কমলগঞ্জ প্রতিনিধি

০৪ নভেম্বর, ২০২৬ ০০:২০

সিলেটের ট্রেন যাত্রীদের আতঙ্কের নাম লাউয়াছড়া, আট মাসে ২০ বার বিকল

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া আখাউড়া-সিলেট রেলপথ এখন ট্রেনের যাত্রীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। বনের ভেতর মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের আঁকাবাঁকা ও ঝুঁকিপূর্ণ এ পাহাড়ি রেলপথে ট্রেন বিকল হওয়া বা লাইনচ্যুত হওয়া যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর রাতে আন্তঃনগর ‘কালনী এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ১ ঘণ্টা এবং পরদিন ২ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রামগামী ‘পাহাড়িকা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের হুক ছিঁড়ে ৯টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে ৩ ঘণ্টা ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসেই অন্তত ২০ বার ইঞ্জিন বিকল হয়ে লাউয়াছড়ার নির্জন বনে আটকে পড়েছে একাধিক যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে করে যেমন যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি, তেমনি দেখা দিচ্ছে মারাত্মক শিডিউল বিপর্যয়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৮ সালে তৎকালীন আসাম-চট্টগ্রাম যোগাযোগের জন্য নির্মিত এ রেললাইনটি শতবছরেরও বেশি পুরোনো। জীর্ণ এ পথে বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে, যাতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।

রেললাইন সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী লাউয়াছড়া বনের ভেতরের অংশে স্লিপারের নাট-বল্টু ও ক্লিপের বেশিরভাগই উধাও। কিছু জায়গায় ঢিলে হয়ে যাওয়া ক্লিপে নামমাত্র ঝালাই দেওয়া হয়েছে, আবার অনেক স্থানে নাট তার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, লাউয়াছড়া বনের ‘ভাঙা ব্রিজ’ এলাকার রেললাইনের ঢাল অনেক বেশি। এ পাহাড়ি উঁচু পথে ট্রেন টেনে তোলার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতার ইঞ্জিনের প্রয়োজন হলেও সিলেট রুটে সরবরাহ করা হয়েছে ১৮-১৯ বছরের পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ২৯০০ ও ২৬১০ সিরিজের ইঞ্জিন।

শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের তথ্যমতে, ঢাকা থেকে যে ইঞ্জিন নিয়ে ট্রেন সিলেটে যায়, পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় সেই একই পুরোনো ইঞ্জিন দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরতি ট্রেন চালাতে হয়। পাহাড়ি ঢাল বা উঁচুতে ওঠার সময় পুরোনো ইঞ্জিনের প্রেসার কমে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ট্রেন মাঝপথে থেমে যায়। কোনো কোনো ট্রেনে বগি সংখ্যা বাড়ানো হলেও ইঞ্জিনের সক্ষমতা না বাড়ানোয় যান্ত্রিক ত্রুটির হার কমছে না।

চলতি বছরে লাউয়াছড়ার ভেতরে গত ৭ ফেব্রুয়ারি পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ইঞ্জিন বিকল হয়ে ৫ ঘণ্টা আটকে থাকে। ১ মার্চ রাতে উপবন এক্সপ্রেস ৫ ঘণ্টা আটকে ছিল। ৭ মার্চ ও ১৯ মার্চ কালনী এক্সপ্রেস আটকে দেড় ও দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। ১ এপ্রিল কালনী এক্সপ্রেস ৫ ঘণ্টা আটকে ছিল। ২৯ মে তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। সর্বশেষ ১ ও ২ অক্টোবর কালনী ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল ও বগি বিচ্ছিন্ন ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।

জানা গেছে, ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় আখাউড়া-সিলেট মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের জন্য ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময়েও মাঠপর্যায়ে কাজের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।

এ অবস্থায় সিলেটের জীর্ণ রেলপথ সংস্কার ও নতুন ট্রেনের দাবিতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ‘আট দফা দাবি বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদ’ লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে।

পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক আজিজুল ইসলাম বলেন, সিলেট বিভাগের রেলপথ আজ চরম অবহেলিত। দীর্ঘদিনের বেহাল অবস্থা দূর করতে আমরা মানববন্ধন ও ট্রেন অবরোধের মতো কর্মসূচি দিয়েছি, সরকারের দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) কাজী নাজমুল হক বলেন, প্রায়ই লাউয়াছড়া বনের ভেতর মাগুরছড়া এলাকায় ট্রেন আটকে পড়ার খবর পাই। বন বিভাগের কর্মীরা সাধ্যমতো সহায়তা করে থাকে।

ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার গৌড় প্রসাদ দাস পলাশ বলেন, লাউয়াছড়ার ভাঙা ব্রিজ এলাকায় পাহাড়ি চড়াইয়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই আন্তঃনগর ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত ৮ মাসে অন্তত ২০ বার এ ঘটনা ঘটেছে।

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী, মো. সাইফুল্লাহ বলেন, লাউয়াছড়া পথটি পাহাড়ি হওয়ায় গতি কমিয়ে সতর্কতার সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। আমাদের প্রকৌশল টিম নিয়মিত রেললাইন পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, নতুন ইঞ্জিনের সংকটের কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই ট্রেন চালাতে হচ্ছে, যা কাঙ্ক্ষিত গতি তুলতে পারছে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত