০৫ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ১৯:৪১
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের চলমান আন্দোলন 'অভীষ্ট লক্ষ্যে' না পৌঁছা পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছেন
বৃহস্পতিবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা জানান তিনি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠান।
সকলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে 'গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে' আন্দোলন চলছে- একথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, 'আমরা দেশবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলনের ডাক দিয়েছি। আমরা বলেছি, একটি যৌক্তিক পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত এ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।'
তিনি বলেন, 'দেশের সাধারণ মানুষ এবং গণতন্ত্রের সংগ্রামে অবতীর্ণ নেতাকর্মীরা অনেক কষ্ট সয়ে এবং বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম, গুলি করে আহত করা, অত্যাচার, নির্যাতন, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, পাইকারি গ্রেফতার, পুলিশি রিমান্ড, বাড়িতে হামলার মতো ভয়ঙ্কর ত্রাসের রাজত্বের মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রবল বাঁধা ও অত্যাচারের মুখেও যখন যেখানেই সম্ভব হচ্ছে, মিছিল ও প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন তারা। আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।'
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, 'জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে মুষ্টিমেয় স্তাবক ও সুবিধাভোগীদের দ্বারা বেষ্টিত সরকার জনগণের আন্দোলনে ভীত হয়ে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এইসব বাহিনীর নিয়ন্ত্রণভার দলবাজ ও বিতর্কিত কতিপয় কর্মকর্তার হাতে তুলে দিয়ে তাদের মাধ্যমে জনগণ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর চরম জুলুম-নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'গত ৬ জানুয়ারি দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৩ জন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি, সাজানো বন্দুকযুদ্ধ ও নৃশংস অন্যান্য পন্থায় হত্যা করা হয়েছে। গুলি করে ও অন্যান্য পন্থায় আহত করা হযেছে শত শত নেতা-কর্মীকে। আটকের পর নিখোঁজ রয়েছে অসংখ্য নেতা-কর্মী। ১৭ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কয়েক লাখ। অনেকের বাড়ি-ঘরে গভীর রাতে হানা দিয়ে ভাংচুর, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি মহিলাসহ পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও হেনস্তা করা হচ্ছে। এভাবে সারাদেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।'
২০ দলীয় জোট প্রধান বলেন, 'জনগণের ওপর এমন চরম জুলুম-অত্যাচারের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আন্দোলনরত বিরোধী দল, জনগণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে একতরফা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সকলের মৌলিক-মানবিক সমস্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন ছাড়া প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনাও অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। অফিস বন্ধ করে দেয়া, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে না দেয়া, এমনকি দলের পক্ষে কেউ বক্তব্য-বিবৃতি প্রদান করলেই সেই নেতাকে আটক করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হেনস্তা করা বর্তমানে নিয়মিত রীতিতে পরিণত হয়েছে। অপর দিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে শাসক দলের সন্ত্রাসীরা লাঠিসোটা এমনকি মারণাস্ত্র নিয়ে আইন-শৃংখলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে মহড়া দিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা আমাদের দলের সিনিয়র নেতাদের ওপর গুলি করছে। তাদের গাড়ি, বাড়ি ও অফিসে বোমা হামলা চালাচ্ছে।'
যানবাহনে পেট্রোলবোমা মেরে নিরপরাধ মানুষ হত্যার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমরা বারবার বলে এসেছি, আমাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক। এ আন্দোলন আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়েই অগ্রসর করে নেয়ার নীতিতে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের আন্দোলন চলাকালে যাত্রীবাহী ও অন্যান্য যানবাহনে পেট্রোলবোমা মেরে ইতোমধ্যে নারী-শিশুসহ বেশ কয়েকজন নাগরিকের জীবন কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই শোচনীয় মৃত্যুর পাশাপাশি বার্ন ইউনিটে ঝলসানো দেহ নিয়ে অনেকে যন্ত্রনায় কাৎরাচ্ছেন। নিরপরাধ মানুষের ওপর এই বীভৎস আক্রমণের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। যারা হতাহত হয়েছেন তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা জানাই। এইসব হীন ও নৃশংস হামলায় জড়িত প্রকৃত অপরধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি আমরা আগেই জানিয়েছি, আজ আবারো তার পুনরাবৃত্তি করছি।'
খালেদা জিয়া বলেন, 'তবে জীবন-বিনাশী এই সব ঘৃণ্য হামলার ব্যাপারে ইতোমধ্যেই জনমনে গভীর সন্দেহ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ পরিপূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে আইন-শৃংখলা বাহিনীর প্রহরায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জবরদস্তি করে শাসকগোষ্ঠী কিছু কিছু যানবাহন রাস্তায় নামাচ্ছে। সেই সব যানবাহনে কেমন করে ঘাতক বোমার নৃশংস হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে, তা এক জ্বলন্ত প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত: এইসব হামলার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে আজ পর্যন্ত তেমন কাউকে হাতে নাতে ধরা সম্ভব হয়নি। কোথাও কোথাও বোমা, গুলি, আগ্নেয়াস্ত্রসহ শাসক দলের চেলা-চামুণ্ডারা পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। অথচ ঘটনার পরপরই বিরোধী দল ও আন্দোলনের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনরা একতরফা প্রচারণা শুরু করে দিচ্ছে। কোনো তদন্ত ও তথ্য প্রমান ছাড়াই আমিসহ বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে পুলিশ মামলা দায়ের করছে। কারারুদ্ধ ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও এসব ঘটনায় মামলা হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে আমাকে সহায়তাকারী অরাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এমনকি প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদকে পর্যন্ত বোমাবাজীর মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। আমাদের পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, আমার উপদেষ্টা ও দলের যুগ্ম-মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদেরকে পর্যন্ত রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।'
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, 'আমি পরিষ্কার ভাষায় আবারো বলতে চাই, মানুষের জীবন নিয়ে অপরাজনীতি আমরা করিনা। হত্যা ও লাশের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এমন হীন ও নৃশংস অপরাজনীতি আমরা কখনো করবো না। এখন যারা ক্ষমতা আঁকড়ে আছে তারাই অতীতে আন্দোলনের নামে যাত্রীবাসে গান পাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে ডজন ডজন মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। লগি-বৈঠার তা-বে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করেছে। একটার বদলে দশটা লাশ ফেলার প্রকাশ্য নির্দেশ দিয়েছে। অফিসগামী কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য রাজপথে বিবস্ত্র করেছে। সমুদ্রবন্দর অচল করেছে। রেল স্টেশন পুড়িয়ে দিয়েছে। লাগাতার হরতালে এসএসসি পরীক্ষা ৩ মাস পর্যন্ত পেছাতে বাধ্য করেছে। পবিত্র রমজান মাসে পর্যন্ত হরতাল করেছে। কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের মাথা ইট দিয়ে থেতলে দিয়েছে। ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদের নামে দিনাজপুরে পুলিশ ব্যারাক জ্বালিয়ে দিয়েছে। তদানীন্তন বিডিআর-এর পানি সরবরাহের লাইন কেটে দিয়েছে। এখনকার নৃশংস ঘটনাবলীও তাদের অতীত কার্যকলাপের সঙ্গেই মিলে যায়। কাজেই দেশবাসী মনে করেন যে, আন্দোলন দমন ও বিরোধী দলের ওপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়াবার উদ্দেশ্যে শাসকদলই সুপরিকল্পিতভাবে এইসব সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমি এ ধরনের নৃশংস অপরাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি, অতীতের ধারাবাহিকতায় নিরাপরাধ মানুষকে নৃশংস পন্থায় হত্যা করে তার দায়ভার চাপিয়ে আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার-মাধ্যমে অপপ্রচার এবং বিরোধী দলকে সেই সুযোগে দমন করার অপরাজীতি ব্যর্থ হবে ইনশাআল্লাহ্। বাংলাদেশের মানুষ আর এত বোকা নেই।'
তিনি বলেন, 'দেশবাসী জানেন, সম্প্রতি আমার কণিষ্ঠপুত্রের আকষ্কিক অকাল মৃত্যুতে আমি মানসিকভাবে এক চরম শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। এই বিপর্যয়ের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই আমার সঙ্গে কী ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে তা-ও সকলেই দেখছেন। সুপরিকল্পিতভাবে সর্বমুখী চাপ ও অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করে তারা আমাকে জনগণ ও নেতা-কর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সচেষ্ট। কিন্তু আমি সকলকে পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, কোনো অনৈতিক চাপ বা ভীতির মুখে আমি নত হবো না ইনশাআল্লাহ্। যে-কোনো পরিস্থিতি বা পরিণতির জন্য আমি তৈরি আছি।'
আওয়ামী শাসকদের একদলীয় ধাঁচের স্বৈরশাসন কায়েমের অপতৎপরতার কারণে অতীতে দেশ জঙ্গিবাদের কবলে পড়েছিল- এমন দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, 'আমরা তা দমন করেছিলাম। আজ আবার তারা একই কায়দায় উদারনৈতিক রাজনীতির ধারাকে নিশ্চিহ্ন করতে যে নীতি অবলম্বন করছে তাতে আবারো সেই একই আশংকা দেখা দিয়েছে। এতে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। আমরা এই কঠিন বাস্তবতার দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার হবার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।'
গত এক বছরে শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ক্রমাগত আহ্বান ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে একথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'তারা কোনো কিছুতে কর্ণপাত করেনি। বরং সীমাহীন অত্যাচার উৎপীড়ন চালিয়ে গেছে। অবৈধভাবে করায়ত্ব করা রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হীন অভিপ্রায়ে তারা কোনো রকম সমঝোতায় রাজি হয়নি। এমনকি নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের কথা তারা স্বীকার করতেও রাজি নয়। তারা মনে করে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পথেই জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে দমিয়ে দেয়া সম্ভব। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আন্দোলন ছাড়া দেশবাসীর সামনে আর কোনো পথ খোলা রাখা হয়নি। তাই ক্ষমতার জন্য নয়, গণতন্ত্র, দেশবাসীর ভোটাধিকার ও হৃত মৌলিক মানবিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে, শান্তি, নিরাপত্তা, আইনের শাসন ও সুবিচার নিশ্চিত করতে আমাদের এ আন্দোলন অভীষ্ট লক্ষে না পৌঁছা পর্যন্ত চলতে থাকবে। আমি এ আন্দোলনে সকলকে শরীক হতে আবারো উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।'
তিনি বলেন, 'একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসনের অবসানের পটভূমিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এদেশের মানুষকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অপহৃত অধিকার সমূহ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আমরাই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ‘৯০এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পথে গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আজ আবারো আমরা গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি। ন্যায়ের এ সংগ্রাম অবশ্যই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাবে ইনশাআল্লাহ্।'
আপনার মন্তব্য