ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—৭

 প্রকাশিত: ২০২৬-০১-২০ ১৫:২৮:৩৮

রিপন ঘোষ:

পর্ব ৭: ষড়যন্ত্রের জাল
রামপাশার সকালটা সেদিন অন্যদিনের মতো ছিল না। কাছারি ঘরের সামনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শত শত প্রজা জড়ো হয়েছে। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক আর কৌতূহল। খবর রটে গেছে, দেওয়ান হাছন রাজা আজ বড় কোনো ঘোষণা দেবেন। তারক চন্দ্র চৌধুরীর লোকজন ভিড়ের মধ্যে মিশে ফিসফিস করে রটাচ্ছে, "হাছন রাজা দেউলিয়া হয়ে গেছে। রামপাশাও বিক্রি করে দেবে।"

হাছন রাজা যখন কাছারি ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন, তখন কোলাহল মুহূর্তে থেমে গেল। তিনি সেই আগের মতোই দাপুটে। পরনে সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি, কাঁধে সেই পরিচিত শাল। কিন্তু তার চোখের নিচে কালশিটে, নির্ঘুম রাতের সাক্ষী।

তিনি ভিড়ের দিকে তাকিয়ে ভরাট গলায় বললেন, "শুনলাম, আমার ভাইয়েরা রটাচ্ছে আমি নাকি ভিখারি হয়ে গেছি? জফরগড় বিক্রি করেছি, এটা সত্য। কিন্তু কেন করেছি, তা কি তোমরা জানো?" তিনি একটু থামলেন। সবার দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ।

"করেছি, যাতে এই রামপাশার এক ছটাক মাটিও অন্য কারো হাতে না যায়। আমার পূর্বপুরুষের ভিটা রক্ষায় আমি এক হাত কেটে ফেলেছি, যাতে বাকি শরীরটা বাঁচে। আমি হাছন রাজা, আমি ভাঙব, তবু মচকাব না।"

প্রজাদের মধ্যে স্বস্তির গুঞ্জন উঠল। হাছন রাজা তার নায়েবকে ইশারা করলেন। নায়েব খাতা খুলে ঘোষণা করলেন, এই দুঃসময়েও প্রজাদের খাজনা মওকুফ না করলেও, তিনি কাউকে ভিটেমাটি ছাড়া করবেন না।

দরবার শেষ হলো। প্রজারা হাছন রাজার জয়ধ্বনি দিয়ে ফিরে গেল। ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা তারক চন্দ্রের চররা ফিরে গেল মল্লিকপুরের দিকে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও বড় এক শিকারি।

রামপাশা থেকে মল্লিকপুর খুব বেশি দূরে নয়। সেখানেই বাস করেন বিখ্যাত উকিল নবীনচন্দ্র শর্মা এবং তার বড় ভাই গোবিন্দচন্দ্র শর্মা। এই অঞ্চলে হাছন রাজার প্রতিপত্তি যদি কারো চোখের বালি হয়ে থাকে, তবে তা এই শর্মা পরিবারের।

গোবিন্দচন্দ্র তার বৈঠকখানায় বসে গড়গড়া টানছিলেন। তার সামনে বসে আছেন তার ভাই নবীনচন্দ্র, যিনি সিলেট জজকোর্টের নামকরা উকিল। আইনের মারপ্যাঁচ তার নখদর্পণে। "হাছনকে বাগে আনা যাচ্ছে না, নবীন," গোবিন্দচন্দ্র ধোঁয়া ছেড়ে বললেন। "জমিদারি বেচেও সে রামপাশা রক্ষা করে ফেলল। প্রজারা এখনো তাকে দেবতার মতো ভক্তি করে।"

নবীনচন্দ্র মুচকি হাসলেন। তার চোখে ধূর্ততা। "দাদা, বাঘকে মারতে হলে তার শক্তিতে নয়, তার চরিত্রে আঘাত করতে হয়। হাছন রাজার দুর্বলতা কোথায় জানেন? তার নারীপ্রীতি আর তার বিশ্বাসের মানুষগুলো।"

গোবিন্দচন্দ্র ভুরু কুঁচকালেন। "মানে?"

"মানে হলো, হাছন রাজার ঘরের লোক দিয়েই তাকে ঘায়েল করব। তার ওই খাস ভৃত্য আয়াত আর দাসী সুরজানের দিকে নজর দিন। শুনেছি সুরজানকে নিয়ে হাছনের অন্দরমহলে কানাঘুষা আছে। আর আয়াত? টাকার লোভ দেখালে ও নিজের বাপকেও বিক্রি করবে।"

গোবিন্দচন্দ্র সোজা হয়ে বসলেন। "তুমি কী করতে চাও?"

নবীনচন্দ্র নিচু স্বরে বললেন, "জমিজমার মামলা নয় দাদা। এবার ফৌজদারি মামলা। এমন মামলা দেব যে, হাছন রাজার 'রাজা' উপাধি ধুলোয় মিশে যাবে। তাকে জেলের ভাত খাওয়াব।"

কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। লক্ষণশ্রীর বাড়িতে হাছন রাজা ফিরে এসেছেন। মনটা তার বিষণ্ণ। রামপাশার ঝামেলা মিটেছে সাময়িক, কিন্তু মনের ভেতর শান্তি নেই। তিনি বিকেলবেলা পুকুরঘাটে বসে নিজের প্রিয় কোড়া পাখিটাকে ছোলা খাওয়াচ্ছিলেন। এমন সময় আয়াত এল। এই আয়াত হাছন রাজার বাল্যবন্ধু, তার সুখ-দুঃখের সাথী। হাছন রাজা তাকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখেন। মুসলমান দাসের ঘরে জন্ম নেওয়া আয়াত আর হিন্দু দাসীর ঘরে জন্মানো সুরজান দুজনের বিয়ে হাছন রাজাই দিয়েছিলেন। তাদের তিনি বিশ্বাস করেন অন্ধের মতো।

"হুজুর," আয়াত ডাকল। তার গলাটা কেমন যেন খসখসে। হাছন রাজা পাখিটার দিকে তাকিয়েই বললেন, "কী রে আয়াত? সুরজান কেমন আছে? ওর গানের গলাটা আজকাল বড় মিষ্টি হয়েছে।"

আয়াত ঢোক গিলল। তার পকেটে মল্লিকপুর থেকে পাওয়া মোটা টাকার তোড়াটা ভারী লাগছে। আরও আছে এক টুকরো জমির দলিল। নবীন শর্মা তাকে বুঝিয়েছে, হাছন রাজার দিন শেষ। এখন নিজের আখের গোছানোর সময়। "হুজুর, সুরজান অসুস্থ। ও আর গান গাইতে পারবে না।"

"সে কী!" হাছন রাজা উদ্বিগ্ন হয়ে ঘুরে তাকালেন। "কবিরাজ দেখিয়েছিস? যা টাকা লাগে নায়েবের কাছ থেকে চেয়ে নিস।"

আয়াতের বুকের ভেতরটা একবারের জন্য হলেও কেঁপে উঠল। মনিব তাকে এত ভালোবাসেন! কিন্তু পরমুহূর্তেই লোভ তাকে গ্রাস করল। সে বলল, "জি হুজুর।" বলেই সে দ্রুত পায়ে সরে গেল। সে হাছন রাজার চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। কারণ সে জানে, সে যা করতে যাচ্ছে, তা ক্ষমার অযোগ্য।

দিন তিনেক পর। হাছন রাজা বৈঠকখানায় বসে দিলারামকে একটা নতুন সুর শোনাচ্ছিলেন। "নেশা লাগিল রে... বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে..." দিলারাম তন্ময় হয়ে শুনছিল। হঠাৎ বাইরের উঠোনে ভারী বুটের শব্দ আর শোরগোল। হাছন রাজা বিরক্ত হয়ে থামলেন। "কে ওখানে? উদাই, দেখ তো!"

উদাই দৌড়ে এল না, এল একদল পুলিশ। তাদের সাথে রয়েছেন স্বয়ং দারোগা বাবু এবং মল্লিকপুরের গোবিন্দ শর্মা। হাছন রাজা উঠে দাঁড়ালেন। তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ। "দারোগা বাবু? কী মনে করে? আমার বাড়িতে এভাবে হুট করে ঢোকার স্পর্ধা আপনাদের কে দিল?"

দারোগা বাবু একটু আমতা আমতা করলেন। হাছন রাজাকে সবাই সমীহ করে। কিন্তু আইনের পরোয়ানা তার হাতে। তিনি বললেন, "দেওয়ান সাহেব, মাফ করবেন। আপনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে।"

হাছন রাজা আকাশ থেকে পড়লেন। "গ্রেফতারি পরোয়ানা? কীসের মামলা? আমি তো কারো জমি দখল করিনি।"

পাশ থেকে গোবিন্দ শর্মা সামনে এগিয়ে এলেন। তার মুখে বিদ্রূপের হাসি। "জমি নয় দেওয়ান সাহেব। ইজ্জতের মামলা। আপনি আপনার দাসী সুরজানের ইজ্জত নিয়েছেন। তাকে ধর্ষণ করেছেন।"

হাছন রাজা পাথরের মতো জমে গেলেন। মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। "কী বলছ? কে অভিযোগ করেছে?"

"আপনার খাস ভৃত্য আয়াত এবং তার স্ত্রী সুরজান। তারা জবানবন্দি দিয়েছে। ডাক্তারের রিপোর্টও আছে।"

হাছন রাজা বিশ্বাস করতে পারলেন না। আয়াত? সুরজান? যাদের তিনি আপন মানুষের মতো স্নেহ করেন, যাদের বিয়ে তিনি নিজে দিয়েছেন, তারা তার বিরুদ্ধে এত বড় মিথ্যা অপবাদ দিল? তিনি দেখলেন, পুলিশের পেছনে দূরে আয়াত দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু করে। হাছন রাজা চিৎকার করে ডাকলেন, "আয়াত! তুই? তুই বলেছিস আমি সুরজানের সাথে...?"

আয়াত মুখ তুলল না। সে দারোগার পেছনে লুকাল। হাছন রাজা বুঝলেন, এ এক গভীর ষড়যন্ত্র। নবীন শর্মার সাজানো নাটক। ডাক্তার, পুলিশ, সাক্ষী সব কেনা হয়েছে। তার চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করার জন্য এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর হতে পারে না। তিনি দারোগার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, "আপনারা যখন এসেছেন, তখন যেতে তো হবেই। কিন্তু..."

ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে এক বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "দাঁড়ান দারোগা বাবু!"

সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল অন্দরমহলের দরজার দিকে। সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন হাছন রাজার মা, হুরমত জাহান বিবি। আশি ছুঁই ছুঁই এই বৃদ্ধার মেরুদণ্ড এখনো সোজা। পরনে সাদা থান, হাতে তসবিহ। সচরাচর যিনি অন্দরমহল থেকে বের হন না, আজ ছেলের অপমানে তিনি বাঘিনীর মতো বেরিয়ে এসেছেন। তার পেছনে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন হাছন রাজার তিন স্ত্রী - আজিজা, বোরজান আর সাজেদা।

হুরমত জাহান বিবি পুলিশের দিকে তাকালেন না, তিনি তাকালেন গোবিন্দ শর্মার দিকে। তার দৃষ্টিতে এমন ঘৃণা ছিল যে গোবিন্দ শর্মাও অজান্তে এক পা পিছিয়ে গেলেন। "গোবিন্দ বাবু," হুরমত জাহান বিবির গলা কাঁপল না। "শেয়াল দিয়ে বাঘ শিকার করতে এসেছেন? মনে রাখবেন, আমার ছেলে হাছন রাজা উড়নচণ্ডী হতে পারে, বেখেয়ালি হতে পারে কিন্তু সে ছোটলোক নয়। সে বংশের মান বেচে খায় না। আর..." তিনি আড়ালে থাকা আয়াতের দিকে আঙুল তুললেন, "নিজের নুন যে হারাম করে, তার বিচার আল্লাহ করবেন।"

পর্দার আড়াল থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এল। আজিজা বানু ও বোরজান বিবি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। সাজেদা বানু জায়নামাজে বসে ছিলেন, খবরটা শুনে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার মুখে কোনো কথা নেই। তিনি শুধু বিড়বিড় করে পড়ছেন, "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"। স্বামীর এই চরম অপমানে তাদের এতদিনের সতীনসুলভ রেষারেষি ধুয়ে-মুছে গেছে।

দিলারাম এতক্ষণ এক কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ছুটে এসে হুরমত জাহান বিবির পায়ের কাছে পড়ে চিৎকার করে উঠল, "আম্মাজান, হুজুরকে যেতে দেবেন না! ওরা মিথ্যা বলছে! হুজুর নির্দোষ!"

হুরমত জাহান বিবি দিলারামকে সরিয়ে দিলেন না, বরং তার মাথায় হাত রাখলেন। তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "যা হাছন। মাথা নিচু করিস না। তুই আমার ছেলে, বুক চিতিয়ে যা।"

হাছন রাজা মায়ের পায়ের ধুলো নিলেন। তার চোখে এখন আর ক্রোধ নেই, আছে এক অসীম বিস্ময় আর কষ্ট। মানুষের অধঃপতন যে এত নিচে নামতে পারে, তা তিনি আজ দেখলেন। কিন্তু মায়ের এই সাহস তাকে নতুন শক্তি দিল।

তিনি দারোগার দিকে তাকালেন। "চলুন। হাছন রাজা পালায় না। কিন্তু মনে রাখবেন গোবিন্দ বাবু, সত্যকে শিকল দিয়ে বেশিদিন বেঁধে রাখা যায় না।"

পুলিশ যখন হাছন রাজাকে নিয়ে যাচ্ছে, তখন পুরো তেঘরিয়া গ্রাম স্তব্ধ হয়ে দেখল। অন্দরমহলের নারীদের কান্না আর মায়ের পাথর কঠিন মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তাদের রাজা, তাদের দাপুটে জমিদার আজ জেলের পথে হাঁটছেন। হাছনের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। জফরগড় হারানোর কষ্ট এর কাছে কিছুই না। বিশ্বাসের মৃত্যু যে এত যন্ত্রণাদায়ক, তা তিনি আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলেন।

[চলবে; পরের পর্ব আগামী মঙ্গলবার]

আপনার মন্তব্য