ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—৬

 প্রকাশিত: ২০২৬-০১-০৬ ০০:০৮:০৩

রিপন ঘোষ:

পর্ব- ৬: শিকড়ের সন্ধানে
লক্ষণশ্রীর অন্দরমহলে সেদিন দুপুরে যে ঝড় উঠেছিল, তার রেশ কাটতে না কাটতেই দেওয়ান হাছন রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি রামপাশা যাবেন। লক্ষণশ্রী যদি হয় তাঁর মায়ের শাসন আর স্ত্রীদের অভিমানের দুর্গ, তবে রামপাশা হলো তাঁর অস্তিত্বের শেকড়। এই রামপাশা তাঁর পৈতৃক ভিটা, যেখানে তাঁর পূর্বপুরুষদের নিঃশ্বাস আজও পুরনো ইটের ফাঁকে ফাঁকে জমে আছে।

ভোর না হতেই দেওয়ান বাড়ির সদর দরজায় সাজ সাজ রব। আজ আর আরামদায়ক বজরা নয়, হাছন রাজা হুকুম দিয়েছেন তাঁর প্রিয় ঘোড়া ‘জং বাহাদুর’-কে তৈরি করার জন্য। কলকাতা থেকে আনা কুচকুচে কালো রঙের এই আরবি ঘোড়াটি যখন ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে যমদূতের মতো দেখায়।

হাছন রাজা যখন সদর দরজা দিয়ে বের হলেন, তখন তাঁর পরনে শিকারি পোশাক, পায়ে চামড়ার বুট, পরনে আঁটসাঁট পাজামা আর গায়ে বাদামি রঙের আচকান। মাথায় পাগড়ি নেই, বরং কাঁধ পর্যন্ত ছড়ানো বাবরি চুল ভোরের বাতাসে উড়ছে। দীর্ঘকায় এই সুঠাম দেহী পুরুষটি যখন ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলেন, তখন উপস্থিত পাইক-বরকন্দাজরা সসম্ভ্রমে মাথা নত করল।

তিনি ঘোড়ার পেটে গোড়ালি দিয়ে মৃদু খোঁচা দিলেন। জং বাহাদুর বাতাসের বেগে ছুটল। পেছনে ছুটল দেহরক্ষী উদাই আর একদল লাঠিয়াল। ঘোড়া ছুটছে বটে, কিন্তু হাছন রাজার মন পড়ে রইল পেছনে, ওই লক্ষণশ্রীর অন্দরমহলে, যেখানে একরত্তি ছেলে একলিমুর হয়তো এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠে বাবাকে খুঁজছে।

লক্ষণশ্রী থেকে রামপাশার পথ খুব একটা কম নয়। পথের দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত হাওর। বর্ষা শেষ হয়ে এসেছে, জল নামতে শুরু করেছে। জেগে ওঠা জমিতে কৃষকরা নতুন উদ্যমে কাজ করছে। হাছন রাজাকে ঘোড়ায় যেতে দেখে তারা কাজ থামিয়ে কুর্নিশ করছে। তিনি হাত তুলে সম্ভাষণ গ্রহণ করছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মনের ভেতর চলছে এক তোলপাড়।

এই বছরটা তাঁর জন্য ভালো যাচ্ছে না। ঋণের দায়ে কিছুদিন আগেই তাঁর প্রিয় জফরগড় পরগনাটি বিক্রি করে দিতে হয়েছে লংলার জমিদার আলী আমজদ খাঁ-র কাছে। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল দলিল সই করার সময়। কিন্তু উপায় ছিল না। পৈতৃক ভিটা রামপাশার সম্মান বাঁচাতে হলে জফরগড়কে বিসর্জন দিতেই হতো। মায়ের সেই কঠোর মুখটা মনে পড়ল, "বাপের ভিটা যেন হাতছাড়া না হয় হাছন।"

ঘোড়া যখন কাপনা নদীর তীর ঘেঁষে রামপাশার সীমানায় ঢুকল, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। রামপাশা! এই সেই গ্রাম, যা একদিন বাজিতে জিতেছিল তাঁর পূর্বপুরুষ। হাছন রাজা ঘোড়ার গতি কমালেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বিশাল গড় বা পরিখা। পুরনো, জরাজীর্ণ, শ্যাওলা ধরা ইটের প্রাচীর। এককালে এখানে কামান বসানো থাকত। এখন সেখানে বটের চারা গজিয়েছে। এই ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে হাছন রাজার মনে হলো, তিনি কোনো জমিদার নন, তিনি এক মস্ত বড় সমাধির পাহারাদার।

কাছারি ঘরের সামনে ঘোড়া থেকে নামলেন তিনি। রামপাশার নায়েব মশাই দৌড়ে এলেন। "হুজুর, আমরা তো ভাবছিলাম আপনি নৌকায় আসবেন।" হাছন রাজা ঘোড়ার লাগাম উদাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন, "নৌকার স্রোত তো শুধু ভাটির দিকে টানে নায়েব মশাই। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরা যায়, কিন্তু সময়ের লাগাম টানা বড় দায়।"

তিনি সোজা চলে গেলেন পুরনো মহলের দিকে। এই অংশটায় এখন আর কেউ থাকে না। বাদুড় আর চামচিকার আস্তানা। কিন্তু হাছন রাজার কাছে এই জায়গাটা জীবন্ত। তিনি একটি ভাঙা থামের গায়ে হাত রাখলেন। পাথরটা ঠান্ডা। তাঁর মনে হলো, এই পাথরের ভেতর দিয়ে তাঁর শরীরের রক্তে কোনো এক বৈদ্যুতিক শিহরণ বয়ে যাচ্ছে।

তিনি চোখ বুজলেন। আর সাথে সাথে বর্তমানের রামপাশা মিলিয়ে গিয়ে তাঁর মানসপটে ভেসে উঠল কয়েক শতাব্দী আগের এক দৃশ্য।

সে অনেক কাল আগের কথা। তাঁর পূর্বপুরুষ রাজা রণজিৎ সিংহ দেব ছিলেন পাশা খেলায় আসক্ত। এই কাপনা নদীর তীরেই এক ব্রাহ্মণ বন্ধুর সাথে তিনি পাশা খেলতেন। আর প্রতিবার হারতেন। কিন্তু একদিন তিনি পণ করলেন, আজ জিতবেনই। তিনি বাজি ধরলেন, "যদি আজ জিতি, তবে এখানে নতুন রাজ্য গড়ব।" ভগবান শ্রী রামের নাম নিয়ে তিনি চাল দিলেন। আর জিতেও গেলেন। সেই জয়ের স্মৃতিতেই এই জায়গার নাম হলো রামপাশা।

রণজিৎ সিংহের ছেলে ছিলেন বানারসী রাম সিংহ দেব। আর বানারসী রামের ছেলে বীরেন্দ্রচন্দ্র সিংহ দেব। এই বীরেন্দ্রচন্দ্রই ছিলেন হাছন রাজার বংশের মোড় ঘোরানো পুরুষ। বীরেন্দ্রচন্দ্র ছিলেন অদ্ভুত মেধাবী। তিনি আরবি-ফারসি ভাষা শিখতে গিয়ে সেই ভাষার প্রেমে পড়লেন, আর সেখান থেকে সোজা ইসলামের প্রেমে। একদিন সিলেটের মুঘল ফৌজদারের দরবারে গিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চান। তাঁর নতুন নাম হলো বাবু খান।

সংবাদটা যখন বানারসী রামের কাছে পৌঁছাল, তিনি শোকে পাথর হয়ে গেলেন। সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয়ের ছেলে ম্লেচ্ছ হয়ে গেছে! তিনি পাগলের মতো ছুটে গেলেন সিলেটে। সঙ্গে নিলেন এক বিশাল রূপার হাতি। খাঁটি রূপা দিয়ে গড়া সেই হাতি, যার কারুকাজ দেখে মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

ফৌজদারের দরবারে সেই রূপার হাতি উপহার দিয়ে বৃদ্ধ বানারসী রাম কেঁদে বললেন, "হুজুর, আমার সর্বস্ব নিন, এই হাতি নিন, কিন্তু আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দিন। ও আমার বংশের বাতি।" ফৌজদার মাথা নাড়লেন। গম্ভীর স্বরে বললেন, "রাজা মশাই, ধর্ম তো গায়ের চাদর নয় যে চাইলেই খুলে ফেলা যায়। বাবু খান এখন মুসলমান। সে আর ফিরে যেতে পারবে না।"

বানারসী রাম সেদিন পরাজিত হয়ে ফিরেছিলেন, কিন্তু ছেলেকে ত্যাগ করেননি। তিনি এক অদ্ভুত জেদ ধরলেন। তিনি বললেন, "আমার ছেলে মুসলমান হয়েছে তো কী হয়েছে? সে আমার কাছেই থাকবে।"

এরপর থেকে রামপাশার বাড়িতে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। বাবা বানারসী রাম তাঁর গৃহদেবতা বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরে পূজা করছেন, আর ওদিকে ছেলে বাবু খান স্থানীয় মসজিদে নামাজ পড়ছেন। একই ছাদের নিচে বেড়ে উঠল দুই বিশ্বাস, কিন্তু মাঝখানে কোনো দেয়াল উঠল না। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এই বাপ-ছেলের ভালোবাসার কাছে হার মেনেছিল।

হাছন রাজা চোখ খুললেন। সেই বাবু খানের রক্ত তাঁর শরীরে। আর সেই বানারসী রামের জেদও তাঁর শরীরে। তিনি মিশ্র রক্তের সন্তান। তাই হয়তো মন্দিরের ঘণ্টা আর মসজিদের আজান দুটোই তাঁকে সমানভাবে টানে। তিনি তো কোনো এক ধর্মের মানুষ নন, তিনি এই মাটির মানুষ।

"হুজুর!" নায়েবের ডাকে সম্বিৎ ফিরল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পুরনো দালানের ছায়াগুলো এখন দীর্ঘ হয়ে প্রেতাত্মার মতো দেখাচ্ছে। "কী খবর?" হাছন রাজা পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন।

নায়েব আমতা আমতা করে বললেন, "হুজুর, খবর ভালো নয়। তারক বাবু মানে আপনার জ্ঞাতি ভাই তারক চন্দ্র চৌধুরী প্রজাদের উস্কে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, আপনি নাকি জফরগড় বিক্রি করে দেউলিয়া হয়ে গেছেন। রামপাশার জমিও নাকি বিক্রি করে দেবেন।"

হাছন রাজার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তারক চন্দ্র! তাঁর নিজের রক্তের সম্পর্ক, অথচ আজ সে-ই সবচেয়ে বড় শত্রু। "তারক জানে না, বাঘ আহত হলে আরও ভয়ঙ্কর হয়?" হাছন রাজার গলার স্বর নিচু, কিন্তু তাতে বারুদের গন্ধ। "প্রজাদের বল, কাল সকালে আমি দরবার বসাব। আমি দেখতে চাই, কার বুকের পাটা কত বড় যে হাছন রাজার মুখের ওপর কথা বলে।"

তিনি হনহন করে কাছারি ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর মনে শান্তি নেই। জফরগড় বিক্রির ক্ষতটা এখনো দগদগে। তিনি জানেন, তারক চন্দ্রের কথা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। জফরগড় বিক্রি না করলে রামপাশা বাঁচানো যেত না। কিন্তু এই সত্যটা প্রজারা বুঝবে না।

রাতে রামপাশার বাংলো ঘরে শুয়ে হাছন রাজার ঘুম এল না। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দূরে কোথাও শেয়ালের হুক্কাহুয়া। তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন। তাঁর মনে পড়ল লক্ষণশ্রীর কথা। দিলারামের কথা। আহা! এখন যদি দিলারাম থাকত, তবে সুরটা ধরে রাখতে পারত।

তিনি উঠে বসলেন। দোয়াত-কলম বা গানের খাতা তাঁর কাছে নেই। তিনি লিখতে পারেন না, কিন্তু তাঁর বুকের ভেতর সুরের নদী বইছে। তিনি জানলার শিক ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন, “আগুন লাগাইয়া দিলো, কোনে, হাছন রাজার মনে" আগুন তো লেগেইছে। জফরগড় হারানোর আগুন, তারক চন্দ্রের ষড়যন্ত্রের আগুন, আর নিজের ভেতরের অতৃপ্তির আগুন। দেওয়ান হাছন রাজা অনুভব করলেন, তিনি এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের ওপর বসে আছেন। আর এই আগুন নেভানোর উপায় তাঁর জানা নেই।

হঠাৎ জানলার বাইরে একটা খসখস শব্দ হলো। হাছন রাজা সতর্ক হলেন। তাঁর শিকারি কান সজাগ হয়ে উঠল। তিনি বালিশের পাশ থেকে তাঁর কোষবদ্ধ তলোয়ারটি তুলে নিলেন। এটি তাঁর পূর্বপুরুষের তলোয়ার, যা তিনি সব সময় সাথে রাখেন।

"কে?" কোনো উত্তর নেই। শুধু বাতাসের শব্দ নাকি কোনো গুপ্তঘাতক? তারক চন্দ্র কি এত দূর যাবে? তিনি তলোয়ার হাতে জানলার কাছে গিয়ে উঁকি দিলেন। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। শুধু মনে হলো, একটা ছায়া দ্রুত সরে গেল বাগানের দিকে।

হাছন রাজা মুচকি হাসলেন। তিনি ভয় পান না। যার ধমনিতে বাবু খানের রক্ত, যে বংশ রূপার হাতি দিয়ে ছেলে কিনতে চায়, সেই বংশের ছেলে মৃত্যুভয় করে না। তলোয়ারটি তিনি আবার খাপের ভেতর রাখলেন।

তারপর বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে তিনি বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। ঘরজুড়ে নেমে এল জমাট অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকারে শুয়েও হাছন রাজার মনে হলো, বাইরের বাতাস আজ বড্ড ভারী। রামপাশার এই প্রাচীন নিস্তব্ধতার আড়ালে কোথাও যেন একটা বেসুরো বাজছে। ছায়াটা কি শুধুই মনের ভুল, নাকি অন্য কিছু সেই উত্তর আপাতত রামপাশার রাতের আঁধারেই চাপা পড়ে রইল।
[চলবে...]

লেখক পরিচিতি: রিপন ঘোষ, সহকারী শিক্ষক (পদার্থবিজ্ঞান), ঢাকাদক্ষিণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট। প্রকাশিত গ্রন্থ: কৃষ্ণচূড়ায় সিক্ত। ৮টি গল্প নিয়ে লেখা এই গল্পগ্রন্থটি ২০২৩ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয়।

আপনার মন্তব্য