ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—৩

 প্রকাশিত: ২০২৫-১২-১৬ ২২:৫০:০৮

রিপন ঘোষ:

পর্ব ৩: শান্তির নোঙর
রাত তখন দ্বিতীয় প্রহর গড়িয়ে গেছে। বাইরের পৃথিবী যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, লক্ষ্মণশ্রীর দেওয়ান বাড়ির রঙমহল তখন জেগে উঠেছে এক ভিন্ন পৃথিবীতে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, সেই বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে রঙমহলের ভেতর থেকে ভেসে আসছে সেতার আর সারিন্দার করুণ মূর্ছনা।

এই ঘরটি সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ। এখানকার বাতাস ভারী হয়ে আছে কাশ্মীরি আতর আর পোড়া তামাকের গন্ধে। বিশাল এই হলের মেঝেতে বিছানো পারস্য দেশীয় গালিচা, তার ওপর ছড়ানো মখমলের তাকিয়া। ঘরের চারকোণে জ্বলছে ঝাড়লণ্ঠন, যার আলোয় দেওয়ান সাহেবের মুখখানা এক রহস্যময় ভাস্কর্যের মতো দেখাচ্ছে।

তিনি আজ ফরাশের ওপর অর্ধশায়িত। হাতে রুপোর কাজ করা গড়গড়ার নল। তার সামনে বসে আছে তার গানের দলের প্রধান চারজন নারী আরবজান, মিশ্রিজান, ইয়াছমন আর কবুতরি। এরা কেউ সাধারণ নর্তকী বা বাইজি নয়, দেওয়ান সাহেবের কাছে এরা জাদুকরী। তার বুকের ভেতর যে অব্যক্ত বেদনা গুমরে মরে, এই নারীরাই সুরের জাদুতে তাকে মুক্তি দেয়।

দেওয়ান সাহেব চোখ বুজে আছেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি বিড়বিড় করছেন, সুর খুঁজছেন। হঠাৎ তিনি চোখ মেললেন। তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত আবেশ।

"আরবজান!" তিনি ভরাট গলায় ডাকলেন।

"জি হুজুর।" আরবজান যন্ত্র হাতে প্রস্তুত হলো। তার আঙুলগুলো দোতারার তারে স্থির হয়ে আছে আদেশের অপেক্ষায়।

"আজ মনটা বড়ই উতলা। একটা সুর আসছে মাথায়, কিন্তু ধরা দিচ্ছে না। দেখ তো ধরতে পারিস কি না।"

দেওয়ান সাহেব গাইলেন, প্রথমে নিচু স্বরে, তারপর গলা ছেড়ে, "আমি না লইলাম আল্লাজির নাম, না করলাম তার কাম..."

আরবজান অভিজ্ঞ শিল্পী। সে মুহূর্তের মধ্যে দোতারায় সেই সুরের রেশ ধরল। মিশ্রিজান মন্দিরায় তাল দিল ঝনঝন করে। ইয়াছমন আর কবুতরি দোহার ধরল। দেওয়ান সাহেবের গলা আর বাদ্যযন্ত্রের সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মনে হলো, এই সুর এই ঘরের দেয়াল ভেদ করে আসমানে পৌঁছে যাবে।

গানের এক পর্যায়ে দেওয়ান সাহেব থামলেন। তার চোখে জল চিকচিক করছে। তিনি মিশ্রিজানের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোরা আছিস বলেই এই পাথরপুরীতে আমি শ্বাস নিতে পারি। লোকে আমাকে লম্পট বলে, বিলাসী বলে। কিন্তু তারা জানে না, আমি তোদের মাঝে শরীর খুঁজি না, আমি খুঁজি সুর। যে সুর আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এই ভবের জঞ্জাল থেকে।"

কবুতরি পান সাজিয়ে দেওয়ান সাহেবের হাতে দিল। তিনি পান মুখে দিয়ে বললেন, "তোরা আমার গানের পাখি। তোরা ছাড়া এই দেওয়ান শুধুই এক মাটির পুতুল।"

বাইরে তখনো মেঘের গর্জন। রঙমহলের ভেতরে তখন সুরের আগুন। সেই আগুনে দেওয়ান সাহেব নিজেকে পোড়াচ্ছেন, আর খাঁটি সোনা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।

রঙমহলের সুরের রেশ কাটিয়ে দেওয়ান সাহেব যখন অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন, তখন রাত অনেক। অন্দরমহলের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে আতরের উগ্র গন্ধ নেই, আছে তাজা ফুলের পবিত্র সুবাস। এখানে নূপুরের নিক্বণ নেই, আছে এক নিস্তব্ধ প্রশান্তি।

তিনি ধীর পায়ে তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাজেদা বানুর কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

সাজেদা বানু সাধারণ কোনো নারী নন। তিনি ছিলেন দেওয়ান সাহেবের প্রয়াত বৈমাত্রেয় বড় ভাই এর স্ত্রী। ভাইয়ের মৃত্যুর পর পারিবারিক সম্মতিতে এবং বংশের রীতি মেনে দেওয়ান সাহেব তাকে বিয়ে করেন। সাজেদা বানু অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও সম্ভ্রান্ত মহিলা। এলাকার মানুষ তাকে সম্ভ্রম করে ডাকে পিরানী বিবি, আবার কেউ কেউ ডাকে হাজি বিবি।

দেওয়ান সাহেব নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন। সাজেদা বানু জায়নামাজে বসে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে মোনাজাত করছিলেন। ঘরের এক কোণে মৃদু আলোয় জ্বলছে হারিকেন। দেওয়ান সাহেব শব্দ না করে খাটের একপাশে বসলেন। তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন স্ত্রীর দিকে। সাদা শাড়িতে আবৃত এই নারীকে দেখলে তার মনে হয়, তিনি যেন কোনো হুরের সামনে বসে আছেন।

মোনাজাত শেষ করে সাজেদা বানু ঘুরলেন। স্বামীকে দেখে তার মুখে এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। তিনি উঠে এসে স্বামীর কাছে বসলেন। দেওয়ান সাহেবের ভেজা চুল আর ক্লান্ত চোখ দেখে তিনি আঁচল দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দিলেন।

"এত রাত পর্যন্ত গান-বাজনা না করলে কি চলে না?" সাজেদা বানু মৃদু স্বরে বললেন। তার কণ্ঠে ভর্ৎসনার চেয়ে মায়া বেশি। "শরীরের তো বিশ্রাম দরকার। তোমার চোখ দুটো তো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে।"

দেওয়ান সাহেব স্ত্রীর হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তার স্পর্শে এক অদ্ভুত নির্ভরতা।

"পিরানী বিবি, তুমি তো জানো, সুর আমার নেশা। ওটা ছাড়া আমি বাঁচব না। আমার ভেতরের আগুন যে নেভে না। সেই আগুন নেভাতেই আমি সুরের কাছে যাই, আবার তোমার কাছে আসি।"

সাজেদা বানু স্বামীর চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, "আগুন নেভানোর মালিক আল্লাহ। তুমি তার কাছে চাও না কেন? তিনি তো দয়ালু। তুমি তো জানো, এই দুনিয়া, এই ভোগ, সবই নশ্বর। আসল তো আখেরাত।"

দেওয়ান সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি আলতো করে সাজেদা বানুকে নিজের দিকে টেনে নিলেন। সাজেদা বানুর শরীর স্বামীর বুকের সাথে মিশে গেল। তিনি স্বামীর গায়ের চেনা গন্ধ পেলেন; তামাক, আতর আর পুরুষালি ঘামের এক মিশ্রণ, যা তাকে সবসময় অবশ করে দেয়।

দেওয়ান সাহেব স্ত্রীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আমি জানি বিবি। সব জানি। কিন্তু আমি যে পথ খুঁজে পাই না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি সাগরের মাঝখানে এক ভাঙা নৌকায় বসে আছি। তুমিই আমার কূল, তুমিই আমার নোঙর। পিরানী বিবি, তোমার এই শীতল হাতটা যখন আমার কপালে রাখো, তখন মনে হয় দোজখের আগুনও নিভে যাবে।"

সাজেদা বানু চুপ করে রইলেন। তিনি জানেন, তার স্বামী সাধারণ মানুষ নন। তার বুকের ভেতর এক বিশাল সমুদ্র আছে। তিনি আলতো করে স্বামীর কপালে চুমু খেলেন। "ভয় নেই। আমি আছি। আমি তোমার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ নিশ্চয় তোমাকে ফেরাবেন।"

দেওয়ান সাহেব, হঠাৎ উঠে বসে সাজেদা বানুকে জড়িয়ে ধরলেন। সাজেদা বানু আলতো করে স্বামীর শক্ত বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। তিনি লজ্জামিশ্রিত গলায় বললেন, "কী করছো?"

দেওয়ান সাহেব হাসলেন, তারপর এক হাত দিয়ে স্ত্রীর খোলা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিলেন। তারপর খুব ধীরলয়ে স্ত্রীর গলায় ও ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিলেন। সাজেদা বানু শিউরে উঠলেন। তার হাত অজান্তেই স্বামীর বাবরি চুলে বিলি কাটতে শুরু করল। এই দুর্দান্ত প্রতাপশালী জমিদার, যার হুকুমের অপেক্ষায় হাজার মানুষ থাকে, তিনি এখন তার স্ত্রীর কাছে এক কাঙাল প্রেমিকের মতো আত্মসমর্পণ করেছেন।

দেওয়ান সাহেব মুখ তুলে স্ত্রীর চিবুক স্পর্শ করলেন। "তোমার এই চোখের দিকে তাকালে আমি আর কোনো নেশার প্রয়োজন বোধ করি না। কিন্তু তুমি তো আমাকে ধরা দাও না।"

সাজেদা বানু স্বামীর ঠোঁটে আঙুল রাখলেন। "চুপ করো। সব নেশা কি আর মদে মেটে?"

দেওয়ান সাহেব স্ত্রীর কোলে মাথা রাখলেন। বাইরের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জমিদার এই মুহূর্তে এক ক্লান্ত শিশু। দেওয়ান সাহেব স্ত্রীর হাতের তালুতে একটি দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে চোখ বুজলেন। সাজেদা বানু পরম মমতায় স্বামীর কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধতা মিলেমিশে এক পবিত্র মুহূর্ত তৈরি করল। দেওয়ান সাহেব অনুভব করলেন, রঙমহলের উত্তেজনা তাকে যা দিতে পারেনি, স্ত্রীর এই সামান্য স্পর্শ তাকে সেই শান্তি দিচ্ছে।

দেওয়ান সাহেবের দৃষ্টি গেল ঘরের এক কোণে। সেখানে মখমলের বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে তাদের একমাত্র পুত্র একলিমুর।

দেওয়ান সাহেব স্ত্রীর কোল থেকে মাথা তুলে উঠে গিয়ে ছেলের শিয়রে বসলেন। হারিকেনের মৃদু আলোয় একলিমুরের মাসুম চেহারাটা কী মায়াবী লাগছে! এই ছেলেটা তার বড় আদরের। তার মনে হয়, এই ছেলের মধ্যে এক অন্যরকম প্রতিভা লুকিয়ে আছে।

সাজেদা বানুও পিছু পিছু এসে দাঁড়ালেন। দেওয়ান সাহেব আলতো করে ছেলের কপালে হাত রাখলেন। একলিমুর ঘুমের ঘোরে নড়ে উঠল। দেওয়ান সাহেব ফিসফিস করে বললেন, "বিবি, আমার এই ছেলেটাকে তুমি মানুষের মতো মানুষ করো। আমি চাই ও বড় হয়ে বিদ্বান হোক। আমি পড়ালেখা না জানা এক মূর্খ ব্যক্তি। কিন্তু আমার ছেলে যেন জ্ঞানের সাগর হয়।"

"আল্লাহ নিশ্চয়ই কবুল করবেন," সাজেদা বানু বললেন।

দেওয়ান সাহেব মনে মনে ভাবলেন, 'বাবা আমার, তুই বড় হ। কিন্তু তোর বাবার মতো বাউলা হস না। তোর বাবার মতো এই আগুনের দহনে যেন তোকে পুড়তে না হয়।'

দেওয়ান সাহেব ছেলের কপালে চুমু খেলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। "আমি এখন যাই বিবি। তুমি ঘুমাও।"

সাজেদা বানু স্বামীর হাত ধরলেন। "কোথায় যাবে? আবার ওই রঙমহলে?"

"না," দেওয়ান সাহেব দরজার কাছে গিয়ে থামলেন। "আজ আর গান নয়। আজ আমি একা থাকব। তোমার ওই জায়নামাজের শান্তিটুকু আজ আমার বুকের ভেতর নিয়ে যাচ্ছি।"

তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সাজেদা বানু স্বামীর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে জল। তিনি জানেন, তার স্বামী এক অনন্ত যুদ্ধের মধ্যে আছেন, নিজের নফসের সাথে নিজের আত্মার যুদ্ধ।

বাইরে তখনো টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছে। দেওয়ান সাহেব বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। দূরে সুরমা নদীর জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তার মনে হলো, এই নদী, এই বৃষ্টি, এই অন্দরমহলের পবিত্রতা আর ওই রঙমহলের সুর, সবই একসূত্রে গাঁথা। তিনি এই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ রাজকুমার।

[চলবে...]

লেখক পরিচিতি: রিপন ঘোষ, সহকারী শিক্ষক (পদার্থবিজ্ঞান), ঢাকাদক্ষিণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট। প্রকাশিত গ্রন্থ: কৃষ্ণচূড়ায় সিক্ত। ৮টি গল্প নিয়ে লেখা এই গল্পগ্রন্থটি ২০২৩ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয়।

আপনার মন্তব্য