২৩ জুন, ২০১৫ ২৩:৩৬
সিলেটের আবাদযোগ্য এমন অসংখ্য জমি বছরজুড়েই পড়ে থাকে অনাবাদি অবস্থায়
অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেট বিভাগে শস্যের নিবিড়তা কম। এ নিবিড়তা বৃদ্ধি করতে ৭৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রকল্প প্রণয়নের আগে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি।
এছাড়া প্রকল্পের উদ্দেশ্যের মধ্যে টেকসই প্রযুক্তি অভিযোজনের মাধ্যমে কৃষিজমি কাজে লাগানোর কথা বলা হলেও প্রকল্পের প্রধান কাজের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকছে শুধু প্রদর্শনী ও মেলা।
এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের পর প্রকল্পটি এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায়।
‘সিলেট অঞ্চলে শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক এ প্রকল্পের আওতায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৩০টি উপজেলায় প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়, টেকসই কৃষি প্রযুক্তি অভিযোজনের মাধ্যমে কৃষিজমি কাজে লাগিয়ে শস্যের নিবিড়তা ও শস্য উত্পাদন ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানো। এছাড়া দক্ষ ব্যবস্থাপনা কৌশল সম্প্রসারণের মাধ্যমে বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি ও উদ্যান ফসল চাষাবাদ করে খাদ্য উত্পাদন বাড়ানো; উন্নত জাত, মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার, বালাই ব্যবস্থাপনা, কৃষিভিত্তিক পরিচর্যা ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে শস্য উত্পাদন বৃদ্ধি এবং ফসল ব্যবধান কমানোও প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এসব উদ্দেশ্য সাধনে প্রকল্প প্রস্তাবে শুধু প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ফসলের ওপর প্রদর্শনী এবং মেলার মতো কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্রধান কার্যক্রম হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ২ হাজার ৪৫০ ব্যাচ কৃষক প্রশিক্ষণ, ২ হাজার ব্যাচ উপকারভোগী কৃষক প্রশিক্ষণ, ৫০০টি মাঠ দিবস, কৃষকদের জন্য ১৬০টি উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ, ৪০ ব্যাচ এসএসও প্রশিক্ষণ ও ৪ ব্যাচ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া কমলা, মসলা, সবজি, ধান, গম, ভুট্টা, ডাল ইত্যাদি ফসলের ওপর ১৪ হাজার ১১২টি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। এর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষি মেলার আয়োজন করা হবে। কিন্তু শুধু মেলা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকরা কতটা উপকৃত হবেন, তা নিশ্চিত নয়। শস্যের উত্পাদন বাড়াতে অথবা আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি কিনতে কৃষকদের নগদ কোনো সহায়তা দেয়ার ঘোষণা প্রকল্পটিতে নেই।
এদিকে প্রকল্পটি প্রণয়নের আগে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (বিএই) কর্তৃক ২০১১ সালে পরিচালিত একটি জরিপের ভিত্তিতে অনাবাদি থাকা জমি আবাদের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়ে বলা হয়, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। তবে বিএই কর্তৃক সম্পাদিত জরিপ অনুযায়ী, সিলেট অঞ্চলে রবি মৌসুমে ১ লাখ ৬৪ হাজার হেক্টর, খরিফ-১ মৌসুমে ১ লাখ ৮২ হাজার এবং খরিফ-২ মৌসুমে প্রায় ৭১ হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় এনে উত্পাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। এখানে অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনার কথা বলা হলেও প্রকল্পের উদ্দেশ্যের মধ্যে বসতবাড়িতে সবজি ও উদ্যান ফসল চাষাবাদের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
এদিকে সিলেটে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, এ অঞ্চলের অধিবাসীদের একটি বড় অংশ থাকে বিদেশে। তাদের জমিগুলো চাষের আওতায় আসে না। তাছাড়া এসব জমির মালিক জমি বর্গা দিতেও আগ্রহী নন। কারণ বর্গা দিলে ফসল পাওয়া যায় না বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুর রউফের পাঁচ হেক্টর জমি পতিত পড়ে আছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা দেশে থাকি না। বর্গা দিলে কোনো ফসল পাওয়া যায় না। বর্গাচাষীর কাছ থেকে একেক বছর একেক অজুহাত শুনতে হয়। বন্যা, খরা, পোকার আক্রমণ, মড়ক ইত্যাদি। অনেক সময় ধান চাষের জন্য আমাকেই খরচ জোগাতে হয়। তার ওপর জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহ। তাই চাষের জমি ফেলে রাখাই উত্তম। এতে অন্তত বেদখল তো হবে না।
সিলেট বিভাগজুড়ে এমন চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে অহরহ। ঢাকা থেকে সড়ক বা রেলপথে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়বে রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ পতিত জমি। ফসলের বদলে ঘাষ গজিয়েছে জমিতে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব মতে, সিলেট অঞ্চলের মোট আবাদযোগ্য জমির প্রায় ২০ শতাংশই অনাবাদি অবস্থায় পড়ে আছে। সেচ সংকট, পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা, প্রবাসীবহুলতা, শ্রমবিমুখতা, শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে এখানকার জমিগুলো পতিত পড়ে থাকে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটের মাটির নিচে পানি পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ এলাকায় গ্যাস ও পাথর উঠে আসে। এছাড়া জমিগুলো অপেক্ষাকৃত উঁচু হওয়ায় এতে সেচ প্রদান প্রায়শ সম্ভব হয় না। ফলে এসব জমির বেশির ভাগ অনাবাদি থেকে যায়। কেবল সেচের ব্যবস্থা করতে পারলেই সিলেট অঞ্চলে বোরোর আবাদ অনেকটা বেড়ে যেত। সেচ সংকট ছাড়া শ্রমিক সংকটের কারণেও সিলেটে অনাবাদি থেকে যায় অনেক জমি।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিলেটে জমি জবর-দখলের প্রবণতা বেশি। সিলেটের আদালত ও থানায় যত মামলা নথিবদ্ধ হয়, তার বেশির ভাগই জমি-সংক্রান্ত। প্রতিদিনই সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি দখল-পুনর্দখল নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটে। এসব কারণে সবসময় জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ভোগেন প্রবাসীরা। ফলে তারা জমি বর্গা দিতে চান না। এছাড়া আত্মীয়স্বজন প্রবাসে থাকায় সিলেটে বসবাসকারীরা অনেকটাই কর্মবিমুখ। শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলেন তারা। এসব কারণে বছরের পর বছর ধরে জমি পতিত পড়ে থাকে। এখানকার অনেক জমি উত্পাদনের আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে না। এছাড়া পাহাড়ি ঢলে ফসলহানি হওয়ার ভয়ে তারা উত্পাদনবিমুখ থাকেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পে এসব সমস্যা দূরীকরণে স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপের উল্লেখ নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নে যেসব কেনাকাটা করা হবে, তার বেশির ভাগই বিএই অফিস-সংক্রান্ত। তাই এ প্রকল্প থেকে সরাসরি কৃষকদের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সম্পূর্ণ দেশী অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পটির প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিএই। সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে কৃষি বিপণন অধিদফতর (ড্যাম) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
আপনার মন্তব্য