১২ জুলাই, ২০১৫ ০০:০৯
অনন্ত বিজয় দাশের বোনের আহাজারি
পক্ষঘাতগ্রস্ত বাবা একেবারে বিছানাবন্দি। উঠে বসতেও পারেন না। তিনবার স্ট্রোক করেছেন। সেই থেকে কথাও বলতে পারেন না। কান্না ছাড়া মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হয় না।
বাসায় কোনো পুরুষ লোক গেলেই ভালো করে মুখের দিকে চেয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। হয়তো নিজের হারানো ছেলেকে খুঁজে ফেরেন। আগন্তুকের চেহারার সাথে ছেলের চেহারার কোনো মিল না পেয়ে আবার কান্নাজুড়ে দেন।
আর মায়ের কান্না তো থামছেই না। তিনিও অসুস্থ। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়বেটিকসের রোগী। আগে দিনে তিনটি ইনসুলিন নিতে হতো। ছেলের মৃত্যুর পর বেড়ে গেছে ইনসুলিনের পরিমাণ। খাওয়া-দাওয়া একেবারে বন্ধ। কিছুক্ষণ পরপরই ছেলের নাম করে বিলাপ করে উঠেন।
খুন হওয়া বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের বাসায় গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য। গত ১২ মে নগরীর সুবিদবাজারস্থ নিজ বাসার সামনে উগ্রবাদীদের হামলায় খুন হন অনন্ত বিজয় দাশ। বিজ্ঞানভিত্তিক লেখালেখির কারণে যিনি দীর্ঘদিন ধরেই উগ্রবাদীদের হুমকীর মুখে ছিলেন।
অন্তত বিজয় হত্যার দু'মাস অতিবাহিত হচ্ছে আজ। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা ছাড়া বাকী সবাই এ দু'মাসেই যেনো ভুলে গেছে অনন্ত বিজয়ের কথা।
অনন্ত হত্যার পর সিলেট থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমবেদনা জানাতে অনেকে সুবিদবাজার নুরানী আবাসিক এলাকার তাদের বাড়িটিতে আসলেও এখন আর খোঁজ নেন না তেমন কেউ।
প্রথম প্রথম ব্যাপক তৎপরতা দেখালেও এখন আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীরও খোঁজ নেয় না এই পরিবারের। হত্যার বিচার দাবিতে আন্দোলন, মিডিয়া কাভারেজ সব থেমে গেছে। কেবল পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটিকে হারানোর যন্ত্রনা বয়ে বেড়াচ্ছে এই পরিবারের সদস্যরা।
সকালে ব্যাংকে যাওয়ার আগে বাবা রবীন্দ্র কুমার দাশ আর মা পীযূষ রানী দাশকে ঔষধ খাইয়ে বাসা থেকে বের হতেন অনন্ত। খুন হওয়ার দিনও এই রুটিনের ব্যত্যয় ঘটেনি। এখনো প্রতিদন সকালে ঔষধ খাওয়ার সময়ে ছেলেকে খুঁজে বেড়ান বাবা, চোখ ভিজে ওঠে মায়ের।
দুই বোনের আদরের ছোট ভাই ছিলেন অনন্ত বিজয় দাশ। প্রিয় ভাইকে হারানোর এমন আচমকা আঘাত সামলে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তারা।
সুবিদবাজারের নুরানী আবাসিক এলাকার এই ছোট্ট বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এখনো শোকে যেনো পাথর হয়ে আছে পুরো বাড়ি। একান্ত প্রয়োজন না হলে বাড়ির কেউ কারো সাথে কথা বলেন না। ক্ষণে ক্ষণে বিলাপ ছাড়া এই বাড়ি থেকে তেমন কোনো শব্দ বের হয় না।
অনন্ত বিজয় দাশের বড় ভাই রত্মেশ্বর দাশ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পরিবারের কেউ এখনো সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারছে না। মা ঘুমান না। আবার হঠ্যাৎ ঘুম আসলে ঘুমের মধ্যই কেঁদে ওঠেন। বাবা বিছানায় শুয়ে শুয়ে সবসময় অনন্তকে খুঁজে বেড়ান।
অনন্তর ভগ্নিপতি এডভোকেট সমর বিজয় শী জানান, এই পরিবারে এখন বেশীরভাগ দিনই রান্না হয় না। কেউ খায় না। সবাই সব সময় মনমরা হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, অনন্ত হত্যা মামলা সিআইডিতে হাস্তান্তর হওয়ার পর সিআইডির এক কর্মকর্তা বাসায় এসে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। এরপর প্রশাসনের আর কেউ কোনো খোঁজ নেয় নি। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কেও কিছু জানি না।
আপনার মন্তব্য