৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:০৫
সিলেটের ওসমানীনগরে সুলতানী আমলে নির্মিত এক গম্বুজের প্রাচীন একটি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।
ওই মসজিদের মূল স্থাপনা আড়াল করে নতুন করে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাচীন এ স্থাপনাটি মাঝখানে রেখে চারপাশ ঘিরে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় স্থানীয়দের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
একটি পক্ষ মসজিদের প্রাচীন স্থাপনা অক্ষত ও আড়াল না করে অন্য পাশে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানিয়েছে।
তবে মসজিদ কমিটি তাদের দাবিকে উপেক্ষা করে নতুন ভবন নির্মাণ করতে তোড়জোর শুরু করেছে। আগামী ডিসেম্বরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
মসজিদ কমিটির দাবি, তারা প্রাচীন মসজিদ অক্ষত রেখেই বড় মসজিদ গড়তে চান। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের আসার কথা রয়েছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের উদ্যোগে একটি নাগরিক প্রতিনিধিদল মসজিদটি পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রাচীন স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এর মূল কাঠামো অক্ষত রেখে সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে।
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নে তাজপুর-বালাগঞ্জ সড়কের পাশে উসমানপুর গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদ।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, মসজিদটি প্রায় ৭০০ থেকে ৯০০ বছরের পুরনো। মসজিদের স্থাপত্যরীতি দেখে ধারণা করা হয় এটি সুলতানি আমলের মসজিদ। সিলেট জেলায় সুলতানি আমলের এটাই একমাত্র মসজিদ। জনশ্রুতি আছে জঙ্গলাচ্ছাদিত এলাকায় মাটির নিচে ঢাকা পড়া এই মসজিদ জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে গায়েবিভাবে পাওয়া যায়। তাই স্থানীয়রা একে 'গায়েবি মসজিদ' বলে থাকেন।
পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট, সিলেট-এর চেয়ারম্যান ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার-এর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন সিলেট প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, পরিবেশ ও নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম, সাংস্কৃতিক সংগঠক অ্যাডভোকেট মনির হেলাল, সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী দিপন ও প্রত্নতত্ত্ব
গবেষক আসিফ আজহার।
এ সময় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে প্রতিনিধি দল কথা বলেন।
স্থানীয়দের সাথে
আলাপকালে তারা জানতে পারেন, এলাকার কিছু ব্যাক্তি প্রত্নসম্পদের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারায় এই প্রাচীন মসজিদের স্থানে নতুন মসজিদ নির্মান করতে চাইছে।
ওয়াকফ প্রশাসনের তালিকাভূক্ত হলেও অদ্যাবধি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হয়নি এই মসজিদ।
নাগরিক প্রতিনিধিদল পরিদর্শন শেষে স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে বলেন, প্রাচীন এই মসজিদটি সংরক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি না করার কারনে ইতিমধ্যে মসজিদের অনেক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। মেহরাব ও দেয়ালে রংবেরঙের টাইলস বসানো কোনভাবেই উচিৎ হয়নি। সিলেট জেলায় টিকে থাকা সুলতানী আমলের এমন একটি প্রত্নসম্পদ বিনষ্ট হওয়ার দায় আমাদের সবার। এই মসজিদের ক্ষতিসাধন করে নতুন স্থাপনা নির্মানের চিন্তা উদ্বেগের।
তারা আরও বলেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে যে মসজিদটি এই এলাকার ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের কথা বলে আসছে, তা সংরক্ষণে এলাকার সকল সচেতন নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে।
প্রাচীন এই মসজিদটি সুরক্ষায় এলাকাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেটের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সুরক্ষার জন্য কাজ করা নাগরিক সংগঠন ‘পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট’।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনজীবী সৈয়দ মনির হেলাল বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে মসজিদটি সুলতানি আমলের শেষ দিকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এর পরিচালনা ও সংরক্ষণ নিয়ে বিরোধ চলছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, গ্রামপঞ্চায়েতকে না জানিয়ে এবং কমিটি গঠনের বিষয়ে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় কথিত কমিটির পরিচয় ব্যবহার করে নতুন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সচেতন গ্রামবাসীরা উদ্বিগ্ন।
মনির হেলাল আরও বলেন, এলাকার কয়েকজন সমাজহিতৈষী ব্যক্তি বিরোধ নিষ্পত্তিতে সালিস ও আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অতীতে আপসের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এককভাবে কাজ করার নজির থাকায় আশঙ্কা কাটছে না।
তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিদ্দিকুর রহমান খান সালমান।
তিনি বলেন, সুলতানি আমলের স্থাপনা অক্ষত রেখেই নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হবে। ডিসেম্বরে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হবে। মসজিদের ভবন নির্মাণের জন্য ওয়াকফ এস্টেটের অনুমতি রয়েছে।
একটি পক্ষ মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মসজিদের বিরোধীতাকারীর মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন। প্রাচীন স্থাপনাকে অক্ষত রেখেই নকশা করা হয়েছে। আগামী মাসে উদ্বোধন করা হবে। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।
আপনার মন্তব্য