ইব্রাহিম চৌধুরী

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:৪৫

ধীরেন সিংহ : সিলেটের মনিপুরি রাজবাড়ি থেকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে

কমরেড ধীরেন সিংহ ।
নিউইয়র্কে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে। প্রতি বছর অনেকেই আসেন। কেউ সঙ্গে আসেন। কেউ সঙ্গী হয়ে আসেন।সঙ্গে আসা কেউ কেউ আবার নিজের ভাড়ায় একই বিমানে আসেন। সঙ্গে আসা এসব “গুরুত্বপূর্ণ” লোকজন এসে নানাভাবে যোগাযোগ করেন। বলেন, নামটা যেন একটু লাগিয়ে দেই।

“সঙ্গে আসা” লোকজন জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে নানা ভঙ্গিমায় ছবি উঠান।ভেতরে বসে কানে মাইক্রোফোন লাগিয়ে সেলফিও তুলেন।এবারে একজন খুনের মামলার আসামীও এসেছিলেন। বিশ্বশান্তি নিয়ে রাষ্ট্র নেতাদের দুশ্চিন্তার সাথে নিজেরা একাত্ম হয়ে যাওয়ার ভান করেন। মুখে সব কষ্ট ধারন করে তাদের ছবি ভেসে বেড়ায় । কিছু ধান্দাবাজও আসেন। যারা সঙ্গে আসার খবর ব্যবহার করে নিজেদের ধান্ধা করতে থাকেন।কেউ কেউ থেকে যান অথবা থাকার খুঁজ খবর নেন। নিউইয়র্কে আমাদের এসব “ সেপ্টেম্বর অতিথি” নিয়ে নানা গল্প চালু হয়েছে।

প্রতিবছরই আমাদের প্রধান মন্ত্রী তাঁর সঙ্গে নিয়ে আসেন কিছু ব্যতিক্রমী লোকজনকে। এর মধ্যে থাকেন কবি সাহিত্যিক বা একদম প্রান্তিক জনপদের রাজনৈতিক নেতাদের কেউ। এবারে আমার শহরের খেটে খাওয়া মানুষের জন্য আজন্ম লড়াকু কমরেড ধীরেন সিংহ আসছেন, এমন খবর শুনে কৃতজ্ঞতায় চোখটা ভিজে গেলো।

সত্তর দশক থেকে কমরেড ধীরেন সিংহ আমার চেনা জানা। কমরেড আসদ্দর আলী, আশিক চৌধুরীদের সাথে প্রথম দেখি। “লাল বই” নিয়ে তাঁরা হাঁটতেন।ষাটের দশক থেকে বঞ্ছিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে মাঠের কর্মি, সংঠক ধীরেন সিংহ।এখন সাম্যবাদী দলের কেন্ত্রীয় পলিট ব্যুরোর সদস্য। একজন খাঁটি, নির্লোভ, নিবেদিতপ্রাণ ধীরেন সিংহ পূঁজিবাদের ভিত্তিভুমিতে দাড়িয়ে আলিঙ্গন করেন। মুহূর্তে মনটা উতলা হয়ে পড়ে। সহযোদ্ধা শাহাব উদ্দিন সহ আমাদের রাতটি চঞ্চল হয়ে উঠে।

কাপড়ের থলেতে বা বুক পকেটে রাখা লাল রংয়ের বইগুলোতে হয়তো ধুলো জমেছে।বৃষ্টি বাদলে লড়ে যাওয়ার ছাতা হয় ভেঙ্গেছে, না হয় নুয়ে পড়েছে।ভাঙ্গা ছাতার মালিকানা নিয়েও তর্ক, দ্বন্দ্ব কম হয়নি।

আজকের সময়ে অনেকের ধারনায় নেই, কতোটা উন্মাদনা ছিল বঞ্চিত সর্বহারাদের মুক্তির লড়াইয়ে।লড়াইটাতো এখনো চলমান। এখনো ধীরেন সিংহের মতো কিছু লড়াকু ঋজু ভঙ্গিমায়, দৃপ্ততার সাথে বলে চলেন বঞ্চিত মানুষের মুক্তির কথা।

নিউইয়র্কে এসেই ফোন দিলেন। নম্বারটা নিয়ে এসেছিলেন বন্ধু এডভোকেট শাহীনের কাছ থেকে। সেপ্টেম্বরের এ সময়ে “নগর ভোজনে” আসা লোকজনকে নানাভাবে এড়িয়ে চলতে হয়।খোদ প্রধান মন্ত্রীর উপস্থিতে আমাদের কর্ম ব্যস্ততাও বেড়ে যায় নানা অবিধায়।

কমরেড ধীরেন সিংহের ফোন আমাকে উতলা করে তুলে। ফিরে যাই, দ্রোহকালে। প্রয়াত কমরেড ম আ মুক্তাদিরের স্মরণ সভা চলছিল, ধীরেন দা কে দ্রুত নিয়ে আসা হয়। যত সব “আউলা কাজ” বাতিল করে ঘোষনা দেই, আমাদের কাছে ধীরেন সিংহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টি ব্যক্তিগত। অনেক সতীর্থ সংবাদ কর্মীরা ব্যাপারটা বুঝেন না। তাদের অবশ্য এসব বুঝার সময়ও নেই।

ধীরেন দা’কে জিজ্ঞেস করি, কেমন লাগছে পূঁজিবাদের এ তীর্থকেন্দ্রে? পাচতারা হোটেল, সরকারী সব প্রটোকল।

চিরচেনা হাসি দিয়ে ধীরেন সিংহ জানান, ভোগবাদের জীবনে তাঁর অনভ্যস্থতার কথা। অকপটে বলেন। হোটেলের এ সি বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছেন। ভোগ বিলাসের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে নিজের অজ্ঞতা আর অনভ্যস্থতার কথা জানালেন। সঙ্গে আসা কেন্দ্রীয় নেতা শরীফ নুরুল আম্বিয়া এবং কমরেড বিমল বিশ্বাস আছেন বলে ভরশা পাচ্ছেন- জানালেন।
নিউইয়র্কে মাথা উঁচিয়ে ধীরেন সিংহ পূজিবাদের আস্ফালন দেখছেন। জানালেন, প্রবাসীদের আচরণে তিনি মুগ্ধ।আমি দেখছিলাম, তিন দশক কাছে থেকে দেখা এক মাঠের রাজনীতিবিদকে।দেখছিলাম শ্রমিক কর্মচারীদের টানা সব আন্দোলন সংগ্রামের চির চেনা নির্লোভ, কোন অহমিকা ছাড়া এক বিনয়ী সংগঠককে।

ইচ্ছে করেই সব চাকচিক্য জনদের এড়িয়ে কমরেড ধীরেন সিংহ কে নিয়ে টিভি টক শো তে বসলাম। ধারণ করা এ আলোচনায় ধীরেন সিংহ দৃড়তার সাথে দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের কথা বললেন। বললেন, বাম আন্দোলনের বর্তমান কৌশলের কথা।অকপটে বামদের বিচ্যুতির কথা জানালেন। ব্যর্থতা, অর্জন সবই উপস্থাপন করলেন যুক্তি দিয়ে। লেলিন, মার্ক্সের রেফারেন্স টেনে জবাব দিলেন চিন্তায়-কর্মে স্বচ্ছ এক সংগঠক হিসাবে।পাশে বসে নিজেকে ম্লান মনে করেও গর্ব বোধ করলাম।

(অনুষ্টানটি দেখা যাবে www.timetvusa,com এ নিউইয়র্ক সময় শনিবার রাত ১১ টায়/ বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৯টায়)।

অনেকেই আসেন। বসি। বসতে হয়। ইচ্ছায়, অনিচ্ছায়।মনের কথা গোপন করে সহাস্যে বন্ধনাও করি। কিছু মানুষ আছেন,যাদের সান্নিধ্য তাড়িত করে, আপ্লূত করে। কমরেড ধীরেন সিংহ কে পাশে বসিয়ে বুকটা উল্লাসে মেতে উঠে। কিছু মানুষ এখনো নিজেকে বিলীন করে বঞ্চিত মানুষের কথা বলেন। নিজেকে নিয়ে তাদের ভাবনা নেই কোন। ত্যাগী এ মানূষগুলো ক্রমশঃই বিরল হয়ে যাচ্ছেন। বঞ্চিত মানুষের মুক্তির জন্য এখনো আদর্শের পতাকা বহন করে শেরপার মতো যারা যাত্রা অব্যাহত রাখেন, তাদের প্রতিনিধি কমরেড ধীরেন সিংহ।
মধ্যরাতে পূজিবাদের রাজকন্যার উন্মত্ততা বাড়ে। দ্রুত চলা এ নগরীতে সময় দ্রুত ধাবমান। সব কোলাহল ছাপিয়ে মনটা হাহাকার করে উঠে। বিদায় জানাবার সময় উষ্ণ আলঙ্গনে জড়ানো হয়নি।

রাত বাড়লেও এ নগরীতে কুকুরের ঘেউ ঘেউ নেই।শিয়ালের ডাক নেই।এখানে কাক ডেকে ভোর আনে না।সবুজ ঘাসে শিশির পড়া দেখা যায় না।

উল্লাস উন্মত্ততার মধ্যে আছে এখানে ভিন্ন কান্না, ভিন্ন হাহাকার।কমরেড ধীরেন সিংহ, আপনি কি শুনতে পারলেন পূঁজিবাদের পাপিষ্ট কান্নার আওয়াজ?

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য

আলোচিত