০৭ জুলাই, ২০১৫ ০২:২৪
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনাবাজারে মন্দিরের কোটি টাকা মূল্যের জমিকে সরকারী জমি দেখিয়ে দখলের পায়তারা চালাচ্ছে একটি মহল। ভূল তথ্য দিয়ে এ জমিটি বন্দোবস্ত নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে এই মহল। এই দখল প্রক্রিয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ ব্যাপারে মন্দির কমিটি একাধিকবার উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানালেও কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি। উল্টো প্রশাসনের স্থানীয় পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা মন্দিরের জমি দখল প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি জেলা হিন্দু বৌদ্ধ এক্য পরিষদ, জেলা পুজা উদযাপন পরিষদও জেলা প্রশাসকের সথে দেখা করে এই জমি মন্দিরের নামে বন্দোবস্ত প্রদানের দাবি জানিয়েছে।
জানা যায়, সাচনা বাজারে পূর্ব পাশে শ্রী শ্রী জগন্নাথ জিউ মন্দিরের অবস্থান। মন্দিরের এই ভূমিকে সরকারী জমি ও বাজার পেরিফেরির দেখিয়ে বন্দোবস্ত প্রদানের চেষ্টা চালছে। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই ভূমি ভিট শ্রেণীর ভূমি নয়। শুকনো মৌসুমে এ জমিতে ধান চাষ হয় ও বর্ষা মৌসুমে পানিমগ্ন থাকে। বর্তমানে এই জমিটি জলমগ্ন অবস্থায় আছে। তবু ভিট শ্রেণীর দেখিয়ে এই জমিটি বাজারের নাম বন্দোবস্ত দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জানা যায়, মন্দিরের দখলে থাকা এই ভূমি সরকার খাস ভূমি দাবি করায় মন্দিরের নামে স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রদানের দাবি জানালেও তাতে সাড়া দেয়নি প্রশাসন। তবে আখড়ার দখলে থাকা এই ভূমি অন্য একটি গোষ্টিকে বন্দেবস্ত প্রদানের চেষ্টা চলছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর দিরাই উপজেলার চরনাচর গ্রামের তৎকালীন জমিদার রামচরণ রায় চৌধুরী জামালগঞ্জ উপজেলার পলক মৌজার ৫৭ নং জেএল-এর সাবেক ১১ নং খতিয়ানের সাবেক ৬১৬ ও বর্তমান ৪৮৮ নং দাগের ১একর ১৭ শতক ভূমি সাচনাবাজার শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের মন্দিরের নামে নামে দলিল করে দেন। তবে সেসময় সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করার উপর সরকারী নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। সেকারণে ওই সময়ে রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি নতুন সেটেলম্যান্টে ৪৪৮ দাগের ৩৯ শতকের ভূমি আখড়ার নামে রেকর্ড করা হয়েছে।
অপরদিকে আখড়ার ওই ভূমি সরকারি পতিত ভূমি এবং সরকারের দখলে আছে দেখিয়ে জামালগঞ্জ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার এই ভূমিতে সাচনাবাজারের ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য বাজার পেরিফেরি অনুমোদনের জন্য উপজেলা সহকারী কর্মকর্তার (ভূমি) দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
এই খবর পেয়ে মন্দির কমিটির সাধরণ সম্পাদক স্বপন কুমার রায় গত ৩১ মার্চ মন্দির দখলীয় ভূমি স্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। পরে মালিকের কাছ থেকে পাওয়া দলিলমূলে ১ একর ১৭ শতক ভূমির মালিকানা করে সিনিয়র সহকারি জজ আদালতে মন্দির কমিটির পক্ষে স্বপন কুমার রায় মামলা করেন। পরবর্তীতে গত ৮ জুন আবারো জেলা প্রশাসকের কাছে উপজেলা পর্যায়ের ভূমির তদন্ত প্রতিবেদনের উপর আপত্তি ও জেলা পর্যায়ের তদন্তের জন্য আরেকটি আবেদন জানান।
বাজার এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য কবীর আলম বলেন, আমার বয়স ৪৬ বছর। জন্মের পর থেকেই দেখছি এই জমি মন্দির ভোগ দখল করে আসছে। এখন হঠ্যাৎ করে একটি চক্র এই ভূমি বন্দোবস্ত নেয়ার চেষ্টা করছে। মন্দিরের এই ভূমি কাউকে ইজারা দিলে ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা নষ্ট হবে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আতাউর রহমান বলেন, মন্দিরের পাশের বোরো জমি দীর্ঘদিন ধরেই মন্দিরের দখলে আছে। এই জমি কাউকে বন্দোবস্ত দেওয়া ঠিক হবে না।
সাচনা বাজারের ব্যবসায়ী ও সদর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, এই ভূমি বন্দোবস্ত দিলে মন্দিরকেই দিতে হবে। প্রয়োজনে আন্দোলনের মাধ্যমে এই জমির দখল ঠেকানো হবে।
সাচনা বাজারের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল হক আফিন্দী বলেন, আমি ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালে এই জমি মন্দিরের দখলেই ছিলো।
জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন জানিয়েছেন, এই জমি মন্দিরের জমি হিসেবেই আমরা জানি। মন্দিরের জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার সাথে আ্ওয়ামী লীগের কেউ জড়িত নয়। একটি মহল আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এই অপকর্ম করছে।
এ ব্যাপারে মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার রায় বলেন, মন্দির পরিচলনা কমিটি প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে দানসূত্রে ১ একর ১৭ শতক ভূমি ক্রয় করে গত ৫০ বছর ধরে ভোগদখল করে আসছে। মালিকের দেওয়া দানপত্রসহ সকল কাগজপত্র আমাদের আছে। নতুন সেটেলম্যান্টে ওই ভূমির মধ্যে ৩৯ শতক মন্দিরের নামে রেকর্ড হয়। বাকী ভূমির মালিকানা দাবি করে আরা সিনিয়র জজ আদালতে মামলা দায়ের করি।
তিনি বলেন, আমাদের দখলে থাকা এই ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য স্থানীয় কিছু ভূমি কর্মকর্তা এই ভূমিকে সরকারের জমি হিসেবে উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে একটি মহল এ জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। সরকার এই ভূমি খাস দাবি করায় আমরা মন্দিরের নামে বন্দোবস্ত প্রদানের দাবি জানিয়েছি।
এ ব্যাপারে সাচনা বাজার ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম বলেন, এই জমি মন্দিরের দখলে আছে। কাগজপত্র যদি ঠিক না থাকে তবে কাগজপত্র ঠিক করে মন্দিরের নামেই বরাদ্ধ দেওয়া হোক।
এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম শফি কামাল বলেন, সাচনাবাজার আখড়ার জমি যা আছে তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরো কিছু খাস জমিতে আখড়ার পক্ষ থেকে চাষ করা হয়। এই খাস জমির মালিকানা আখড়ার দাবি করার সুযোগ নেই। খাস জমি আখড়ার দখলে থাকলে তা আইনগত প্রক্রিয়ায় দাবি করতে হবে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক শেখ রফিকল ইসলাম বলেন, এই জমি নিয়ে মন্দিরের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। আমি তদন্ত করে দেখেবো।
আপনার মন্তব্য