ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—৫

 প্রকাশিত: ২০২৫-১২-৩০ ২৩:২০:৫১

রিপন ঘোষ:

পর্ব ৫: অন্দরমহলের ছায়াযুদ্ধ
দুপুরের রোদ তখনো লক্ষণশ্রীর উঠোন থেকে পুরোপুরি সরেনি। দেওয়ান বাড়ির বিশাল অন্দরমহলের খাবার ঘরটিতে এখন পিনপতন নীরবতা, অথচ সেখানে মানুষের অভাব নেই। মেঝেতে শ্বেতপাথরের ওপর পাতা হয়েছে মখমলের দস্তরখান। বাতাসে ভাসছে সিলেটি আভিজাত্যের সুঘ্রাণ; সাতকড়া দিয়ে রান্না করা গরুর গোশতের ঝাঁঝালো গন্ধের সাথে মিশেছে ঘি-এর ধোঁয়া ওঠা সুবাস।

দেওয়ান হাছন রাজা খেতে বসেছেন। তার সামনে কাঁসার থালা-বাটিতে সাজানো নানাবিধ ব্যঞ্জন। তাকে ঘিরে বসে আছেন তার তিন স্ত্রী। একই ছাদের নিচে বসবাস করা এই তিন নারীর জগত আলাদা, চাওয়া-পাওয়াও আলাদা।

দেওয়ান সাহেবের ডানদিকে বসেছেন প্রথমা স্ত্রী আজিজা বানু। শান্ত, ধীরস্থির। সংসারের বহু চড়াই-উতরাই দেখা এই নারীর চোখে এখন আর কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু একধরনের ক্লান্ত প্রশান্তি। তিনি নীরবে স্বামীর পাতে কালিজিরা চালের ভাত আর হাওরের তাজা কৈ মাছ ভাজা তুলে দিলেন।

বাম পাশে বসেছেন বোরজান বিবি। তার রূপের জৌলুস এখনো অটুট। পরনে উজ্জ্বল রঙের শাড়ি, হাতে সোনার চুড়ি। বোরজান বিবির চোখেমুখে একটা চাপা তেজ। তিনি মনে করেন, স্বামীর সোহাগ আদায় করে নিতে হয়, চেয়ে পাওয়া যায় না। তিনি স্বামীর পাতে এক চামচ ঘন মসুর ডাল তুলে দিলেন।

আর একটু দূরে, হাতে তসবিহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পিরানী বিবি। তিনি দূর থেকে তদারকি করছেন। তার দৃষ্টিতে সংসারের খুঁটিনাটির চেয়ে পরকালের চিন্তাই বেশি।

দরজার কাছে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে দিলারাম। তার হাতে রূপার গ্লাসে সুগন্ধি পানি। এই অভিজাত নারীদের মাঝখানে তার উপস্থিতি বড় বেমানান, অথচ বড় অপরিহার্য।

বোরজান বিবি হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভাঙলেন। স্বামীর পাতে এক চামচ ঘন দোলমা দিতে দিতে তিনি বাঁকা স্বরে বললেন, "শুনলাম, কাল রাতে নাকি রঙমহলে নতুন সুরের আমদানি হয়েছে? আর সেই সুর মনে রাখার জন্য এই ভরদুপুরেও বিশেষ দাসী ডাকার প্রয়োজন পড়ছে?"

তার কথার বিষাক্ত তীরটি সোজা গিয়ে বিঁধল দরজার কাছে দাঁড়ানো দিলারামের বুকে। সে মাথা নিচু করে রইল, কিন্তু তার হাতের গ্লাসটি সামান্য কেঁপে উঠল।

আজিজা বানু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি নরম গলায় বললেন, "বোরজান, ও তো হুকুমের দাসী। ওকে কথা শুনিয়ে কী লাভ?"

"লাভ-লোকসানের হিসাব কি আমরা বুঝি বুবু?" বোরজান বিবি এবার সরাসরি দিলারামের দিকে তাকালেন, তার চোখে ঈর্ষার আগুন। "আমরা তো শুধু ঘর সাজাই, গহনা পরে পুতুল সাজি। আর মনের খবর রাখে ওই সামান্য..."

দেওয়ান সাহেব খাওয়া থামিয়ে দিলেন। তার হাতটি ভাতের লোকমা মুখে তোলার আগেই স্থির হয়ে গেল। তিনি জানতেন, তার এই বিচিত্র জীবনযাপন অন্দরমহলে কী দাবানল সৃষ্টি করে। তিনি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন। বোরজান বিবির দিকে তাকিয়ে তিনি হাসলেন। সে হাসিতে কৌতুক আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই।

"বোরজান, হিংসা আগুনের মতো। ওটা অন্যকে পোড়ানোর আগে নিজেকেই পোড়ায়। দিলারাম আমার প্রেমিকা নয়, ও আমার গানের খাতা। খাতার ওপর কি কেউ রাগ করে?"

পিরানী বিবি তসবিহ জপতে জপতেই শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললেন, "গান আর সুর দিয়ে তো পেট ভরে না, আখেরাতও মেলে না। তুমি সংসারটা দেখবে কবে? তোমার বড় ছেলে গনিউর বড় হচ্ছে, একলিমুর এখন হাঁটতে শিখেছে। ওদের দিকে তো নজর নেই। তুমি যদি এমন আউলা হয়ে থাকো, তবে ওরা কী শিখবে?"

হাছন রাজা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিন স্ত্রী, তিন রকম তাদের চাওয়া। আজিজা চান শান্তি, বোরজান চান ক্ষমতা ও সোহাগ, আর সাজেদা চান পুণ্য। আর তিনি? তিনি চান মুক্তি। কিন্তু এই মুক্তির কথা এদের কাকে বোঝাবেন?

"আমি নজর দিলে ওরা আমার মতোই হবে। তার চেয়ে ওরা ওদের মতো বড় হোক," দেওয়ান সাহেব ক্লান্ত স্বরে বললেন।

তিনি দিলারামের দিকে হাত বাড়ালেন। "পানি দে।"

দিলারাম পা টিপে টিপে এগিয়ে এল। গ্লাসে পানি ঢেলে দেওয়ার সময় তার হাত কাঁপছিল। সে অনুভব করতে পারছিল তিনজন ক্ষমতাধর নারীর ঈর্ষাতুর দৃষ্টি তার পিঠে বিঁধে আছে। সে জানে, দেওয়ান সাহেবের এই আশকারাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কিন্তু এই মানুষটার তৃষ্ণা মেটানো ছাড়া তার যে আর কোনো ধর্ম নেই।

ঠিক তখনই অন্দরমহলের ভারী পর্দা সরে গেল। দরজায় শোনা গেল এক গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর, যা শুনে দেওয়ান বাড়ির সবাই তটস্থ হয়ে যায়।

"হাছন!"

সবাই সচকিত হয়ে উঠল। এলেন দেওয়ান সাহেবের মা, হুরমত জাহান বিবি। এই বাড়ির আসল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তিনি ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। তার পরনে সাদা থান কাপড়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের ভারে দেওয়ান সাহেবের মতো প্রতাপশালী জমিদারও যেন মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে গেলেন।

মা সোজা ছেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। "তুই নাকি আবার কাল কোড়া শিকারে যাবি?" মা প্রশ্ন করলেন। প্রশ্ন নয়, যেন কৈফিয়ত চাইলেন।
হাছন রাজা মাথা নিচু করে উত্তর দিলেন, "জি আম্মা।"

"রামপাশায় প্রজারা খাজনা দিচ্ছে না, জফরগড়ের জমিদারি হাতছাড়া হওয়ার পথে, আর তুই আছিস তোর পাখি আর গান নিয়ে? তোর আব্বা কি এই জন্য এতো সম্পত্তি রেখে গেছেন? আর..."

মা এবার দিলারামের দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টিতে ঘৃণা নেই, আছে একধরনের কঠোর শাসন।" এই মেয়েটা সারাদিন তোর ছায়ায় ছায়ায় থাকে কেন? অন্দরমহলে কি কাজ নেই?"

দেওয়ান সাহেব মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারলেন না। তিনি জানেন, এই মায়ের জেদ আর বুদ্ধির কাছে তিনি আজও সেই ছোট শিশুটিই রয়ে গেছেন। কিন্তু তার ভেতরের শিল্পী সত্তাটি যে বিদ্রোহ করতে চায়।

তিনি অর্ধসমাপ্ত খাবার রেখেই উঠে দাঁড়ালেন। "আমার খাওয়া শেষ।"

তিনি দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন এক থমথমে পরিবেশ। তিন স্ত্রী একে অপরের দিকে তাকালেন। তাদের মধ্যে সতীনের রেষারেষি আছে, কিন্তু স্বামীর এই উদাসীনতা আর শাশুড়ির শাসনের সামনে তারা আজ একবিন্দুতে মিলে গেছেন। আর তাদের সেই সম্মিলিত নীরবতার ভার বহন করে কোণায় দাঁড়িয়ে রইল অসহায় দিলারাম।

রাত গভীর। বাইরে অবিরাম বৃষ্টির শব্দ। সুরমা নদী আজ উত্তাল। দেওয়ান সাহেবের খাস কামরায় টিমটিমে আলো জ্বলছে। দিলারাম ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকল। সে জানে, আজ দুপুরে যা হয়েছে, তারপর এখানে আসাটা সাহসের কাজ। কিন্তু দেওয়ান সাহেব ডেকেছেন। না এসে উপায় নেই।

হাছন রাজা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিদ্যুৎ চমকালো, সেই আলোয় তার মুখটা ক্ষণিকের জন্য দেখা গেল। বড় বিষাদগ্রস্ত সেই মুখ। দিলারামকে দেখে তিনি ম্লান হাসলেন। "তুই খুব ভয় পেয়েছিস, তাই না রে?"

"না হুজুর," দিলারাম মিথ্যা বলল। তার গলা কাঁপছে।

"মিথ্যে বলিস না। আমি জানি। আমার মা, আমার স্ত্রীরা কেউ তোকে সহ্য করতে পারে না। তারা ভাবে তুই আমাকে জাদু করেছিস।"

হাছন রাজা এগিয়ে এসে দিলারামের সামনে দাঁড়ালেন। তার গলার স্বর খাদে নামল। "কিন্তু জাদুর খেলা তো তুই জানিস না দিলারাম। জাদু আছে ওই সুরে। ওরা শরীর চেনে, সংসার চেনে, জমিদারির হিসাব চেনে। কিন্তু সুর চেনে না। তুই চিনিস। তাই তুই আমার কাছে আছিস। এই বিশাল পৃথিবীতে তুই-ই আমার একমাত্র আয়না।"

দিলারামের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বলল, "হুজুর, আমি যে সামান্য দাসী। আমার কি সাধ্য আপনার পাশে দাঁড়ানোর? ওরা সবাই বড় মানুষ, আমি তো মাটির ঢেলা।"

"তুই দাসী নস," হাছন রাজা দৃঢ় স্বরে বললেন। তিনি জানলার শিক ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।

"তুই আমার গানের পাখি। আমি যদি দেহ হই, তুই আমার ছায়া। লোকে আমাকে লম্পট বলতে পারে, পাগল বলতে পারে। কিন্তু আমি অকৃতজ্ঞ নই। মনে রাখিস দিলারাম, হাছনের গান যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন তোর নামও কেউ মুছতে পারবে না।"
তিনি গুনগুন করে গাইতে শুরু করলেন, সোনা বন্ধে আমারে পাগল করিল...

দিলারাম চোখ মুছল। সে বুঝল, এই মানুষটির জন্য সে সারা জীবন সবার গঞ্জনা, সমাজের অপবাদ আর ভর্ৎসনা সইতে রাজি আছে। কারণ এই মানুষটি তাকে এমন এক জগতে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোনো জাত নেই, পাত নেই, আছে শুধু এক অনন্ত প্রেম।

বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। সুরমা নদীর জলে সেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মিশে যাচ্ছে, ঠিক যেমন করে হাছন রাজার দীর্ঘশ্বাসগুলো মিশে যাচ্ছে মহাকালের হাওয়ায়। এই রাতে লক্ষণশ্রীর অন্দরমহলে এক নিঃসঙ্গ রাজা তার সিংহাসন ছেড়ে এক দাসীর চোখের জলে নিজের মুক্তি খুঁজছেন।

[চলবে...]

লেখক পরিচিতি: রিপন ঘোষ, সহকারী শিক্ষক (পদার্থবিজ্ঞান), ঢাকাদক্ষিণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট। প্রকাশিত গ্রন্থ: কৃষ্ণচূড়ায় সিক্ত। ৮টি গল্প নিয়ে লেখা এই গল্পগ্রন্থটি ২০২৩ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয়।

আপনার মন্তব্য