২১ মে, ২০১৬ ১৪:৩১
নারায়ণগঞ্জের কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যান্দি এলাকায় পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনায় উত্তাল সারাদেশ। অথচ নারায়ণগঞ্জে সেলিম ওসমানের পক্ষে চলছে ব্যাপক প্রচারণা, সমাবেশ।
সারাদেশের বিভিন্ন মহল থেকে সেলিম ওসমানের সংসদ সদস্যপদ বাতিলসহ শাস্তির দাবি উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের হাতেগোনা দু-একটি সংগঠন ছাড়া কেউ মাঠে নেই। সেলিম ওসমানের প্রভাবে মাঠে নেমেহে হেফাজতে ইসলাম। ওসমান পরিবারের প্রভাবে আতঙ্কে নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনকারীরা, বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদগুলো তাই জোরালো হতে পারছে না। তার ওপর নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষক সমিতি কিংবা শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদসহ জেলা-উপজেলার নেতারা কোনো কর্মসূচি দেননি। উল্টো সাংসদ সেলিম ওসমানের পক্ষে লিফলেট বিলি করছেন শিক্ষক নেতারা!
অভিযোগ ওঠেছে, আন্দোলন দমাতেও একাট্টা এমপি সেলিম ওসমান ও স্থানীয় প্রশাসন। বন্দরের ইউএনও প্রতিবাদ কর্মসূচি না দিতে শিক্ষকদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই আতঙ্কে কোনো কর্মসূচি দেননি জেলার শিক্ষকরা। পাশাপাশি যার অভিযোগ ঘিরে হেনস্তার শিকার প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত, সেই শিক্ষার্থী রিফাতকেও নিজেদের মতো করে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত শুক্রবার (২০ মে) হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ওই ছাত্রকে এমপির পক্ষে সাফাই গাইতে হাজির করা হয়েছিল। এর আগে তার সঙ্গে হেফাজত নেতারা বৈঠকও করেন। এদিকে গতকাল শ্যামল কান্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া আদালতের অনুমতিতে শিক্ষক হেনস্তার ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
আরও পড়তে পারেন : সেই ছাত্রের গায়ে নতুন পাঞ্জাবি, মুখেও নতুন কথা
আরও পড়তে পারেন : সেই ছাত্রই বলছে, ‘স্যার ধর্ম নিয়ে কোন কটূক্তি করেননি’
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন এমপি সেলিম ওসমান, এমপি শামীম ওসমান কিংবা তাদের আত্মীয়-স্বজন ও অনুসারীরা। এর বাইরে গিয়ে কেউ কথা বললে বিপদে পড়বে- এই ভয়ে শিক্ষকরা কর্মসূচি তো দূরের কথা, শ্যামল কান্তিকে হাসপাতালে দেখতেও যাননি।
বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই হাসপাতালের পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমি ও বিবি মরিয়ম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও তাকে দেখতে যাননি।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, বন্দর উপজেলা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবুল হাসেম উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে লিফলেট বিতরণ করছেন এমপি সেলিম ওসমানের পক্ষে। বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী হামিদ বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে শ্যামল কান্তির ঘটনায় কোনো কর্মসূচি দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি এমপি সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিতে কঠোর নির্দেশনাও দেন।
আরও পড়তে পারেন : সেলিম ওসমানের হুমকি, গালাগাল, অশ্রাব্য কথার ফোনালাপ ফাঁস (অডিও)
জেলা শিক্ষক কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক (একাংশ) মো. জহিরউদ্দিন শিক্ষককে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বন্দরের শিক্ষক সমাজকে 'অফ' করে দিয়েছেন। তিনি ডেকে নিয়ে শিক্ষকদের বলেছেন, 'এ ব্যাপারে আপনারা মুখ খুলবেন না, সমস্যা আছে। এমপি সাহেব লাখ লাখ টাকা স্কুল ফান্ডে দিয়েছেন, মুখ খুললে তার ক্ষতি হবে। এজন্য উপজেলার শিক্ষকরা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে আসেননি।"
শিক্ষকদের অভিযোগ, শুধু বন্দর উপজেলা নয়, শহরের প্রতিটি স্কুল এবং ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার প্রায় প্রতিটি স্কুলেই এমন নির্দেশনা গেছে। এমপি সেলিম ওসমানের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি এবং নিতে সাহস পাচ্ছেন না।
তবে নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে বেশিরভাগ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন চুপ থাকলেও শ্যামল কান্তির ওপর নির্যাতনের পরদিন থেকেই আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ত্বকী মঞ্চ, নাগরিক কমিটি, জেলা কমিউনিস্ট পার্টি ও জেলার প্রেস ক্লাব। জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম বলেন, 'ঘটনার পর পরই আমরা তীব্র নিন্দা জানাই ও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করে মানববন্ধন করি।'
আরও পড়তে পারেন : সেলিম ওসমানের প্রশংসা করে হেফাজতের ভিডিওবার্তা
এদিকে, সেলিম ওসমানের পক্ষে মাঠে নেমেছে সেখানকার হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতের পক্ষ থেকে জুনায়েদ বাবুনগরী ফেসবুকে এক ডিডিওবার্তা প্রকাশ করে শিক্ষক লাঞ্ছনাকারী সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। এর বাইরে শ্যামল কান্তি ভক্তের কঠোর শাস্তিসহ ফাঁসির দাবিতে নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে হেফাজতে ইসলাম।
শুক্রবার (২০ মে) শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে বঙ্গবন্ধু সড়কে হেফাজতে ইসলামের জেলা আমির আবদুল আউয়ালের সভাপতিত্বে 'নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা'র ব্যানারে ওই সমাবেশ থেকে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। হেফাজতের নেতারা সেলিম ওসমানকে 'বীর' হিসেবে উল্লেখ করে ধন্যবাদ জানান এবং তার পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। তারা শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ দাবি করেন। এ ছাড়া সন্ধ্যায় সেলিম ওসমানের পক্ষে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
আপনার মন্তব্য