ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—২

 প্রকাশিত: ২০২৫-১২-০৯ ০৪:২৪:২৬

 আপডেট: ২০২৫-১২-০৯ ০৪:২৫:৪৭

রিপন ঘোষ:

২. শিকারি ও এক ফোঁটা মমতা
দেখার হাওরের ওপর দিয়ে ভোরের আলো ফুটেছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির পর আকাশ আজ অদ্ভুত রকমের নীল। মেঘের ছাড়পত্র নিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে সোনালী রোদ আছড়ে পড়ছে হাওরের ঘোলাটে জলে। বৃষ্টি না থাকায় গত রাতের উত্তাল হাওর আজ বেশ শান্ত।

কিন্তু সেই শান্ত জলে শত শত ডিঙি নৌকা গোল হয়ে ঘিরে ধরেছে দেওয়ান সাহেবের সুসজ্জিত ভাওয়ালি নৌকাগুলোকে। যেন এক জলযুদ্ধ আসন্ন।

কিন্তু এ যুদ্ধ মানুষের নয়, এ যুদ্ধ পাখির। দেওয়ান সাহেবের শখ সাধারণ মানুষের কল্পনার সীমানা ছাড়িয়ে যায়। তার শতাধিক পোষা কোড়া পাখি আছে, যাদের দেখাশোনার জন্য তিনি অঢেল অর্থ ব্যয় করেন। পাখি একেকটার নামও বিচিত্র; লাল পাহাড়, আগুন, তুফান। এদের সেবা করার জন্য নিযুক্ত আছে বহু দাসী, যারা রাজপুত্রের মতো এদের যত্ন নেয় । আজ তার সেরা কোড়া পাখিকে খাঁচা থেকে বের করা হলো। পাখিটার ঝুঁটি রক্তজবা ফুলের মতো লাল, চোখ দুটো হিংস্র শিকারি বাজের মতো, আর পায়ে ধারালো নখ।

দেওয়ান সাহেব বজরার ছাদে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছেন। তার পরনে আজ শিকারি পোশাক, পায়ে উঁচু বুট, কোমরে গোঁজা পিস্তল। তার উল্টো দিকের নৌকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী জমিদার, ছাতকের মির্জা সাহেব তার কোড়া নামালেন। বাতাসে তখন টানটান উত্তেজনা। কয়েক শ মানুষ শ্বাসরোধ করে তাকিয়ে আছে। বাজি ধরা হয়েছে হাজার টাকার। টাকাটা দেওয়ান সাহেবের কাছে ধুলোর সমান, কিন্তু তার জেদ পাহাড়ের সমান। তিনি হারতে জানেন না।

“শুরু হোক!” দেওয়ান সাহেবের ভরাট কণ্ঠস্বর হাওরের জল ছুঁয়ে প্রতিধ্বনিত হলো।

খাঁচার দরজা খুলতেই দুটি বুনো স্বভাবের পাখি ঝাঁপিয়ে পড়ল একে অপরের ওপর। ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর তীক্ষ্ণ চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। নখ আর ঠোঁটের ভয়ংকর আক্রমণে রক্ত ছিটকে পড়ছে নৌকার পাটাতনে। দেওয়ান সাহেবের চোখ চকচক করছে আদিম উত্তেজনায়। তিনি চিৎকার করছেন, “সাবাস! ধর ওটাকে! ছিঁড়ে ফেল!”

এই খেলা নিষ্ঠুর। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি এক অন্য মানুষ। তার ভেতরে এখন শিকারি সত্তা জেগে আছে। প্রতিপক্ষের পাখিটা যখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তখন দেওয়ান সাহেবের মুখে বিজয়ের হাসি।

শেষমেশ দেওয়ান সাহেবের কোড়াটিই জিতল। প্রতিপক্ষের পাখিটা আধমরা হয়ে পড়ে রইল। চারদিকে জয়ধ্বনি উঠল, “দেওয়ান সাহেবের জয়! লাল পাহাড়ের জয়!”

দেওয়ান সাহেব অট্টহাসি দিলেন। সেই হাসিতে দম্ভ আছে, কিন্তু তৃপ্তি কি আছে? তিনি পকেট থেকে একমুঠো রৌপ্যমুদ্রা ছুঁড়ে দিলেন মাঝিমাল্লাদের দিকে। “তোল নোঙর! বাড়ির দিকে চল। আজ বড় ভোজ হবে।”

লড়াই শেষ। নৌবহর আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু ফিরতি পথে দেওয়ান সাহেবের মুখ থমথমে। তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তার বিজয়ী পাখিটার দিকে। পাখিটার ডানায় এখনো তাজা রক্তের দাগ। নিজের রক্ত, নাকি শত্রুর? হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। এই জয়, এই রক্ত, এই কোলাহল, এসবের অর্থ কী? কিছুক্ষণ আগেই যে উল্লাস ছিল, তা এখন বিষাদের মতো তাকে গ্রাস করছে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। নৌকা থেকে ডাঙায় নেমেছেন দেওয়ান সাহেব। এবার তিনি তার প্রিয় ঘোড়া ‘জং বাহাদুর’-এর পিঠে চড়ে লক্ষ্মণশ্রীর বাড়ির দিকে ফিরছেন। সাথে চলছে দেহরক্ষী শমশের আর কয়েকজন পাইক।

আকাশ আবার কালো হয়ে এল। আচমকা ঝমঝমিয়ে নামল বৃষ্টি। ঘোড়ার খুরের আঘাতে রাস্তার কাদা আর জল ছিটকে উঠছে। দেওয়ান সাহেব ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছোটালেন। তার মখমলের পোশাক ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি ভ্রুক্ষেপ করছেন না। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ তার বড় প্রিয়। তিনি যেন বাতাসের সাথে পাল্লা দিচ্ছেন।

হঠাৎ তিনি ঘোড়ার লাগাম কষে ধরলেন। ‘জং বাহাদুর’ পা তুলে চিঁহি শব্দে দাঁড়িয়ে গেল। “থামা!” দেওয়ান সাহেব হুঙ্কার দিলেন।

পেছনে থাকা শমশের ছাতা হাতে দৌড়ে এল। “কী হয়েছে হুজুর? সাপ-খোপ?”

দেওয়ান সাহেব কোনো কথা বললেন না। তিনি ঘোড়া থেকে নামলেন। তার দামি নাগরা জুতো রাস্তার কাদায় দেবে গেল। দেহরক্ষীরা অবাক হয়ে দেখল, তাদের শৌখিন মনিব, যিনি ধুলো লাগলে পোশাক বদলে ফেলেন, তিনি আজ কাদা মাড়িয়ে ঝোপের দিকে এগোচ্ছেন।

রাস্তার পাশে এক ঝোপের নিচে, কাদা আর বৃষ্টির জলের মধ্যে থরথর করে কাঁপছে একটি মা-মরা বিড়াল ছানা। হাড় জিরজিরে ছানাটি বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে চুপসে গেছে। তার ক্ষীণ মিউ শব্দ বৃষ্টির গর্জনে হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো মায়ের মৃতদেহটা শিয়াল নিয়ে গেছে, আর এই এতিম ছানাটা মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

এই সেই মানুষ, যিনি কিছুক্ষণ আগে দুটি পাখির রক্তক্ষয়ী লড়াই দেখে উল্লাস করছিলেন। যিনি হাজার টাকা উড়িয়ে দেন এক মুহূর্তের খেয়ালে। তিনি এখন নতজানু হয়ে বসেছেন কাদার ওপর। তার চোখে এখন আর সেই শিকারি বাঘের দৃষ্টি নেই, আছে এক অদ্ভুত আর্দ্রতা ।

তিনি পরম মমতায় বিড়ালের ছানাটিকে দুই হাতে তুলে নিলেন। তার দামি চোগার আচল দিয়ে মুছিয়ে দিলেন ছানাটির গায়ের কাদা আর জল। ছানাটি তার উষ্ণ পরশ পেয়ে তার বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল।

শমশের অবাক হয়ে বলল, “হুজুর, এ তো সামান্য বিলাইর বাচ্চা। আপনার গায়ে কাদা লাগছে। রেখে দেন, আমরা পরে দেখব।”

দেওয়ান সাহেব শমশেরের দিকে তাকালেন। তার গলায় এক গভীর বিষাদ। “সামান্য? শমশের, এর জান আর আমার জানের মধ্যে কোনো তফাত আছে রে? আল্লা তো একেও বানিয়েছে, আমাকেও বানিয়েছে। দেখ, কেমন শীতে কাঁপছে! এর মা নাই। এতিম।”

এতিম শব্দটা উচ্চারণ করতেই তার গলাটা ধরে এল। তার মনে পড়ল নিজের কথা। তিনিও তো এতিম হয়েছিলেন অল্প বয়সে। বাবা নেই, বড় ভাই নেই। এই বিশাল জমিদারির মাঝে তিনিও তো এই বিড়াল ছানাটার মতোই একা। এই অসহায় প্রাণীটির মধ্যে তিনি যেন নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন।

তিনি আর ঘোড়ায় উঠলেন না। বিড়াল ছানাটিকে বুকের ওমে আগলে রেখে, কাদা মাড়িয়ে হেঁটে চললেন বাড়ির দিকে। তার পেছনে রাজকীয় ঘোড়া 'জং বাহাদুর'ও যেন মাথা নিচু করে প্রভুকে অনুসরণ করতে লাগল। রাস্তার ধারের প্রজারা আড়াল থেকে দেখল, তাদের রাজা আজ এক ভিখারির মতো কাদা মেখে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে শুধুমাত্র একটি তুচ্ছ প্রাণ বাঁচাতে।

লক্ষ্মণশ্রীর বাড়িতে যখন তিনি পৌঁছালেন, তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। এই বাড়িটি অদ্ভুত। তিনি এত বড় জমিদার, যার সিন্দুকে লাখ টাকা, অথচ তার নিজের থাকার জন্য কোনো রাজপ্রাসাদ নেই। বড় বড় মাটির ঘর, ওপরে খড় বা টিনের চাল। বৈঠকখানার অবস্থাও তথৈবচ, একটি সাধারণ তক্তপোষ, তার ওপর জীর্ণ শতরঞ্চি পাতা, গোটা কয়েক নড়বড়ে চেয়ার। অথচ এই জীর্ণ আসবাবের পাশেই হয়তো পড়ে আছে লাখ টাকার হীরা-জহরত। তিনি এমনই খেয়ালি। তিনি মনে করেন, আভিজাত্য দালানে থাকে না, থাকে অন্তরে। দালান বানালেই তো একদিন ভেঙে যাবে, তার চেয়ে মাটির ঘরই ভালো, যা মনে করিয়ে দেয় মাটির মানুষের কথা।

অন্দরমহলে প্রবেশ করতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। বারান্দায় হারিকেনের আলোয় জায়নামাজে বসে তসবিহ জপছেন এক প্রৌঢ়া নারী। তার চেহারায় এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য, যা দেখলেই মাথা নত হয়ে আসে। ইনিই এই জমিদারির আসল কর্ত্রী, দেওয়ান সাহেবের মা, হুরমত জাহান বিবি।

দেওয়ান সাহেব ভেজা কাপড়ে, কাদা মাখা শরীরে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাতে সেই বিড়ালের ছানা। মা চোখ খুললেন। ছেলের এই অবস্থা দেখে তার চোখে ভর্ৎসনা ফুটে উঠল।

“আবার সেই পাগলামি?” মা শান্ত কিন্তু কঠোর স্বরে বললেন। “সারাদিন পশু-পাখি আর খেলাধুলা নিয়ে মত্ত থাকিস। বিষয়-সম্পত্তি কে দেখবে? তোর বাবা কি এই জন্য তোকে রেখে গিয়েছিলেন? শরীরে কাদা, হাতে ওইটা কী?”

দেওয়ান সাহেব মাথা নিচু করে রইলেন। হাজার প্রজার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তিনি, যার হুঙ্কারে কাছারি ঘর কাঁপে, তিনি মায়ের সামনে নিতান্তই এক অবুঝ বালক। “আম্মা, বৃষ্টির জলে ডুবে এই বাচ্চাটা মরে যাচ্ছিল। আমি না তুললে ও বাঁচত না।”

“তুই তো দয়ালু”— মা একটু হাসলেন, সে হাসিতে শ্লেষ আছে, আবার স্নেহও আছে। “পশু-পাখির জন্য তোর দয়ার শরীর। কিন্তু নিজের আত্মার জন্য তোর দয়া হয় না? এই যে এত শখ, এত রং-তামাশা, এত কোড়া পাখির লড়াই, এসব কি সঙ্গে যাবে? মাটির নিচে তো শুধুই অন্ধকার। সেখানে তোকে কে বাঁচাবে?”

মায়ের কথাগুলো তীরের মতো বিঁধল তার বুকে। তিনি কোনো কথা বললেন না। বিড়াল ছানাটিকে এক দাসীর হাতে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।

সেদিন রাতে আর গানের আসর বসল না। বাইজিদের বিদায় করে দেওয়া হলো। তিনি তার খাস কামরায় একা শুয়ে রইলেন। বাইরে বৃষ্টির শব্দ। তার মনে হলো, তার বুকের ভেতরটাও আজ হাওরের আফালের মতো উত্তাল। এই ভোগ, এই বিলাস, এই দয়া, এই নিষ্ঠুরতা, সবই কি ছলনা?

তিনি উঠে গিয়ে জানলার শিক ধরে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। দূরে অন্ধকারে ঝোপঝাড়ের আড়ালে তার মায়ের তৈরি করে রাখা পারিবারিক কবরস্থান দেখা যাচ্ছে। মা নিজের কবর আগেই ঠিক করে রেখেছেন। আর তার পাশে ছেলের জন্য জায়গা রেখেছেন।
তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “বাড়ি! ওটাই তো আমার আসল বাড়ি। তবে কেন এই মিছে আয়োজন? কেন এই পাখির লড়াই? কেন এই দম্ভ?”

অন্ধকার রাতে, সুরমা নদীর তীরের এই মাটির ঘরে শুয়ে, এক প্রতাপশালী জমিদার প্রথমবারের মতো অনুভব করলেন, তিনি আসলে কেউ নন। তিনি কেবল এক মুসাফির। তার বুকের ভেতর থেকে একটা গান উঠে আসতে চাইল, কিন্তু সুর পেল না। শুধু এক দীর্ঘশ্বাস মিশে গেল বাতাসের সাথে।
[চলবে...]

  • লেখক পরিচিতি: রিপন ঘোষ, সহকারী শিক্ষক (ভৌতবিজ্ঞান), ঢাকাদক্ষিণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট। প্রকাশিত গ্রন্থ: কৃষ্ণচূড়ায় সিক্ত। এটি একটি গল্পগ্রন্থ। ২০২৩ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ‘সুজন পাবলিকেশন’ থেকে বইটি প্রকাশিত হয়।

আপনার মন্তব্য