০৩ ফেব্রুয়ারি , ২০২৬ ১৮:০৯
ছবি: সংগৃহীত
‘হ্যাঁ’, ‘না’ ভোট, এটা হলো অপ্রয়োজনীয়, প্রতারণাপূর্ণ উল্লেখ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলে গণভোটে কিছুতেই ‘হ্যাঁ’কে জিততে দেওয়া হবে না।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার কনফারেন্স হলে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণে আদিবাসী জনগণের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক আলোচনায় এ কথা বলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম।
তিনি বলেন যারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, তারা ইতিমধ্যে হেরে গেছে উল্লেখ করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘তার প্রমাণ, জনগণের ওপরে যদি ছেড়ে দিত, তারা বুঝে গেছে এটা “হ্যাঁ”–এর পক্ষে যাবে না। তার জন্য সরকারি টাকা খরচ করে প্রশাসনকে অর্ডার দিয়ে সবকিছু করা হচ্ছে।’
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সব সময় বঞ্চিত করেছে। এর অন্যতম কারণ, তাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল।’ আগামী দিনে গরিব, মেহনতি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে আবারও একটা গণ–অভ্যুথান সৃষ্টি হবে বলে উল্লেখ করেন এই বামপন্থী রাজনীতিবিদ। গণ–অভ্যুত্থানের পর নয়া বন্দোবস্তের কথা বলা হলেও বাস্তবে সমাজের প্রতিটি স্তরে বৈষম্য এখনো বিরাজমান বলে উল্লেখ করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তিনি বলেন, দেশ পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল জনগণের কথায়, জনগণের ইচ্ছায়। সংস্কারের কথা বলে দেশকে পেছনে নেওয়ার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি উঠেপড়ে লেগেছে।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধিবাসীদের পেছনে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। যদিও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও বিষয়টিকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি।
সতেজ চাকমা মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের বরাতে জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর ৯৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪১টি ঘটনা রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন–সম্পর্কিত। এসব ঘটনায় ৯ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সতেজ চাকমা আরো বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠিত হবে, কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি; বরং অনেকগুলো কমিশন হলেও আদিবাসীদের নিয়ে কোনো কমিশন গঠিত হয়নি। তারা উপেক্ষিত থেকে গেছে।’ আদিবাসী যুব ফোরামের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সতেজ চাকমা ছয়টি দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিচয়ের স্বীকৃতি; ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি; পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন; প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল; সংসদে আসন সংরক্ষণ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জাতিসমূহের নিজ নিজ ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু।
যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরা সঞ্চালনায় আলোচনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সহসভাপতি অমর শান্তি চাকমা।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে উল্লেখ করে আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনগণ সব সময় রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। রাষ্ট্র তাদের নাগরিক সুরক্ষা দিতে পারেনি। অন্যদিকে পার্বত্য চুক্তিকে বাতিল করার জন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পাহাড়ে সামরিক নীতি প্রয়োগ করে সেখানকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধিবাসীদের ওপর দমন-পীড়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া সমতলের অধিবাসীদের ওপরও বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী কর্তৃক দমন-পীড়ন চলমান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের অধিকার কখনো নিশ্চিত করা হয়নি। রাষ্ট্র বরাবর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা উচ্চারণ করে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
বাসদের সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, নির্বাচনের সময় দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনগণ ভয়ের মধ্যে থাকেন। কারণ, ভোট দেওয়ার আগে বা পরে তাঁরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের দ্বারা নিপীড়নের শিকার হন।
রাজেকুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। সেখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধিবাসীদের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে, সাধারণ জনগণের কথা উপেক্ষিত করা হয়েছে। নাগরিক অধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু রাষ্ট্র বারবার প্রতারণা করে যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, বাংলাদেশ কোনো একক জাতি রাষ্ট্র নয়, কিন্তু জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম।
তাসলিমা আখতারন আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান পর্যন্ত সব জাতিসত্তার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু সেই ইতিহাস সংরক্ষিত নেই। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধিবাসীদের অধিকারকে বারবার অস্বীকার করা হচ্ছে। যারাই ক্ষমতায় যায়, তারা তাদের অধিকারের কথা ভুলে যায়।
যুব ফোরামের সভাপতি টনি চিরান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্র নাথ মাহাতো, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য রিপন বানাই, মানবাধিকারকর্মী ত্রিজিনাদ চাকমা প্রমুখ।
আপনার মন্তব্য