৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:২৬
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীর বাড়ি-দোকানে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের দিকে উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম দৌলতপুরে এ ঘটনা ঘটে বলে শাল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল জানান।
তিনি বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের আলামত সংগ্রহ করেছে। আমরা ভুক্তভোগীদের মামলা করার কথা বলেছি। তবে তারা আহতদের নিয়ে হাসপাতালে থাকায় আসতে বিলম্ব হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুলাল মিয়ার বাড়িঘর ও দোকানে মধ্যরাতে কিছু লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। দুলাল মিয়ার বাবা মামুদ আলী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। এই পরিবারের মোট সাত স্বজন-আত্মীয় শহীদ হন।
দুলাল মিয়া ২০১৬ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষী হন। তখন তদন্ত সংস্থার কাছে মোট ৩২ জন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা মোট দেড়শ পৃষ্টার একটি প্রতিবেদন দেয়।
যুদ্ধাপরাধের মামলার বরাতে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর দৌলতপুর গ্রামের তোতা টেইলার্স, জলিল মিয়াসহ পাঁচজনকে মানবতাবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দীর্ঘদিন জেল খেটে তারা জামিনে মুক্তি পান।
তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩৪ জনকে হত্যা, পাঁচ নারীকে ধর্ষণ, ৩১ জনকে অপহরণ, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং ৩০ বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়।
দুলাল মিয়ার মেয়ে উজ্জ্বলা আক্তার শুক্রবার বলেন, আমার বাবা একাত্তরের মানবতাবিরোধী মামলার সাক্ষী। আতঙ্কের মধ্যেই তিনি মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, তার স্বামী হেলাল মিয়া ও বাবা দুলাল মিয়া মিলে গ্রামে দোকানদারি করেন। এই দোকানে উৎপাতও বেড়েছে। গ্রামের আরও যারা মামলার স্বাক্ষী হয়েছিলেন, তারা ৫ অগাস্টের পর গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। শুধু তার পরিবার রয়ে গেছে।
উজ্জ্বলা বলেন, ২৩ অক্টোবর আমাদের দোকানে চুরি হয়। তখন শাল্লা থানাকে চুরির বিষয়টি অবগত করা হয়। ২৯ অক্টোবর পুলিশ গ্রামে আসে তদন্তে। তখন হামলাকারীরা পুলিশ কেন গ্রামে আসল, সেই জবাব আমাদের কাছে চায়। তারা পুলিশের সঙ্গেও তর্কে জড়ায়।
তার অভিযোগ, পুলিশ গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার পর মধ্যরাতে যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি তোতা টেইলার্সের ভাতিজা জালাল মিয়ার নেতৃত্বে তোফাজ্জল মিয়া, যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি জলিল মিয়ার নাতি শাহিন মিয়া, হেকিম মড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামিম, নূর ইসলামসহ ১৫-২০ জন বাড়িতে ও দোকানে হামলা চালায়।
উজ্জ্বলা অভিযোগ করেন, হামলার পর দোকান ও বসতঘরের মালামাল, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। চারটি ফ্রিজ, ছয়টি গরু, দুই ভরি স্বর্ণ, নগদ চার লাখ টাকা নিয়ে যায় হামলাকারীরা। বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “হামলাকারীরা আমাদের পরিবারের ফাতেমা বেগম, ফরিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে মারধর করে ও যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করে। পরে তাদেরকে দিরাই ও শাল্লা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, হামলাকারীরা আমাকে ও আমার ১২ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টাও করেছে। আমরা যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী এবং বীরাঙ্গনা পরিবারের সদস্য। এ কারণে তারা আমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে চায়।
দুলাল মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে আসছে। বৃহস্পতিবার রাতে হামলা করে সব লুট করে নিয়ে গেছে। এখন আমার স্বামীকে খুঁজে পাচ্ছি না। ৫ অগাস্টের পর মামলার অন্য আসামিরা গ্রাম ছেড়ে ভয়ে চলে গেছেন।
দুলাল মিয়ার মেয়ের জামাই ও উজ্জ্বলা আক্তারের স্বামী হেলাল মিয়া বলেন, হামলার খবর পেয়ে আমি সুনামগঞ্জ থেকে দৌলতপুরে গিয়ে দেখি, আমার সব শেষ। দোকান ও বাড়ির সব মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। ঘটনার সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ ছিলেন না। হামলাকারীরা অস্ত্রশন্ত্র নিয়ে হামলারও লুটপাট করে।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোকতাদির আহমদ বলেন, দৌলতপুর গ্রামের তিন নারী ও এক শিশু আহত অবস্থায় এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এ ব্যাপারে জানতে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি জালাল মিয়ার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
শাল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় পুলিশ ওই গ্রামে তদন্তে গেলেও হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের উচ্চবাচ্য হয়। রাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।”
আপনার মন্তব্য