COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

49

Confirmed Cases,
Bangladesh

05

Deaths in
Bangladesh

19

Total
Recovered

770,165

Worldwide
Cases

36,938

Deaths
Worldwide

160,243

Total
Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

শাহীন আলম

১৬ ফেব্রুয়ারি , ২০২০ ০১:৫৯

স্মরণীয়-বরণীয় অ্যাডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ

স্কেচ: কুমার অনিক কুন্ডু

প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, প্রথিতযশা আইনজীবী, মহান ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক, অ্যাডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সদস্য হিসেবে ১৯২৩ সালের ১১ জানুয়ারি আসাম প্রদেশের তৎকালীন কাছাড় জেলার হাইলাকান্দি মহকুমায়। তাঁর নানা মরহুম মহি উদ্দিনের মালিকাধীন কুচিলা চা-বাগানে জন্ম গ্রহণ করেন। সিলেট জেলার, গোলাপগঞ্জ উপজেলার সতুনমর্দন গ্রামে ‘ডেপুটি বাড়ি’ তাঁর পৈত্রিক নিবাস। তাঁর পিতা সাবেক জেলার মরহুম আব্দুর রহমান ও মাতা মস্তুরা খাতুন অত্যন্ত সৎ ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন।

অ্যাডভোকেট মনির উদ্দিন আহমদ ডেপুটি বাড়ি সংলগ্ন ডেপুটি বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পরে তাঁর নানার বাড়ি হাইলাকান্দি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪১ সালে মাধ্যমিকে ২য় বিভাগে, ১৯৪৩ সালে সিলেটের মুরারিচাঁদ (এম সি) কলেজ হতে ইতিহাসে লেটার মার্কসহ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসামের শিলচর গুরুচরণ কলেজ থেকে ১৯৪৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৪৮ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিন বিষয়ে সম্মানসূচক নম্বরসহ কৃতিত্বের সাথে এল এল বি ডিগ্রি এবং একই বছর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইতিহাস বিষয়ে ২য় বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫০ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে ১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল হতে তৎকালীন বিশিষ্ট আইনজীবী মরহুম এ এ এ হাফিজ সাহেবের জুনিয়র হিসেবে আইন পেশার সূত্রপাত করে পাকিস্তান আমলে ২১ বছর এবং বাংলাদেশ আমলে ৩০ বছর ব্যাপী একনিষ্ঠভাবে আইন পেশায় অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালে পর পর দু’বার সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২-১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এক নাগাড়ে ১৩ বছর সততা, নিষ্ঠা ও সম্মানের সাথে সিলেট জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এর দায়িত্ব পালন করেন। অ্যাডভোকেট মানির উদ্দিন আহমদ ১৯৮২-১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সিলেট ল’কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং ১৯৮৭-২০০৭ সাল পর্যন্ত অধ্যক্ষ হিসেবে সম্মানের সাথে দায়িত্ব পালন করে উক্ত কলেজটিকে দেশের একটি অন্যতম আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পরীক্ষক ও মডারেশন কমিটির সদস্য, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গোলাপগঞ্জ কুশিয়ারা কলেজ, পল্লীমঙ্গল হাসপাতাল, সিলেট শহরের চালিবন্দরে অবস্থিত বসন্ত মেমোরিয়াল স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অনন্য সৃষ্টিশীল কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

আইন পেশার পাশাপাশি শ্রেণি সচেতনভাবে, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ হিসেবে শোষণহীন ও শ্রেণিহীন সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছেন। ছাত্রজীবনে ১৯৪০ সালে তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন এবং ঐ বছরেই উক্ত ছাত্র সংগঠনের হাইলাকান্দি মহকুমা কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কাছাড় জেলা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানে দাঙ্গা সৃষ্টি হলে তিনি দাঙ্গার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সিলেট জেলা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী শান্তি কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সিলেট অঞ্চলে নানকার প্রথা বিরোধী আন্দোলন এবং সারা প্রদেশব্যাপী তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন। দেশ বিভাগের সময় ১৯৪৭ সালে সিলেটের রেফারেন্ডামে, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তরুণ আইনজীবী হিসেবে গুরুত্ব ভূমিকা পালন করেন। ভাষার দাবীতে ১৯৪৭ সালের ৯ নভেম্বর সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে প্রথম সভা এবং ১৯৪৮ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে গোবিন্দ পার্কের জনসভায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার খবর সিলেটে পৌঁছলে তিনি সহ আইনজীবীরা আদালত ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসে ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে বিশাল মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেন। উক্ত সমাবেশ থেকে ধর্মঘট আহবান করা হয় এবং ২০-২৫ দিন সিলেটের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯৫২ সালে ঢাকায় ছাত্র ইউনিয়নের সৃষ্টির পূর্বে সিলেটে ছাত্র ইউনিয়ন নামের সংগঠন গড়ে তুলতে পুলিশি বাধার মুখেও যারা অবদান রেখে গেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মনির উদ্দিন আহমদ। ছাত্র ইউনিয়ন গঠন প্রক্রিয়ায় জড়িতদের মধ্যে অন্যান্য যাঁদের নাম জানা যায় তাঁরা হচ্ছেন অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন আহমদ খান, কমরেড আসদ্দর আলী, ওয়ারিছ আলী ও মওলানা শামছুল হক প্রমুখ।

১৯৫০ এর দশকে কমিউনিস্ট ভাবধারায় প্রগতিশীল ছাত্র যুব নেতা কর্মীরা পূর্ব পাকিস্তান ‘যুবলীগ’ গঠন করলে মনির উদ্দিন আহমদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। হাজী মোহাম্মদ দানেশের নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত সংগঠন ‘গণতন্ত্রী দল’ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি গণতন্ত্রী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকেন এবং সিলেট জেলার ন্যাপের প্রথম কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তীতে সভাপতি ও প্রাদেশিক কমিটির সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন।

মনির উদ্দিন আহমদ আইন পেশা ও রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক আন্দোলনেও আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির লেবার ইউনিয়ন, সিলেট ইলেকট্রিক সাপ্লাই শ্রমিক ইউনিয়ন, আজিজ গ্লাস ফ্যাক্টরির শ্রমিক ইউনিয়ন, সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি প্রভৃতি সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত চা-শ্রমিকদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে জননেতা ও ভাষা সৈনিক মফিজ আলীর সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পূর্ব পাকিস্তান চা-শ্রমিক সংঘের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। সম্মেলনের মাধ্যমে সকল শ্রমিক সংগঠনকে একত্রিত করে পূর্ব ‘পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন’ গঠিত হলে তিনি সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং উক্ত সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন। এদেশের সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা কমরেড আব্দুল হকের সাথে ছিল তাঁর গভীর আদর্শিক সখ্যতা। আমৃত্যু তিনি সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থেকে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রেখে গেছেন। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ আয়োজিত সভা ও কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করেছেন।

মনির উদ্দিন আহমদের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন সংগ্রামের জন্য ১৯৫৩ সালে গণতন্ত্রী দল করার সময় প্রথম কারাবরণ করেন এবং ২১ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার কিছুদিন পরেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা বাতিল করে শাসন তন্ত্রের ৯২ (ক) ধারা জারির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন জারি করেন। এসময় যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আবারো গ্রেপ্তার হন এবং প্রথমে সিলেট কারাগারে পরবর্তীতে ঢাকা কারাগারে স্থানান্তরিত হয়ে এক বছর কারাভোগ করেন। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানের সময় ন্যাপের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য আবারো গ্রেপ্তার হন এবং এক মাস কারাভোগ করেন। বাবা যে জেলের জেলার তিনি সেই জেলেয়ই রাজনীতির কারণে তিনবার জেল খাটেন।

মনির উদ্দিন আহমদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কর্ম জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ সিলেট জেলা পুলিশ সুপার থেকে ‘অমর একুশে বই মেলা-২০১১’ স্মারক সম্মাননা। সিলেট পুলিশ সুপার, সিলেট বার এসোসিয়েশন, গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থেকে পেয়েছেন সম্মাননা।

ব্যক্তি জীবনে মনির উদ্দিন আহমদ এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। মহান এই ব্যক্তি ২০১৯ সালের ২ মে দিবাগত রাত ১১.৪৫ মিনিটের সময় সিলেট মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

শাহীন আলম: শিক্ষক।
ভাষাসৈনিক সম্মাননা ২০২০ স্মারকগ্রন্থ ‘শব্দগান রক্তমিতা’য় প্রকাশিত।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত