প্রকাশিত: ২০২৫-১২-২৩ ১৯:৪২:৩৪
রিপন ঘোষ:
পর্ব—৪: পিঞ্জিরার পাখি
লক্ষ্মণশ্রীর দেওয়ান বাড়ির অন্দরমহলে সকাল হয় একটু ভিন্নভাবে। বাইরের কাছারি ঘরে যখন প্রজাদের কোলাহল শুরু হয়, অন্দরমহলের ভারী পর্দার আড়ালে তখনো একধরনের নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। কিন্তু একজন মানুষ ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই জেগে ওঠে। সে এই বাড়ির কোনো বেগম নয়, কোনো কর্ত্রী নয়, সে এক আশ্রিতা; নাম তার দিলারাম।
দিলারামের বয়স খুব বেশি নয়, বাইশ-তেইশের কোঠায়। গায়ের রং শ্যামলা, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত লাবণ্য মাখানো। তার চোখ দুটো ডাগর, তাতে সর্বদা এক ধরনের ভক্তি, ভয় ও বিস্ময় খেলা করে। সে এই বাড়ির শত শত দাস-দাসীর মধ্যে একজন একান্নভুক্ত সদস্য, অর্থাৎ সে এই পরিবারের অন্ন ধ্বংস করে এবং এই পরিবারের ছায়াতেই বাঁচে। কিন্তু সে সবার চেয়ে আলাদা। সে দেওয়ান সাহেবের জীবন্ত খাতা।
দেওয়ান সাহেব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন, তার অক্ষরের দৌড় কেবল দস্তখত পর্যন্ত। কিন্তু তার বুকের ভেতর যখন সুরের জোয়ার আসে, তখন কাগজ-কলম খোঁজার সময় থাকে না। তখন তিনি যাকে খোঁজেন, সে এই দিলারাম। দেওয়ান সাহেবের গানের কলিগুলো দিলারাম তার স্মৃতিতে গেঁথে রাখে, ঠিক যেমন করে মানুষ মহামূল্যবান রত্ন সিন্দুকে লুকিয়ে রাখে।
ভোরবেলায় দিলারাম হাতে রুপোর পানের বাটা ও সুগন্ধি জলের গ্লাস নিয়ে দেওয়ান সাহেবের খাস কামরায় প্রবেশ করল। দেওয়ান সাহেব তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মশারির মিহি জালের ভেতর দিয়ে তার সুঠাম দেহটি দেখা যাচ্ছে। দিলারাম ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে জানলার ভারী মখমলের পর্দাগুলো সরিয়ে দিল। সুরমা নদী থেকে আসা ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া ও আলো ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল।
দিলারাম কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে ঘুমন্ত মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটি যখন জেগে থাকেন, তখন তার দাপটে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়। আর ঘুমের মধ্যে? ঘুমের মধ্যে তাকে মনে হয় এক অসহায় শিশু, যে তার মায়ের কোল খুঁজছে। দিলারাম জানে, এই বাড়িতে তার অবস্থান খুব নড়বড়ে। সে স্ত্রী নয়, অথচ স্ত্রীর চেয়েও বেশি সে দেওয়ান সাহেবের মনের খবর রাখে। সে বাইজি নয়, অথচ সুরের ভুবনে সে-ই প্রধান সঙ্গিনী। এই দ্বৈত সত্তা তাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
দেওয়ান সাহেব নড়েচড়ে উঠলেন। দিলারাম জানত ঠিক এই সময়েই তার ঘুম ভাঙবে। সে মৃদু কম্পিত স্বরে ডাকল, "হুজুর! সকাল হয়েছে।"
দেওয়ান সাহেব চোখ মেললেন। তার চোখের কোণে এখনো গত রাতের ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু দিলারামকে দেখে তার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। সেই হাসিতে মালিকের আদেশ নেই, আছে বন্ধুর নির্ভরতা। "দিলারাম? তুই এসেছিস? আয়, কাছে বস।"
দিলারাম বিছানার পাশে নিচু হয়ে বসল, কিন্তু নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। দেওয়ান সাহেব আড়মোড়া ভেঙ্গে বললেন, "কাল রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি রে দিলারাম। বড় অদ্ভুত স্বপ্ন।"
"কী স্বপ্ন হুজুর?" দিলারাম কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল।
"দেখলাম আমি মরে গেছি। আমার এই দেওয়ান বাড়ি, এই হাতি-ঘোড়া, এই নৌকা সব পড়ে আছে। কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না। আমার কবরের পাশে কেউ নেই। শুধু একটা পাখি, ঠিক আমার ওই কোড়া পাখির মতো দেখতে, সে আমার কবরের শিয়রে বসে কাঁদছে।"
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুই কাঁদিস কেন? তুই তো বনের পাখি, তোর তো ওড়ার কথা।" সে বলল, "আমি তো পাখি না, আমি তোর গান। তুই মরে গেছিস, এখন আমাকে কে গাইবে? আমাকে কে মনে রাখবে?"
বলতে বলতে দেওয়ান সাহেবের গলা ধরে এল। তিনি উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে রোদে ঝলমল করছে তার বিশাল সাম্রাজ্য। কিন্তু তার মনে হচ্ছে সব অন্ধকার। তিনি যেন নিজের অস্তিত্বের সংকটে ভুগছেন। তিনি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন। "দিলারাম, ওই সুরটা ধর তো... যেটা কাল বিকেলে গাইছিলাম। মনে আছে?"
দিলারাম জানে, দেওয়ান সাহেবের খেয়াল কখন কোন দিকে যায়। তার স্মৃতিশক্তি প্রখর। সে কোনো ভণিতা না করে গুনগুন করে গেয়ে উঠল, তার গলাটা যেন ভোরের শিশিরের মতো স্বচ্ছ ও করুণ - "সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল, সোনা বন্ধে আমারে পাগল করিল..."
দিলারামের গলায় সুর শুনে দেওয়ান সাহেব যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে দিলারামের সামনে দাঁড়ালেন। "হ্যাঁ, হ্যাঁ! এটাই। দেওয়ানা বানাইল! আমি তো দেওয়ানা রে দিলারাম। আমি পাগল। এই জগত আমাকে পাগল করেছে, নাকি আমি জগতকে পাগল করেছি?"
দিলারাম চুপ করে রইল। সে জানে, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ান সাহেব তার কাছে চান না, তিনি নিজের কাছেই চান। দিলারাম শুধু এইটুকু জানে, এই মানুষটি বাইরে যত কঠোরই হন না কেন, ভেতরে তিনি এক অবুঝ শিশু। আর এই শিশুর সব কান্না, সব হাহাকার জমা থাকে দিলারামের বুকের ভেতর।
দুপুরবেলা। সূর্য তখন মধ্যগগনে। আজ কাছারি ঘরে বসার কথা ছিল দেওয়ান সাহেবের। প্রজারা অপেক্ষা করছে, নায়েব-গোমস্তারা নথিপত্র নিয়ে বসে আছে। কিন্তু তিনি যাননি। তার মন আজ বড়ই বিক্ষিপ্ত। তিনি তার খাস কামরায় বসে পুরনো নথিপত্র ঘাঁটছিলেন। হঠাৎ একটি পুরনো হলদেটে দলিলের দিকে তার চোখ আটকে গেল। দলিলটি অনেক আগের, তার বাবার আমলের। সেখানে ফারসি হরফে লেখা - 'জমিদার দেওয়ান আলী রেজা চৌধুরী'।
বাবার নামের দিকে তাকিয়ে তার নিজের নামের ইতিহাস মনে পড়ে গেল। এক বিচিত্র ও নাটকীয় ইতিহাস। এই নাম পরিবর্তনের পেছনে লুকিয়ে আছে তার মায়ের এক জেদ, এক স্বপ্ন।
তার জন্মের পর বাবা শখ করে নাম রেখেছিলেন ওহিদুর রেজা। বাবার ইচ্ছে ছিল বড় ভাই উবায়দুর রেজার নামের সাথে মিলিয়ে এই নাম রাখবেন। কিন্তু বাদ সাধলেন তার মা। তেজস্বিনী ও জেদি হুরমত জাহান বিবি স্বামীর দেওয়া নাম মানলেন না। তার এক কথা, "আমার ছেলে হবে হাজার মানুষের মধ্যমণি। তার নাম হবে এমন যা সবার মুখে থাকবে, যা শুনে মানুষ থমকে দাঁড়াবে।"
হুরমত জাহান বিবি সোজা লোক পাঠালেন সিলেট আদালত ভবনে। সেখানে নাজির আব্দুল্লাহ নামে এক জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। হুরমত জাহানকে সবাই সমীহ করত। উনার জেদের কাছে হার মেনে, নাজির সাহেবের পরামর্শে নাম বদলে রাখা হলো ‘হাছন’। আরবিতে হাছান মানে সুন্দর আর বংশ পদবী রাজা। সব মিলিয়ে নাম হলো হাছন রাজা।
স্মৃতির পাতা ওলটাতে ওলটাতে দেওয়ান সাহেবের ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সতেরো বছর বয়সে যখন বাবা এবং বড় ভাই দুজনই মারা গেলেন, তখন এই বিশাল জমিদারির ভার তার কিশোর কাঁধে এসে পড়ল। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী জমিদাররা শকুনের মতো তাকিয়ে ছিল। তারা ভেবেছিল এই এতিম কিশোরকে ঠকিয়ে খাবে, তাকে পুতুল বানিয়ে রাখবে। কিন্তু তারা জানত না, এই কিশোরের ধমনীতে বইছে আর্যবংশীয় রাজাদের রক্ত। তিনি জ্বলে উঠলেন আগুনের মতো। তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন শপথ করেছিলেন "আমি কারো সন্তুষ্টির জন্য বাঁচব না। আমি শাসন করব। আমি হব সত্যিকারের রাজা।"
তিনি কলমটা কালিতে ডোবালেন। সাদা কাগজের ওপর গোটা গোটা অক্ষরে নিজের নামটা লিখলেন - ‘শ্রী দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী’।
নামটা লিখে তিনি সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। হাছন রাজা। সুনামগঞ্জের ত্রাস, আবার সুনামগঞ্জের গর্ব। লোকে বলে, হাছন রাজার দিলে দয়া নেই। আবার সেই লোকেরাই বিপদে পড়লে হাছন রাজার পায়ে এসে পড়ে। তিনি কি দয়ালু? নাকি নিষ্ঠুর? তিনি কি ভোগী? নাকি ত্যাগী?
হঠাৎ তার মনে হলো, এই নামটাও আসলে একটা খোলস। এই ‘রাজা’ উপাধি, এই ‘চৌধুরী’ বংশমর্যাদা, এই ‘দেওয়ান’ পদবি, সবই একদিন ধুলোয় মিশে যাবে। থাকবে শুধু ‘হাছন’। আর থাকবে তার গান।
"দিলারাম!" তিনি বেশ উচ্চস্বরে ডাকলেন। তার কণ্ঠস্বরে একধরনের হাহাকার। দিলারাম পাশের ঘরেই ছিল। সে এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়াল। তার হাতে কিছু শুকনো কাপড়। "বলুন হুজুর।"
"কাছারি ঘরে বলে দে, আজ আমি বিচার করব না। আজ আমি অন্য বিচার নিয়ে ব্যস্ত।"
"কী বিচার হুজুর?" দিলারাম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল।
"নিজের বিচার। হাছন রাজার বিচার। দিলারাম, তুই কি জানিস তোর মনিব আসলে কে? তুই কি জানিস এই হাছন রাজা নামের আড়ালে কে লুকিয়ে আছে?"
দিলারাম বিনীতভাবে বলল, "জানি হুজুর। আপনি এই মুল্লুকের রাজা। আপনি আমাদের অন্নদাতা।"
"ভুল!" হাছন রাজা চিৎকার করে উঠলেন। "ভুল! আমি রাজা নই। আমি এক কয়েদি। দেখিস না? আমি এই সোনার পিঞ্জিরায় আটকা পড়েছি। আমার প্রাণপাখিটা ছটফট করছে। ও উড়তে চায় রে দিলারাম, ও উড়তে চায়।"
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে গান ধরলেন, এবার আর গুনগুন করে নয়, বুকফাটা আর্তনাদ করে - "মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে... কান্দে হাছন রাজার মন মনিয়া রে..."
দিলারাম দেখল, তার মনিবের দুই চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এই কান্না কোনো কিছু হারানোর কান্না নয়, এ হলো নিজেকে না পাওয়ার কান্না। দিলারাম জানে, এই গান তাকে মনে রাখতে হবে। কারণ কাল সকালে যখন হাছন রাজা আবার জমিদার হয়ে উঠবেন, তখন তিনি এই কান্নার কথা ভুলে যাবেন। কিন্তু দিলারাম ভুলবে না। সে যে এই গানের পাখির জীবন্ত খাতা।
[চলবে...]
লেখক পরিচিতি: রিপন ঘোষ, সহকারী শিক্ষক (পদার্থবিজ্ঞান), ঢাকাদক্ষিণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সিলেট। প্রকাশিত গ্রন্থ: কৃষ্ণচূড়ায় সিক্ত। ৮টি গল্প নিয়ে লেখা এই গল্পগ্রন্থটি ২০২৩ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয়।
আপনার মন্তব্য