১৮ জুলাই, ২০১৫ ১৫:১২
ঈদের দিন ছেলেটা অনেক হৈ-হুল্লোড় করতো। 'এলো খুশির ঈদ' গান গাইতে গাইতে সারা ঘর নেচে বেড়াত। নতুন কাপড়ের জন বায়না ধরতো। আজ আমার ছেলেটা নেই। ওরা মেরে ফেলেছে। আমার আবার কিসের ঈদ?'
এইটুকু বলেই কান্নাজুড়ে দিলেন লুবনা বেগম। হাউমাউ করে কান্না। লুবনা সিলেটে নির্মম নির্যাতনে খুন হ্ওয়া শিশু সামিউল আলম রজনের মা।
ঈদ মানে আনন্দ। মুসলমানরা তো বটেই, ধর্মীয় এই উৎসবে ভিন্ন ধর্মের মানুষেরাও শরীক হন আনন্দ-উৎসবে। তবে সিলেটের কান্দিগাও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের এই বাড়িটিতে ঈদ কোনো আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনি। বরং তাদের দুঃখটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ঈদ। সারা দেশের মাননুষ যখন মেতেছে ঈদের আনন্দে রাজনদের কুড়েঘর থেকে তখন ভেসে আসছে কান্নার শব্দ। বিলাপের সুর।
গত ঈদেও যে ছেলেটা নেচে-গেয়ে মাতিয়ে রেখেছে যে ঘর, এই ঈদে সে নেই, খুনিরা মেরে ফেলেছে। এই ভাবনটাই মাথা থেকে সরাতে পারছেন না রাজনের বাবা-মা। থামানো যাচ্ছে না চেখের জলও।
সকালে ছোট ছেলে কে নিয়ে পাশের ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান। এই পরিবারে ঈদ বলতে আজ এটুকুই। এরপর শুধু কান্না। এরপর শুধু আর্তনাদ।
সকা থেকে অনেক মানুষ যাচ্ছেন রাজনের বাড়িতে। সমবেদনা জানাচ্ছেন। বিভিন্ন ধরনের খাবার নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো খাবারই স্পর্শ করছে না কেউ।
মা লুবনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ওরা কতো কষ্ট দিয়ে আমার ছেলেটারে মারছে। আমার চোখের সামনে কেবল সে দৃশ্যই ভেসে উঠে। আমার আবার কিসের ঈদে?’
সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা, মিডিয়কর্মীরাও শনিবার সকাল থেকে ভিড় করেন রাজনের বাড়িতে। এদের উপস্থিতি স্বান্তনার বদলে আরো কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে এই পরিবারের। ছেলে হারানোর কষ্টটাকে ভুলতে দিচ্ছে না। আরে চিরন্তন করে দিচ্ছে।
রাজনের ছোট্ট ভাই। এতোকিছু বুঝার বয়স হয়ে নি তার। শুধু বুঝে তার ভাইটি নেই। তার মনেও ঈদের আনন্দ নেই। তার দাবিও একটাই, ‘ভাইয়ের খুনিদের ফাঁসি চাই।’
শনিবার সকালে বাদেয়ালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায় রাজনের বাড়িতে ঈদের আনন্দের বদলে এখন শুধুই শূন্যতা। আদরের ছেলেকে হারিয়ে রাজনের বাবা-মা আজ পাগলপ্রায়। তাদের দাবি শুধু একটাই ছেলের খুনিদের বিচার।
প্রতিবছর ঈদে ছেলে রাজনকে পরম যতেœ সেমাই মুখে তুলে দিতেন মা লুবনা আক্তার। সেই আদরের সন্তান আজ নেই। তার ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করে চলছেন মা।
দুরন্ত ছেলে আজ শান্ত হয়ে শুয়ে আছে বাড়ির পাশের কবরে। তাই নির্বাক বাবা নীরবে তাকিয়ে থাকেন ছেলের কবরের দিকে।
আজিজুর রহমান বলেন, ‘প্রতি ঈদে ছেলেটা নতুন কাপড় কিনে দেওয়ার আবদার করত। এবার ও কবরে শুয়ে আছে, আমরা কীভাবে ঈদের আনন্দ করি? আমরা তার খুনিদের বিচার চাই।’
ভিডিও :
আপনার মন্তব্য