের শুনানিতে মঙ্গলবার আদালতে বক্তব্য রাখেন অ্যামিকাস কিউরি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী এবং এএম আমিন উদ্দিন। তারা আদালতকে আরও বলেন, এই চিঠির ভাষা ও বর্ণনায় মনে হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া আইনে নেই। এ সময় দুদকের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান; বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পক্ষে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের চিঠি আদালতের নজরে আনা আইনজীবী বদিউজ্জামান তফাদার। দ্বিতীয় দিনের শুনানি শেষে আগামী ৩১ অক্টোবর ফের দিন ধার্য করা হয়েছে।

শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি এএম আমিন উদ্দিন বলেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনগতভাবে এ ধরনের চিঠি দিতে পারেন না। প্রধান বিচারপতি হলেও এ জাতীয় অভিমত তিনি দিতে পারেন না। একজন বিচারপতি দায়মুক্তি পেতে পারেন না। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের জনতা টাওয়ার মামলার উদাহরণ টেনে আমিন উদ্দিন আরও বলেন, এরশাদকেও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আপিল বিভাগ সেই দণ্ড বহালও রেখেছিলেন। একজন রাষ্ট্রপতিকেও যদি দায়মুক্তি দেওয়া না হয়, তাহলে বিচারপতির বিরুদ্ধে কেন তদন্ত করা যাবে না? বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে কেন দায়মুক্তি দেওয়া হবে?

এর পর অ্যামিকাস কিউরি প্রবীর নিয়োগী আদালতকে বলেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। কোনো ব্যক্তি দায়মুক্তি পেতে পারেন না। সাবেক বিচারপতির ক্ষেত্রেও আলাদা বলে কোনো আইন নেই। তাই সুপ্রিম কোর্টের এই চিঠি সংবিধান এবং আইন বহির্ভূত। সুপ্রিম কোর্ট চিঠিতে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান এভাবে বলতে পারে না।

অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্য শেষে শুনানিতে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, দুদক উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে হয়রানি করতে চাইছে। তাই বিষয়টি তিনি সুপ্রিম কোর্টের নজরে নিয়েছিলেন।

জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে এখনও কোনো মামলা হয়নি। তাই তাকে হয়রানি করা হচ্ছে- এটি সত্য নয়।

এ সময় নথিপত্র পর্যালোচনা করে দুদকের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, ২০১০ সালের ঘটনা- তখনই সুপ্রিম কোর্টের কাছে তথ্য চাইতে পারতেন। কিন্তু তা না করে সাত বছর পর কেন দুদক তথ্য চাইল। এ সময় দুদকের তথ্য ফরমে থাকা চারটা ক্লোজ (৬, ৭, ১১, ১২) নিয়ে প্রশ্ন রাখেন হাই কোর্ট। আদালত বলেন, এটা কতটা বাস্তব সম্মত? একজন মানুষের দৈনন্দিন বাজারের তালিকাও কি লিখে রাখা সম্ভব? উল্লেখ্য, ওই ক্লোজগুলোতে হিসাব দাতার প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সন্তানের লেখাপড়ার যাবতীয় হিসাবের তথ্য দিতে হয়।

এর আগে রুলের ওপর শুনানি শুরু হওয়ার আগে সুপ্রিম কোর্টের চিঠি নিয়ে হাই কোর্ট শুনানি করতে পারেন কি-না, তা নিয়ে দুই অ্যামিকাস কিউরির মতামত জানতে চান হাই কোর্ট। জবাবে এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘এটা জুডিশিয়াল অর্ডার না। এটা একটা এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ (প্রশাসনিক) আদেশ। এটা দেওয়ার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের নেই।’ একই মতামত দেন অপর অ্যামিকাস কিউরি প্রবীর নিয়োগী। তিনি বলেছেন, ‘হ্যাঁ, এটার শোনার এখতিয়ার এ আদালতের আছে।’

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের দুর্নীতির অনুসন্ধান বন্ধে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দেওয়া চিঠি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিষয়ে অনুসন্ধানের স্বার্থে চলতি বছরের ২ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে চিঠি দেন দুদক। এর জবাবে গত ২৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দুদকে পাঠায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

গত ৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দেওয়া ওই চিঠি এবং এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বদিউজ্জামান তফাদার। এরপর ওইদিনই রুল জারি করেন হাই কোর্ট। রুলে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান না করতে সুপ্রিম কোর্টের চিঠি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

এছাড়াও এই রুল শুনানির জন্য আদালতের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এএম আমিন উদ্দিন ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতে আইনি পরামর্শ প্রদানকারী বন্ধু হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার রুলের ওপর দিনের শুনানি গ্রহণ করা হয়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত