সোমবার, ২০ মে ২০১৯ ইং

সেলিম আহমেদ

০১ এপ্রিল, ২০১৯ ১৯:২৫

আগুন নিয়ে খেলা আর কতকাল?

নিমতলী ট্র্যাজেডির কথা মানুষ কিছুটা ভুলতে বসেছিল। এর মধ্যে পুরান ঢাকায় চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি। আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নিল ৭০ তাজা প্রাণ। চুড়িহাট্টার সেই দগদগে ক্ষত এখনো শুকিয়ে ওঠার আগেই আবারো আগুন। তাও রাজধানীর অভিযাত এলাকা বনানীতে। বহুতল ভবনে পুড়ে মারা গেল এক শ্রীলঙ্কানসহ অন্তত ২৬ জন। দগ্ধ ও পড়ে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭০ জন। ঘটনার দুদিন পেরোনোর আগেই গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটে আগুন। পুড়ে ছাই হলো দুই শতাধিক মানুষের স্বপ্ন। এরও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফের গুলশান-২ এলাকার এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আগুন। চারদিকে এ আগুনের পোড়া গন্ধ স্বজন আর সাধারণ মানুষকে শোকে পাথর বানিয়ে দিচ্ছে।

মর্মান্তিক এসব ঘটনার পর আমরা প্রশাসনের তোড়জোড় দেখেছি, তদন্ত কমিটি হতে দেখেছি, মানুষের আহাজারি দেখেছি, সরকার এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে নানা পরিকল্পনা হাতে নিতেও দেখেছি। কিন্তু এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেখিনি। কিন্তু মানুষের বসবাস-উপযোগী নগরী গড়ে তুলতে পারিনি।

২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলী এলাকায় রাসায়নিকের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে সেদিন মাত্র তিন ঘণ্টায় ভস্মীভূত হয়ে প্রাণ হারান ১২৪ জন মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ২৬২টি পরিবার। এত অল্প সময়ের আগুনে এত বেশি মানুষের পুড়ে মরার ঘটনা সেটাই ছিল দেশে প্রথম। সেদিন নিমতলীর একটি ৫ তলা ভবনের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে ভবনের নিচতলার গোডাউনে রক্ষিত ড্রামভর্তি বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ মিথাইল ক্লোরাইডে আগুন লেগে যায়। পরে তা পাশের রাস্তার ওপরে রাখা বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণ ঘটায় এবং কাছাকাছি ভবনগুলোয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ১১টি ভবন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। দাহ্য কেমিক্যালের তীব্র আগুন, পর্যাপ্ত আধুনিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জাম এবং পানির অপ্রতুলতা, গাদাগাদি করে গড়ে ওঠা ভবনের মাঝে সরু গলিতে যান চলাচলের নানা প্রতিকূলতায় বাড়তে থাকে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা। সেদিন মা হারান তার প্রিয় সন্তানকে, পিতা হারান তার কন্যাকে, ভাই হারান বোনকে, স্ত্রী হারান তার প্রিয় স্বামীকে। পুড়ে অঙ্গার হয় বহু পরিবারের স্বপ্ন।

নিমতলীর ঘটনা-পরবর্তী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর সিটি কর্পোরেশন ৮০০ রাসায়নিক কারখানার তালিকা করে তা সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি নয় বছরেও। ভয়াবহ সেই আগুনের ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি প্রশাসন। আমরা হৃদয় পোড়া অভিজ্ঞতা নিয়েও নিরাপদ হতে পারিনি বলেই চকবাজারে চুড়িহাট্টার কেমিক্যাল গোডাউনে ফের জ্বলে ওঠে নরকের আগুন। সর্বনাশা সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে ৭১টি প্রাণ। বাতাসে ছড়িয়ে পোড়া মানুষের গন্ধ। স্বজন আর দেশবাসীর আহাজারিতে ভারি হয়েছে আকাশ-বাতাস।

চুড়িহাট্টার অভিশাপে স্বজন হারানোর কান্না ভুলে যেতে না যেতেই ঢাকা নগরীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা বনানীতে বহুতল ভবনে দাবানলের মতো আগুন ছড়িয়েছে। পুড়ে ছাই হয়েছে ২৬ তাজা প্রাণ। মানুষের বাঁচার কী আকুতি তার মর্মস্পর্শী চিত্র যেমন মানুষ দেখেছে, তেমনি দেখেছে আকাশছোঁয়া এফ আর ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ডে কীভাবে মানুষ পুড়ছে। কীভাবে যুদ্ধ করে ফায়ার সার্ভিসের বীরকর্মীরা এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আগুন নিভিয়েছেন। কীভাবে তাদের সঙ্গে মানুষ বাঁচাতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা লড়েছেন। জীবন্ত মানুষ উদ্ধার করেছেন। এখানে বিদেশির মৃত্যু হয়েছে। যুগল দম্পতির মৃত্যু হয়েছে। কেউ প্রাণ বাঁচাতে উঁচু ভবন থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। কেউ বা আগুনে পুড়ে মরেছেন।

বনানীর ঘটনারও দুদিন পেরোনোর আগেই শনিবার অভিজাত গুলশান-১ এলাকার ডিএনসিসি মার্কেটে জ্বলে সর্বনাশা আগুন। এতে পুড়ে ছাই হয়েছে কয়েক শতাধিক মানুষের স্বপ্ন। এ ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর গুলশান-২’র এক বাণিজ্যিক ভবনে ফের জ্বলে আগুনের লেলিহান শিখা।

এত হৃদয়স্পর্শী ঘটনার পরও আমরা আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করছি না। অনেকে এসব মৃত্যুকে অনাকাঙ্ক্ষিত বললেও আমি বলব, এ আগুন আমাদের লোভের আগুন। এ আগুন পরিকল্পিত আগুন। এত ঘটনার পরও জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে অপসারণ করা হয়নি অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউনগুলো, বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে না বিধিমতো, নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ বহির্গমনের বিকল্প পথ, সিঁড়িপথের আয়তন ছোট, ভবন নির্মাণে নেই পরিকল্পনা, আগুন নেভানোর পানির অভাব, ছোট গলিপথের কারণে আগুন নেভাতে প্রবেশ করতে পারে না ফায়ার সার্ভিস কিংবা অ্যাম্বুলেন্স। এক কথায় নিরাপদ নগরের জন্য নেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা।

নিমতলী ট্র্যাজেডির নয় বছরে তদন্ত কমিটির ১৭ দফা সুপারিশের একটিও বাস্তবায়িত হয়নি আজো। এর মধ্যে ওই সুপারিশের চিহ্নিত কারণগুলো আবারো চকবাজারে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ডেকে এনেছিল। চকবাজারের পর বনানীর ঘটনায়ও এবার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিমতলী-চকবাজারের পর বনানীর দুঃসহ অঘটনে তদন্ত কমিটি আবারো হয়তো সুপারিশ তুলে ধরবে। সুপারিশে দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো হয়তো ফের সামনে চলে আসবে।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নিমতলীর ঘটনায় সেদিনকার ১৭ দফা সুপারিশে বলা হয়েছিল- জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া জোরদার করা, ‘অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩’ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক দ্রব্যের মজুদ বা বিপণনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্য বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ মজুতকরণ বা বিপণন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা, ঘরবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক তারের গুণগতমান নিশ্চিত করা, রাস্তায় স্থাপিত খোলা তারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা পরিহার করতে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার সরেজমিন গিয়ে পরীক্ষা করা, দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের জন্য স্থানীয়ভাবে পৃথক পানির লাইনসহ হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা, দুর্ঘটনা মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন, রাসায়নিক ও রাসায়নিক জাতীয় দাহ্য বস্তুর আলাদা দফতরের পরিবর্তে সব দফতরের মধ্যে সমন্বয় সাধন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অবকাঠামো, জনবল, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের আধুনিকায়ন, জনসচেতনতা বাড়ানো, অগ্নিকাণ্ডের সময় যেন উৎসুক জনতা উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো, পাঠ্যসূচিতে অগ্নিকাণ্ড, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয় বাধ্যতামূলক করা, ৬২ হাজার কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, কমিউনিটি সেন্টারগুলোকে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে ডেকোরেটরের উপকরণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা প্রভৃতি।

নিমতলীর পর চুড়িহাট্টা, বনানী ও গুলশানে অগ্নিকাণ্ডে কারণগুলো চিন্তিত করার জন্য একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য রাষ্ট্রের কাছে কিছু সুপারিশ করবে। কিন্তু তা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা পরিষ্কার বলা যাচ্ছে না। কারণ আমাদের দেশে মৃত্যুর মিছিল লম্বা হয়, কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর বিবেক জাগ্রত হয় না।

  • সেলিম আহমেদ: সাংবাদিক। ইমেইল : [email protected]

আপনার মন্তব্য

আলোচিত