প্রকাশিত: ২০২৬-০২-১০ ১৪:৩৭:৫১
রিপন ঘোষ:
পর্ব—৯: ঘরে ফেরা
মল্লিকপুরের আকাশটা আজ বড্ড মেঘলা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, কিন্তু জমিদার গোবিন্দচন্দ্র শর্মার বৈঠকখানায় আজ বাতি জ্বলেনি। বাড়ির সদর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
গোবিন্দ শর্মা অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। পাশে বসে আছেন তার ভাই, জজকোর্টের নামকরা উকিল নবীনচন্দ্র শর্মা। নবীনচন্দ্রের সেই ধূর্ত চাউনি আজ ম্লান, চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। একটু আগেই এক ঘোড়সওয়ার খবর নিয়ে এসেছে সিলেট থেকে হাছন রাজা ছাড়া পেয়েছেন এবং তিনি সদলবলে সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন।
"শুনলে তো নবীন?" গোবিন্দ শর্মা ফিসফিস করে বললেন। "খবর পাকা। হাইকোর্ট তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। ইংরেজ জজরা সব ধরে ফেলেছে।" নবীনচন্দ্র মাথা নিচু করে বললেন, "আমি ভেবেছিলাম নিদেনপক্ষে দু তিন বছর তাকে জেলের ঘানি টানাতে পারব। কিন্তু তার ভাগ্যটা বড়ই ভালো।"
"ভাগ্য নয় নবীন, বাঘের জোর!" গোবিন্দ শর্মা ধমকে উঠলেন। "এখন জজের কথা রেখে নিজের কথা ভাব! হাছন রাজা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। ও কি আমাদের ছেড়ে কথা বলবে? তুমি তো ওর মেজাজ জানো। রামপাশা এখান থেকে খুব দূরে নয়। ও যদি চায়, ওর লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে মল্লিকপুর তছনছ করে দিতে পারে।"
নবীনচন্দ্র ঢোক গিললেন। তারা জানেন, আহত বাঘ সুস্থ বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। তারা হাছন রাজার চরিত্রে কালিমা লেপন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই কালির ছিটা এখন তাদের গায়েই লাগবে। ভয়ে মল্লিকপুরের শর্মা বাড়ির দরজা জানালা বন্ধ হয়ে গেল। তারা অপেক্ষা করতে লাগল এক নিশ্চিত প্রতিশোধের ঝড়ের।
সুরমা নদীর ওপারে লক্ষণশ্রীর দেওয়ান বাড়িতে আজ ঈদের আনন্দ। খবর এসেছে দেওয়ান সাহেব আসছেন। বাড়ির প্রধান ফটক সাজানো হয়েছে আমপাতা আর কলাগাছ দিয়ে। প্রজারা লাঠিখেলার আয়োজন করেছে। নহবতখানায় সানাই বাজছে।
অন্দরমহলে হুরমত জাহান বিবি আজ জায়নামাজ ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। তার হাতে তসবিহ, কিন্তু দৃষ্টি সদর দরজার দিকে। গত কয়েক মাস এই তেজস্বিনী নারী একাই এই বিশাল সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন। ছেলের অপমানে তিনি একদিনের জন্যও চোখের পানি ফেলেননি সবার সামনে। কিন্তু আজ? আজ কি তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন?
তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন আজিজা বানু, বোরজান বিবি আর সাজেদা বানু। বোরজান বিবি আজ অনেকদিন পর ভালো শাড়ি পরেছেন। সাজেদা বানুর কোলে ছোট্ট একলিমুর। অবুঝ শিশুটি জানে না আজ কেন এত আয়োজন, সে শুধু বড় বড় চোখে তাকিয়ে দেখছে।
দিলারাম দৌড়াদৌড়ি করছে। সে নিজের হাতে হুজুরের খাস কামরা পরিষ্কার করেছে। বিছানায় নতুন চাদর পেতেছে। আতরদানিতে তাজা গোলাপ জল ভরে রেখেছে। তার মনে হচ্ছে, আজ যেন তার পুনর্জন্ম হয়েছে।
সন্ধ্যা সাতটা। মশাল আর লণ্ঠনের আলোয় ঝলমল করছে দেওয়ান বাড়ির উঠোন। হাজারো প্রজার গগনবিদারী স্লোগান "দেওয়ান হাছন রাজার জয়! সত্যের জয়!" হাছন রাজা পালকিতে চড়েননি, ঘোড়ায়ও চড়েননি। পানসি নৌকা থেকে ঘাটে নেমে তিনি হেঁটেই বাড়ির সীমানায় ঢুকলেন। তার পেছনে নায়েব, মোসাহেব আর সাধারণ মানুষের ভিড়। সবাই আশা করেছিল, দেওয়ান সাহেব এসেই হুঙ্কার দেবেন। যারা ষড়যন্ত্র করেছে, তাদের নাম ধরে বিচার চাইবেন। কিন্তু হাছন রাজা অদ্ভুত শান্ত।
তিনি ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। কেউ একজন এগিয়ে এসে তার গলায় ফুলের মালা পরাতে চাইল। হাছন রাজা হাত তুলে তাকে বারণ করলেন। "মালা নয়," তার ভরাট কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কিন্তু তাতে সেই চেনা দম্ভ নেই। "আমি কোনো যুদ্ধ জয় করে আসিনি। আমি শুধু নিজেকে চিনে ফিরেছি।"
তিনি সোজা চলে গেলেন অন্দরমহলের দিকে। বাইরের কোলাহল, বাজনা, স্লোগান কোনোকিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না।
বারান্দায় উঠতেই মায়ের সাথে চোখাচোখি হলো। হুরমত জাহান বিবি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ছেলের দিকে। ছেলের গাল ভেঙেছে, চোখের নিচে কালি, কিন্তু মাথাটা উঁচু। হাছন রাজা এগিয়ে গিয়ে মায়ের পায়ের ওপর উপুড় হয়ে পড়লেন। তিনি কাঁদলেন না, কোনো কথা বললেন না। শুধু মায়ের পা দুটো শক্ত করে ধরে রাখলেন। যেন ঝড়ের পর নৌকা তার নোঙর খুঁজে পেল।
হুরমত জাহান বিবি ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। তার পাথরের মতো শক্ত মুখটা ভেঙেচুরে গেল। দুই ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ল ছেলের চুলের ওপর। "ফিরেছিস?" মা ফিসফিস করে বললেন। "আমি জানতাম তুই ফিরবি। হাছন রাজার মাথা কাটার সাধ্য কোনো শর্মা বা ইংরেজের নাই।"
হাছন রাজা মুখ তুললেন। "আম্মা, ওরা আমাকে শিকল পরাতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা জানে না, আমি তো কবে থেকেই শিকল পরে আছি। এই যে জমিদারি, এই যে নাম যশ এগুলোই তো আমার শিকল।" মা ছেলের কথার অর্থ পুরোপুরি বুঝলেন না, কিন্তু ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি শিউরে উঠলেন। এ তো তার সেই চেনা চঞ্চল, ভোগী ছেলে নয়। এ যেন এক অচেনা সন্ন্যাসী।
স্ত্রীরা এগিয়ে এলেন। বোরজান বিবি কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না। আজিজা বানু নীরবে চোখের জল মুছলেন। পিরানী বিবি একলিমুরকে এগিয়ে দিলেন বাবার কোলে। হাছন রাজা ছেলেকে কোলে নিলেন। শিশুটি বাবার অপরিচিত মুখ দেখে কেঁদে উঠল। হাছন রাজা ম্লান হাসলেন। "কাঁদিস না বাপ। তোর বাবা এখন আর বাঘ নয়, তোর বাবা এখন শুধুই এক ক্লান্ত মুসাফির।"
উৎসবের কোলাহল থেমে গেছে। প্রজারা যার যার ঘরে ফিরে গেছে। মল্লিকপুরের শর্মা বাবুরা হয়তো এখনো ভয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে জানলা দিয়ে উঁকি মারছে। কিন্তু দেওয়ান বাড়িতে কোনো প্রতিশোধের আয়োজন নেই, আছে এক জমাটবাঁধা নিস্তব্ধতা।
হাছন রাজা ধীর পায়ে তাঁর খাস কামরায় ঢুকলেন। ঘরটি আগের মতোই সাজানো। সেই দামি পালঙ্ক, ছাদ থেকে ঝুলছে বেলোয়ারি ঝাড়লণ্ঠন, মেঝেতে পারস্যের গালিচা। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ সমান এক বিশাল আয়না। হাছন রাজা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় আয়নায় যে প্রতিবিম্বটি ভেসে উঠল, তাকে তিনি চিনতে পারলেন না। গাল ভেঙে গেছে, চোখের নিচে কালসিটে, চুলে পাক ধরেছে। এই লোকটাই কি সেই হাছন রাজা? যে নিজের রূপের বড়াই করত? যে লক্ষ টাকা ওড়াত বাইজি নাচে? জেলখানার সেই সাত নম্বর সেলের স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার আর এই ঝাড়লণ্ঠনের তীব্র আলোর মধ্যে তিনি আজ কোনো তফাত খুঁজে পেলেন না। দুটোই তার কাছে খাঁচা মনে হলো।
দরজার পর্দার ওপাশে একটা মৃদু আওয়াজ হলো। হাছন রাজা ফিরে তাকালেন না। তিনি জানেন কে এসেছে। আতরের গন্ধ নয়, জায়নামাজের স্নিগ্ধ সুবাসই বলে দিচ্ছে আগন্তুকের পরিচয়। পিরানী বিবি নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে এক গ্লাস গরম দুধ। তিনি জানতেন, জেলফেরত স্বামীর শরীরে হয়তো ক্লান্তি নেই, কিন্তু মনে এক বিশাল ভাঙন ধরেছে।
হাছন রাজা আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই ফিসফিস করে বললেন, "বিবি, বাতিগুলো কমিয়ে দাও। এত আলো আমার চোখে সইছে না। আমার এখন অন্ধকারই ভালো লাগে।" পিরানী বিবি কোনো কথা বললেন না। দুধের গ্লাসটি টুলের ওপর রেখে তিনি ধীর হাতে ঝাড়লণ্ঠনের সলতে কমিয়ে দিলেন। ঘরজুড়ে নেমে এল এক মায়াবী আঁধার। সেই আঁধারে স্বামীর ছায়াটাকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হলো তাঁর।
"সবাই অপেক্ষা করছে," সাজেদা বানু শান্ত স্বরে বললেন। "প্রজারা ভাবছে, কাল সকালেই লাঠিয়াল বাহিনী যাবে মল্লিকপুরে। গোবিন্দ শর্মার বিচার হবে। তুমি কী হুকুম দেবে?"
হাছন রাজা ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি। যে হাসিতে কোনো দম্ভ নেই, আছে একধরনের করুণা। "বিচার? বিচার তো আল্লাহ করে দিয়েছেন পিরানী। আমি জেল থেকে ফিরেছি, আর ওরা বাইরে থেকেও জেলের ভয়ে মরছে এটাই তো ওদের বড় শাস্তি।"
তিনি জানলার কাছে এগিয়ে গেলেন। বাইরে সুরমা নদীর বুকে চাঁদের আলো চিকচিক করছে। "আমি যদি ওদের মেরে ফেলি, তবে তো ওরা একবারেই মরে যাবে। কিন্তু এখন ওরা প্রতিদিন মরবে। তাছাড়া..." তিনি স্ত্রীর চোখের দিকে তাকালেন, "যে হাছন রাজা প্রতিশোধ নিত, সে তো ওই জেলখানাতেই মরে গেছে। এ এক অন্য মানুষ ফিরে এসেছে।"
সাজেদা বানু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এই সেই মানুষ, যার রাগের আগুনে পুরো সুনামগঞ্জ কাঁপত? আজ তাঁর গলায় এ কোন বৈরাগ্যের সুর? হাছন রাজা দেয়াল থেকে তাঁর প্রিয় দোতরাটি নামিয়ে নিলেন। বহুদিন পর এই যন্ত্রে আবার স্পর্শ লাগল তাঁর। তিনি আলতো করে তারে টোকা দিলেন। টুং! শব্দটা নিস্তব্ধ ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো।
"জেলে থাকতে রোজ সকালে একটা পাখি এসে দেওয়ালের ওপর বসত বিবি। ও জানত না আমি কয়েদি নাকি রাজা। ওর কাছে আমি শুধুই একজন মানুষ। আমার মনে হয়, আমার ভেতরের সেই দাপুটে রাজা পাখিটা মরে গেছে। এখন যে পাখিটা বুকের ভেতর ডাকছে, সে বড় অচিন পাখি। সে খাঁচা মানতে চায় না।"
তিনি সুর বাঁধলেন। আজকের সুর কোনো চটুল প্রেমের সুর নয়। এক উদাস, হাহাকার মেশানো সুর। তিনি গাইতে শুরু করলেন, খুব নিচু স্বরে, যেন শুধু নিজের আত্মার জন্য "কি হইল রে, কি হইল রে... হাছন রাজার কি হইল রে..."
সাজেদা বানু জানলার পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। তাঁর মনে হলো, আজ রাতে এই ঘরে তাঁর স্বামীর পুনর্জন্ম হলো। জেলখানার পাষাণ মেঝেতে অপমানের আগুনে পুড়ে যে মানুষটি ফিরে এসেছেন, তিনি আর লক্ষণশ্রীর জমিদার নন। তিনি এখন এক মরমী সাধক, যিনি মাটির পৃথিবীতে থেকেও আসমানের খবর রাখেন।
সাজেদা বানুর অজান্তেই চোখ ভিজে উঠল। তিনি মনে মনে বললেন, 'হে আল্লাহ, তুমি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিয়েছ ঠিকই, কিন্তু এ কোন অচিন মানুষকে পাঠালে?'
মল্লিকপুরে যখন ভয়ের রাত কাটছে, লক্ষণশ্রীতে তখন সুরের জাদুতে এক নতুন ভোরের অপেক্ষা।
[চলবে]
আপনার মন্তব্য