COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

49

Confirmed Cases,
Bangladesh

05

Deaths in
Bangladesh

19

Total
Recovered

771,765

Worldwide
Cases

37,001

Deaths
Worldwide

160,243

Total
Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

সুমনকুমার দাশ

১৬ ফেব্রুয়ারি , ২০২০ ১৭:৫৩

ভাষাসংগ্রামী ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী

স্কেচ: কুমার অনিক কুন্ডু

ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম ১৯৩১ সালের ১ জানুয়ারি। বাবা ছাদউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মা কমরুন্নেছা চৌধুরী। বালক বয়সে তাঁর মা মারা যাওয়ার পর বাবা ছাদউদ্দিন সুফিয়া খানম চৌধুরীকে বিয়ে করেন। ছদরুদ্দিনরা পাঁচ ভাই ও ছয় বোন।

নিজ গ্রামের বইটিকর পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ নিয়েছেন। পাঠশালায় পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বাড়িতে ধর্মীয় শিক্ষাও লাভ করেন। ১৯৪১ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় তৎকালীন আসাম প্রদেশে মুসলমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে বৃত্তি পাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি কিছুকাল নিজ উপজেলা গোলাপগঞ্জের এমসি একাডেমিতে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ১৯৪৩ সালে তিনি সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলে ভর্তি হন এবং এ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৪৯ সালে গণিত ও মেকানিক্স বিষয়ে লেটার মার্কসসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। বিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী নানকার বিদ্রোহ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দেশভাগ ও সিলেটের গণভোট প্রত্যক্ষ করেন। ১৯৫১ সালে সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে আইএসসি-তে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে তিনি স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে ‘এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ক্রিস্টালোগ্রাফি বিষয়ে গবেষণা ছাড়াও ‘হিউম্যান ইনসুলিন’ তাঁর মৌলিক আবিষ্কার।

দুই
ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাবস্থায় ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি আদায়ের সংগ্রামে দেশ তখন উত্তাল। সময়টা ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সে সময় ছদরুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই মিছিল-মিটিং কিংবা গোপন সভা হতো ভাষাসংগ্রামীদের। সেসব কর্মকাণ্ডে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন তরুণ ছাত্র ছদরুদ্দিন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশি বাঁধা উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিষয়টি ছদরুদ্দিন তাঁর ‘আত্মকথা’য় খুবই গোছালোভাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর সে সময়কার স্মৃতিচারণ নিম্নরূপ-

আমরা কলাভবনের সামনের চত্বর থেকে ১৫/২০ জনের এক-একটি দল করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে গেট দিয়ে বের হয়ে সংসদ অভিমুখে রওয়ানা হবো ঠিক হলো। প্রথমে দুটো ছাত্রীদের দল রওয়ানা হলো, তারপর সাইকেলের একটা দল হেঁটে যাত্রা করল, এরপরে ছাত্রদের এক-একটি দল রওয়ানা হলো। কিন্তু কাউকে সংসদ ভবনের সন্নিকটে যেতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস শুরু হয়ে যায়। পুলিশের লাঠিচার্জে অনেকেই আহত হয়ে মেডিক্যাল কলেজের ইমারজেন্সিতে আসে। জানতে পারলাম আমাদের কবির আহত হয়েছে। তাকে দেখতে ইমারজেন্সিতে গেলাম। কবির সাইকেলের দলে ছিল। সে লাঠির আঘাতে একটু আহত হয়। ফাস্ট এইড দিয়ে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। আমি জীবনে এই প্রথম টিয়ার গ্যাসের সম্মুখীন হই। মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাস বিরাট, তাই ছাত্ররা চারিদিক থেকে ঢিল, পাথর পুলিশদের দিকে ছুঁড়তে শুরু করে। আমরা যারা অত্যধিক টিয়ার গ্যাসে ভুগছিলাম, দৌঁড়ে ইমারজেন্সি কামরায় চলে যেতাম এবং কিছু ওষুধ চোখে দিয়ে আসতাম। কলকাতা থেকে যেসব ছাত্র এখানে এসে ভর্তি হয়েছিল তাদের টিয়ার গ্যাসের শেলগুলো উল্টো আবার পুলিশের ওপর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। ক্যাম্পাসে নির্মাণ কাজের জন্য রাখা ইট, পাথর পুলিশের ওপর ছাত্ররা অবিরাম নিক্ষেপ করতে লাগল। আর্মি ও পুলিশ তখন ছাত্রদের ধাওয়া করলে ছাত্ররা পাল্টা ঢিল পাথর ছোঁড়া অব্যাহত রাখে। এভাবে প্রায় ২ ঘণ্টা ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ইত্যাদি চলতে থাকল। এমন সময় হঠাৎ গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বরকত, সালামের মরদেহ দেখলাম। এ সময় বর্তমান শহীদমিনারের স্থানে ছাত্ররা মাইক ফিট করে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে শুরু করল। সংসদ থেকে কিছু কিছু সাংসদ তখন বেরিয়ে আসতে শুরু করলেন। গুলি হওয়ার সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন অফিস আদালত, দোকানপাট বন্ধ করে মেডিকেল কলেজের দিকে ছুটল। মানুষের ঢল ক্রমেই বাড়তে শুরু করে। আমি ওই ফাঁকে কবিরকে দেখতে তার ভগ্নীপতি, ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল, সমছুজ্জামান চৌধুরীর বাসায় গেলাম। পরের দিন আবার অনেক মিছিল ও সভা হলো। তখনও পুলিশ জনতার ওপর আক্রমণ করে। কিন্তু মানুষের বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করায় নুরুল আমিন সরকার তখন সংসদ অধিবেশন বন্ধ করতে বাধ্য হলো। অবশেষে নাজিমউদ্দিন, নুরুল আমিন সরকার বাংলার মানুষের কাছে হার মানল। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো।

তিন
১৯৬০ সালের ২৫ ডিসেম্বর ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁর ফুফাতো বোন মোসাম্মৎ খালেদা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এর আগে ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহী কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরীর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর পদার্থবিদ্যা ভবনে তাঁর পাঠদান কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান অনুষদে প্রথমবারের মতো শিক্ষা কার্যক্রম চালুর আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। ১৯৮৯ সালের ১ জুন সিলেটের নবপ্রতিষ্ঠিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের ১ ডিসেম্বর সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১০ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি সে পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন।

চার
ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী কেবল ভাষাসংগ্রামীই নন, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধেও সংগঠনের ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজশাহীতে দেওয়া সংবর্ধনায় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। একজন লেখক হিসেবেও তাঁর সমান জনপ্রিয়তা ছিল। দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর বহু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। স্নাতক (সম্মান) শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর লেখা ‘ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান’ (১৯৮১) বইটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে। তাঁর রচিত ‘আত্মকথা’ (২০১০) নামের একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। বইটির পরিবেশক ঢাকার উৎস প্রকাশন।

নানামুখী সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর তিন মেয়ে রয়েছেন। ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই শনিবার বেলা সাড়ে তিনটায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাতেই তাঁর মরদেহ সিলেটে নিয়ে আসা হয়।

সহজসরল জীবনযাপনের অধিকারী অধ্যাপক ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী। আজীবন নিমগ্ন সাধনার শিক্ষাচর্চাবিদ প্রিয় এ মানুষটিকে চোখের জলে তাঁর গুণগ্রাহী সবাই শেষ বিদায় জানান।

ভাষাসৈনিক সম্মাননা ২০২০ স্মারকগ্রন্থ ‘শব্দগান রক্তমিতা’য় প্রকাশিত।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত