ধারাবাহিক উপন্যাস: পিঞ্জিরা—১০

 প্রকাশিত: ২০২৬-০২-১৮ ২২:১০:৫০

রিপন ঘোষ:

পর্ব—১০: সুরের খেয়া
জেল থেকে ফিরে আসার পর কেটে গেছে বেশ কয়েকমাস। বাইরের কোলাহল থেমেছে, শর্মা বাবুদের ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু হাছন রাজার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা বাসা বেঁধেছে। তাঁর শরীরের চেয়ে মনের পরিবর্তনটাই ছিল বেশি চোখে পড়ার মতো।

যে মানুষটি একসময় নিজের রূপের দম্ভে মাটিতে পা ফেলতেন না, যার ইশারায় বাইজিদের আসর বসত, আজ সেই মানুষটির দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে একাকী। তিনি এখন আর আগের মতো শিকারে যান না, প্রজাদের খাজনার হিসাব নিতে কাছারি ঘরে বসেন না। এমনকি তাঁর প্রিয় জং বাহাদুর ঘোড়াটিও আস্তাবলে অলস সময় কাটায়।

তেঘরিয়ার বিশাল দেওয়ান বাড়ির বারান্দায় বসে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুরমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। শরতের আকাশ থেকে পেঁজা তুলোর মতো মেঘগুলো সুরমা নদীর জলে ছায়া ফেলে আবার কোথায় যেন হারিয়ে যায়। হাছন রাজার মনে হয়, এই মেঘগুলোর মতোই তাঁর জীবনের সমস্ত অহংকার, প্রতিপত্তি আর যৌবন একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে? এই শূন্যতার শেষ কোথায়?

হাছন রাজার মনে হয়, তিনি এক বিশাল সাগরের মাঝখানে ভাসছেন। কূল-কিনারা নেই। জেলখানায় বসে তিনি যে সত্যের দেখা পেয়েছিলেন, যে বৈরাগ্য তাঁকে স্পর্শ করেছিল, তা এখন তাঁকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, এই জমিদারি, এই ভোগ-বিলাস সবই মিথ্যা। কিন্তু সত্যটা কী? কে বলে দেবে সেই পথের সন্ধান?

একদিন পড়ন্ত বিকেল। হাছন রাজা তাঁর খাস কামরায় বসে দোতরায় আনমনে আঙুল বুলাচ্ছিলেন। দিলারাম অদূরে বসে পানের বাটা সাজাচ্ছে। হঠাৎ বাড়ির দেউড়ি থেকে এক উদাস সুর ভেসে এল। এক বৈরাগী ভিক্ষুক একতারা হাতে গান গাইতে গাইতে ভিক্ষা চাইছে।

"ভ্রমর কইয়ো গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে, অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।"

গানটার সুর এত করুণ আর আবেদন এত গভীর যে হাছন রাজার হাতের দোতরা থেমে গেল। তিনি কান খাড়া করলেন। সুরটা বড় করুণ, বড়ই আপন। মনে হলো, তাঁর বুকের ভেতরের না বলা কথাগুলোই ওই ভিখারি গেয়ে শোনাচ্ছে। বিচ্ছেদ! হ্যাঁ, এই বিচ্ছেদই তো তাঁকে পোড়াচ্ছে। কিন্তু কার সাথে বিচ্ছেদ? স্রষ্টার সাথে? নাকি নিজের সত্তার সাথে?

তিনি দিলারামকে ইশারা করলেন। "দিলারাম, ওই লোকটাকে ডেকে নিয়ে আয়।"

দিলারাম দেউড়ি থেকে সেই বৈরাগীকে ডেকে আনল। লোকটার পরনে গেরুয়া বসন, গলায় তুলসীর মালা, কপালে তিলক। জমিদারের সামনে এসে সে ভয়ে জড়সড় হয়ে পড়ল।

তিনি বৈরাগীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। " ভয় পেও না। তোমার নাম কী? আর এই গান কার বাঁধা? সুরটা তো আমার বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল।"

বৈরাগী সসম্ভ্রমে মাথা নুইয়ে বলল, "হুজুর, আমার নাম দীনবন্ধু। আর এই গান তো আমার নয়, এই গান জগন্নাথপুরের কেশবপুর গ্রামের সাধক রাধারমণ দত্তের। তিনি তো আর জমিদার নন, তিনি প্রেমের কাঙাল। রাধার বিরহে তিনি দিনরাত চোখের জলে ভাসেন আর এই সব গান বাঁধেন।"

"রাধারমণ দত্ত?" হাছন রাজা নামটা বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন। নামটা তিনি আগেও শুনেছেন। তাঁর চেয়ে বয়সে বেশ বড়, এক বৈষ্ণব সাধক। এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের সন্তান। কিন্তু জমিদারি বা সংসারের মায়া ত্যাগ করে তিনি এখন বৈষ্ণব সাধক। হাছন রাজার মনে হলো, এই লোকটার বুকেও তো একই আগুন জ্বলছে! জাত আলাদা, ধর্ম আলাদা, কিন্তু দুজনেরই গন্তব্য তো এক, সেই অধরা প্রেমময়ের খোঁজ।

হাছন রাজা জিজ্ঞেস করলেন, "রাধারমণের শরীর-স্বাস্থ্য কেমন?"

"হুজুর, তিনি তো দেহধরেই জ্যান্ত মরা। সারাদিন কৃষ্ণের ধ্যানে মগ্ন থাকেন। তাঁর গানে পাথর গলে যায় হুজুর।"

হাছন রাজা চুপ করে রইলেন। একজন হিন্দু সাধক, আর একজন মুসলমান জমিদার। কিন্তু দুজনেরই ব্যথার উৎস এক। রাধারমণ কাঁদছেন কৃষ্ণের জন্য, আর হাছন কাঁদছেন তাঁর অচিন পাখির জন্য। জাত-পাত, ধর্মের দেয়াল সবই তো মানুষের তৈরি। আসল কান্না তো আত্মার।

হাছন রাজা পকেট থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে দীনবন্ধুর হাতে দিলেন। "গাও দীনবন্ধু, রাধারমণের আরেকটি গান গাও।"

দীনবন্ধু চলে গেল, কিন্তু হাছন রাজার মনে ঝড় তুলে দিয়ে গেল। তাঁর খুব ইচ্ছে হলো একবার ওই মানুষটাকে দেখার। সেদিন রাতে হাছন রাজার ঘুম এল না। তিনি অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো, এই বিশাল পৃথিবীতে একজন মানুষ অন্তত আছে, যে তাঁর এই শূন্যতাটা বুঝবে। তিনি রাধারমণকে দেখতে চান, তাঁর সাথে কথা বলতে চান। কিন্তু তিনি জমিদার, চাইলেই কি হুট করে কেশবপুরের জঙ্গলে যেতে পারেন? আর রাধারমণ তো সাধক, তিনি কি জমিদারের তলব মানবেন?

পরদিন সকালে তিনি নায়েবকে ডাকলেন। "নায়েব মশাই, কাগজ-কলম নিন। আমি একটা পত্র লিখব জগন্নাথপুরে।"

নায়েব অবাক হলেন। "জগন্নাথপুর? কার কাছে হুজুর? কোনো তালুকদারের কাছে?"

"না। এক সাধকের কাছে। তার নাম রাধারমণ।"

নায়েব বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, একজন দেওয়ান চিঠি লিখবেন একজন বৈরাগীকে? তাও আবার কুশল জানতে?

হাছন রাজা বলতে শুরু করলেন। কিন্তু এ কোনো সাধারণ জমিদারি ফরমান নয়, এ কোনো আইনি নোটিশও নয়। এ হলো এক আধ্যাত্মিক চিঠি, যা লেখা হলো সুরের ভাষায়। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ গুনগুন করলেন। তারপর নায়েবকে বললেন, "লেখা শুরু করুন"।

নায়েব কাগজ-কলম নিয়ে তৈরি হলেন। হাছন রাজা বলে গেলেন এক অদ্ভুত পত্র-গীতি: “রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়।”

চিঠি লেখা শেষে হাছন রাজা তাঁর খাস পিয়নকে ডেকে বললেন, "এই চিঠি নিয়ে কেশবপুরে যাবে। সাধক রাধারমণের হাতে দেবে। আর তিনি যা বলবেন, তা মুখস্থ করে নিয়ে আসবে।"

সুনামগঞ্জ থেকে জগন্নাথপুর অনেক দূর। হাওর, নদী আর খাল পেরিয়ে যেতে হয়। হাছন রাজার পাঠানো নৌকা যখন কেশবপুরের ঘাটে ভিড়ল, তখন সন্ধ্যা।

কেশবপুর গ্রামটি বড়ই শান্ত। ঝোপঝাড় আর হিজল গাছের ছায়ায় ঘেরা। গ্রামের শেষ মাথায় রাধারমণ দত্তের আখড়া। মাটির ঘর, সামনে তুলসী মঞ্চ। সেখানে প্রদীপ জ্বলছে। খোল-করতাল বাজিয়ে কীর্তন হচ্ছে।

রাধারমণ দত্ত তখন ধ্যানে মগ্ন। তাঁর বয়স হয়েছে, চুল-দাড়ি পেকে সাদা। কিন্তু চামড়ায় ভাঁজ পড়লেও চোখের জ্যোতি কমেনি। তিনি সংসারের মায়া ত্যাগ করে এই কুঁড়েঘরেই কৃষ্ণনাম জপেন।

হাছন রাজার পিয়ন ভয়ে ভয়ে আখড়ায় ঢুকল। কীর্তন থামল। ভক্তরা তাকাল এই আগন্তুকের দিকে। পিয়ন বিনীতভাবে বলল, "আমি সুনামগঞ্জ থেকে এসেছি। দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী এই পত্র পাঠিয়েছেন বাবাজির কাছে।"

'হাছন রাজা' নামটা শুনে ভক্তদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। এই প্রতাপশালী জমিদারের লোক এখানে কেন?

রাধারমণ চোখ খুললেন। তাঁর ঠোঁটে এক টুকরো হাসি। তিনি হাত বাড়িয়ে পত্রটা নিলেন। নায়েবের হাতে লেখা সেই গানটি তিনি মনে মনে পড়লেন, তারপর হাসলেন। এক অট্টহাসি, যা শুধু সাধকরাই হাসতে পারেন।

"ওরে, তোদের রাজা যে ফকির হয়ে গেছে রে!" রাধারমণ ভক্তদের বললেন। "হাছন আর রাজা নেই, সে এখন কাঙাল। সে আমার খবর জানতে চায়? আমি তো ভালোই আছি, শুধু আমার কালাচাঁদ যে আমাকে দেখা দেয় না!"

তিনি পিয়নের দিকে তাকালেন। "বাবা, তোর মনিবকে বলিস, দেখা তো হবেই। তবে চামড়ার চোখে নয়, মনের চোখে। তিনি যখন প্রেমের হাটে দোকান খুলেছেন, তখন লাভ-লোকসান তো হবেই।"

তারপর রাধারমণ একতারাটা হাতে তুলে নিলেন। চোখ বুজে সঙ্গে সঙ্গে সুর বাঁধলেন। উত্তরের গান।

"কুশল তুমি আছো কেমন, জানতে চায় রাধারমণ।"

তিনি গানটি গাইলেন। পিয়ন সেই গান মুখস্থ করে নিল। কারণ সাধকরা কাগজে লেখেন না, তারা হৃদয়ে লেখেন।

হাছন রাজা অনেক রাত পর্যন্ত উত্তরের অপেক্ষা করছিলেন। পিয়ন ফিরে আসতেই তিনি বললেন, "তিনি কী উত্তর দিলেন?"

পিয়ন জোড়হাতে দাঁড়িয়ে রাধারমণের সেই গানটি গেয়ে শোনালেন। "কুশল তুমি আছো কেমন, জানতে চায় রাধারমণ।"

গানটি শুনতে শুনতে হাছন রাজার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল। দিলারাম অবাক হয়ে দেখল, তার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মনিব শিশুদের মতো কাঁদছেন।

এ কান্না দুঃখের নয়, এ কান্না প্রাপ্তির। হাছন রাজা বুঝলেন, তিনি একা নন। এই বিশাল পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ আছে, যে তাঁর হৃদয়ের ভাষা বোঝে। একজন হিন্দু বৈষ্ণব, একজন মুসলিম ফকিরকে বুকে টেনে নিলেন শুধু সুরের সুতোয়।

হাছন রাজা দোতরাটা তুলে নিলেন। তাঁর আঙুল কাঁপছে। সেদিন রাতে হাছন রাজা এক নতুন গানে সুর দিলেন। এই গানটিই পরে দুই বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।

"লোকে বলে বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার, কী ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার।"

এই গান যখন তিনি গাইলেন, তখন মনে হলো লক্ষণশ্রীর দালানকোঠা সব অদৃশ্য হয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু এক 'শূন্য'। আর সেই শূন্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন দুই সাধক; একজন কেশবপুরে, অন্যজন লক্ষণশ্রীতে। তাদের দেখা হয়নি কোনোদিন, কিন্তু তাদের আত্মা সেদিন এক হয়ে গিয়েছিল।

রাধারমণের সাথে এই আত্মিক যোগাযোগ হাছন রাজার জীবনের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিল। তিনি বুঝলেন, আল্লাহকে পেতে হলে মসজিদ বা মন্দিরে দৌড়ানোর দরকার নেই। নিজের মনের ভেতর যে 'মাটির পিঞ্জিরা' আছে, তার দরজাটা খুলে দিলেই হলো। পাখি তখন আপনিই ডানা মেলবে।

হাছন রাজা বারান্দায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। আজ আকাশভরা তারা। "বন্ধু রাধারমণ" তিনি বিড়বিড় করে বললেন। "তুমি তোমার কৃষ্ণকে খোঁজ, আমি আমার আল্লাহকে খুঁজি। পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমাদের চোখের জল তো একই সাগরে গিয়ে মেশে।”
[চলবে]

আপনার মন্তব্য