ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—৮

 প্রকাশিত: ২০২৬-০১-২৭ ০১:২৬:৪৬

রিপন ঘোষ:

পর্ব ৮: লৌহকপাট

সুরমা নদীর জল সেদিন বড়ই ঘোলাটে ছিল। পুলিশি পাহারায় একটি বড় পানসি নৌকা সুনামগঞ্জের ঘাট ছেড়ে উজানের দিকে ভেসে চলেছে। গন্তব্য সিলেট শহর।

নৌকার ছৈয়ের নিচে বসে আছেন দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী। তাঁর হাতে হাতকড়া নেই, দারোগা বাবু সেই স্পর্ধা দেখাননি। কিন্তু তাঁর মনের ভেতর যে অদৃশ্য শিকল আজ পরানো হয়েছে, তার ভার লোহার চেয়েও ভারী। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তেঘরিয়ার শত শত প্রজা, অন্দরমহলের নারীদের কান্না আর মায়ের সেই পাথর কঠিন মূর্তি, সব পেছনে ফেলে তিনি এগিয়ে চলেছেন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে।

হাছন রাজা সুরমার জলের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, এই সুরমা নদী তার কত বিলাসী ভ্রমণের সাক্ষী! কতবার এই নদীতে তিনি বজরা ভাসিয়েছেন, বাঈজি নাচিয়েছেন, জ্যোৎস্না রাতে গান গেয়েছেন। আর আজ? আজ সেই নদীই তাকে আসামির মতো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি নিজের হাতের দিকে তাকালেন। এই হাত দিয়ে তিনি কত দান-খয়রাত করেছেন, কত মানুষের ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন। আর আজ সেই হাতেই কালিমা লেপে দিল তারই হাতে গড়া দুই মানুষ - আয়াত আর সুরজান। "বিশ্বাস!" তিনি বিড়বিড় করে বললেন। "বড় ঠুনকো এই শব্দটা।"

সুরমা নদীর জল কেটে পুলিশি পাহারায় একটি বড় পানসি নৌকা যখন সিলেটের ঐতিহাসিক চাঁদনীঘাটে এসে ভিড়ল, তখন সূর্য পাটে নেমেছে। পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা, আর নিচে সুরমার কালো জল।

হাছন রাজা ধীরে ধীরে নৌকার ছৈ থেকে বেরিয়ে এলেন। দীর্ঘ পথভ্রমণের ক্লান্তি তাঁর চোখেমুখে, কিন্তু অবয়বে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। চাঁদনীঘাটের এই প্রশস্ত সিঁড়ি তাঁর বড় চেনা। কত বার এই ঘাটে তিনি নিজস্ব সুসজ্জিত বজরা ভিড়িয়েছেন! তখন তাঁর আগমন মানেই ছিল উৎসব, পাইক-পেয়াদারা হাঁকডাক করত, কুলি-মজুররা দৌড়ে আসত সামান নিতে, আর শহরবাসীরা ভিড় করত লক্ষণশ্রীর রাজাকে এক নজর দেখতে।

আর আজ? আজও ভিড় আছে, কিন্তু সেই ভিড়ে সম্ভ্রম নেই, আছে কৌতূহল। ঘাটের মাঝিমাল্লারা ফিসফিস করছে, "ওই দেখ, হাছন রাজাকে পুলিশে ধরে এনেছে!" হাছন রাজা সিঁড়ির দিকে তাকালেন। ঘাটের ঠিক ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে লংলার জমিদার আলী আমজদের বিখ্যাত ঘড়িঘর। সেই ঘড়ির কাঁটা এখন সন্ধ্যা ছয়টা ছুঁই ছুঁই। এই আলী আমজদের কাছেই তিনি কিছুদিন আগে জফরগড় বিক্রি করেছেন। আজ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! সেই আলী আমজদের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাছন রাজাকে মাথা নিচু করে ডাঙায় উঠতে হচ্ছে।

দারোগা বাবু বললেন, "চলুন দেওয়ান সাহেব। পালকি ডাকা হয়েছে।" হাছন রাজা ম্লান হাসলেন। "পালকি? আসামি কি পালকিতে চড়ে দারোগা বাবু? আমি হেঁটেই যাব। সিলেটবাসী দেখুক, তাদের হাছন রাজার মেরুদণ্ড এখনো বাঁকেনি।"

তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। দুপাশে পুলিশ, মাঝখানে তিনি। চাঁদনীঘাট থেকে জেলের পথটুকু খুব বেশি দূরের নয়, কিন্তু হাছন রাজার কাছে মনে হলো অনন্তকালের। রাস্তার দুপাশের পরিচিত দোকানপাট, পরিচিত মানুষজন সব যেন আজ অচেনা হয়ে গেছে।
সিলেট জেলের বিশাল লাল ইটের প্রাচীর এবং তার মাঝখানে দানবীয় লোহার গেটটি যখন চোখের সামনে ভেসে উঠল, তখন হাছন রাজা ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ালেন। এই গেট তিনি আগেও দেখেছেন, কিন্তু তখন দেখেছেন একজন স্বাধীন জমিদার হিসেবে, ঘোড়ায় চড়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়। আর আজ এই গেট তাকে গিলে ফেলার জন্য হাঁ করে আছে।

গেটটি খুলতেই এক বিকট ও কর্কশ যান্ত্রিক শব্দ হলো। হাছন রাজা পা বাড়ালেন। ভেতরের অন্ধকার যেন বাইরের জগত থেকে তাকে আলাদা করে দিল।

জেল সুপারিনটেনডেন্ট, একজন চশমা পরা কড়া মেজাজের বাঙালি বাবু, রেজিস্টার খাতা খুলে বসে ছিলেন। হাছন রাজাকে দেখে তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। সুনামগঞ্জের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জমিদার আজ তার আসামির কাঠগড়ায়। তবুও চাকরির খাতিরে তিনি গলার স্বর শক্ত করলেন। "নাম?" "দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী।" হাছন রাজার গলা কাঁপল না। "অপরাধ?" হাছন রাজা চুপ করে রইলেন। সুপারিনটেনডেন্ট নিজেই লিখে নিলেন, 'ধর্ষণ (অভিযুক্ত)'। শব্দটি লেখার খসখস আওয়াজটা হাছন রাজার কানে চাবুকের মতো বাজল।

"আপনার সাথে থাকা দামি জিনিসপত্র জমা দিন।" সুপারিনটেনডেন্ট বললেন। হাছন রাজা তার আঙুলের আংটি, পকেটের ঘড়ি এবং কাঁধের শৌখিন কাশ্মীরি শালটি নামিয়ে রাখলেন টেবিলের ওপর। শালটি নামানোর সময় তার মনে হলো, তিনি যেন তার রাজা খোলসটি খুলে রেখে যাচ্ছেন। এখন তিনি শুধুই একজন কয়েদি। একজন অতি সাধারণ মানুষ।

একজন সেপাই এসে তার হাতে একটা খসখসে কম্বল আর টিনের থালা ধরিয়ে দিল। "চলুন। সাত নম্বর সেল।"

হাছন রাজা সেপাইয়ের পেছনে হাঁটতে লাগলেন। জেলের লম্বা করিডোর। দুপাশে ছোট ছোট কুঠুরি। সেখান থেকে কয়েদিরা শিক ধরে উঁকি দিচ্ছে। কেউ ফিসফিস করে বলছে, "ওরে দেখ! হাছন রাজা না? ওই যে সুনামগঞ্জের বাঘ!" কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে বিদ্রূপ। যে মানুষটার দিকে তাকাতে প্রজারা ভয় পেত, আজ চোর-ডাকাতরাও তাকে করুণার চোখে দেখছে।

সাত নম্বর সেলের সামনে এসে সেপাই থামল। ছোট, স্যাঁতস্যাঁতে একটা ঘর। দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে। এক কোণায় একটা মাটির কলসি। মেঝের একপাশ থেকে চুনকামের উগ্র গন্ধ আসছে। হাছন রাজা ভেতরে ঢুকলেন। সেপাই দরজাটা বন্ধ করে দিল। খটাস! তারপর তালা লাগানোর শব্দ। সেই শব্দের প্রতিধ্বনি হাছন রাজার বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল। তিনি দরজার শিকের কাছে এসে দাঁড়ালেন। ওপারে করিডোরে টিমটিম করে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। তিনি শিকগুলো মুঠো করে ধরলেন। লোহাগুলো বরফের মতো ঠান্ডা। "পিঞ্জিরা!" তিনি বিড়বিড় করে বললেন। "এতদিন শখ করে পাখিকে পিঞ্জিরায় ভরেছি। আজ বুঝলাম, খাঁচায় থাকার কী যন্ত্রণা!"

তিনি ধীরে ধীরে শক্ত মেঝেতে বসে পড়লেন। সিলেটে সন্ধ্যা নেমেছে। জেলের ভেতর এখন শুধুই অন্ধকার আর দীর্ঘশ্বাস। এই প্রথম, দেওয়ান হাছন রাজা অনুভব করলেন, বাইরের জগতটা কত দূরে চলে গেছে।

কারাবাস দীর্ঘ হলো না, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্ত ছিল যন্ত্রণাদায়ক। দিনের বেলা উকিল-মোক্তারদের আনাগোনা আর রাতের বেলা ছারপোকা কামড়ানো বিছানায় নির্ঘুম প্রহর গুণা। হাছন রাজা মাঝে মাঝে মাঝরাতে উঠে জেলের শিকের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। আকাশে সেই একই চাঁদ, যা তেঘরিয়াতে দেখা যায়। কিন্তু এখানকার চাঁদটাকে বড় ফ্যাকাসে মনে হয়। পাশের সেল থেকে মাঝে মাঝে কোনো কয়েদির কাশির শব্দ বা প্রহরীর বুটের ভারী আওয়াজ নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়।

এই একাকীত্বে হাছন রাজার মনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে শুরু করল। তিনি ভাবলেন, এই যে দালানকোঠা, এই যে জমিদারি, এই যে মান-সম্মান সবই তো আসলে এক একটা অদৃশ্য জেলখানা। মানুষ নিজেই নিজের চারপাশে দেয়াল তুলে রাখে। একদিন দুপুরে টিনের থালায় মোটা চালের ভাত আর জলের মতো পাতলা ডাল দেখে তাঁর মনে পড়ল লক্ষণশ্রীর সেই রাজকীয় ভোজের কথা। তিনি হাসলেন। খিদে পেলে রাজভোগ আর জেলের ভাত সবই সমান। পেটের কোনো জাত নেই।

তবে হাছন রাজা হার মানার পাত্র নন। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করলেন। তার পক্ষে লড়লেন বিখ্যাত ব্যারিস্টাররা।

কলকাতা হাইকোর্টের দুইজন ইংরেজ বিচারপতি মামলার নথি খুঁটিয়ে পড়লেন। নবীন শর্মার সাজানো ডাক্তার, মিথ্যা মেডিকেল রিপোর্ট এবং সাক্ষীদের অসংলগ্ন কথাবার্তা তাদের অভিজ্ঞ চোখ এড়াল না। বিশেষ করে ঘটনার দিন ও সময়ের সাথে আবহাওয়া দপ্তরের রিপোর্টের গরমিল তাদের সন্দেহের উদ্রেক করল।

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। বিচারপতিরা নিম্ন আদালতের রায় খারিজ করে দিলেন। তাদের রায়ে স্পষ্ট লেখা হলো, "এটি একটি জঘন্য ষড়যন্ত্র। বাদীর অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মিস্টার হাছন রাজাকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হলো।"

মুক্তির খবর যখন সিলেটে পৌঁছাল, তখন যেন বাঁধভাঙা জোয়ার এল। খবরটা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ল, হাছন রাজা নির্দোষ! সত্যের জয় হয়েছে! জেলগেটের সামনে হাজারো মানুষের ভিড়। তাদের হাতে ফুলের মালা, মুখে জয়ধ্বনি। লোহার গেটটি আবার খুলল। সেই কর্কশ শব্দ—ক্যাঁচক্যাঁচ... ঢং!

হাছন রাজা ধীর পায়ে জেল থেকে বেরিয়ে এলেন। বাইরের আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সামনে অগণিত মানুষের ভালোবাসা। কেউ স্লোগান দিচ্ছে, কেউ বাদ্য বাজাচ্ছে। কিন্তু জেল থেকে যিনি বের হলেন, তিনি আর সেই আগের বিলাসী, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জমিদার নন। তার চোখেমুখে এক গভীর বিষাদ। গায়ের পাঞ্জাবিটা একটু মলিন, চুলগুলো উসকোখুসকো। তিনি ভিড়ের দিকে তাকালেন, কিন্তু হাত নেড়ে রাজার মতো সম্ভাষণ জানালেন না। তিনি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তার মনে হলো, এই আকাশটা আজ অনেক বড়। কিন্তু তার বুকের ভেতরের আকাশটা এখনো মেঘলা। এই কয়েকমাসের কারাবাস তাকে শিখিয়েছে এক ধ্রুব সত্য; ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, সম্মান, মানুষের ভালোবাসা সবই কচু পাতার পানি। একটু বাতাসেই গড়িয়ে পড়ে যায়। আসল মুক্তি এই জেল থেকে বের হওয়া নয়, আসল মুক্তি নিজের ভেতরের লোভ আর মোহের শিকল ভাঙা।
[চলবে; পরের পর্ব আগামী মঙ্গলবার]

আপনার মন্তব্য