বৃহস্পতিবার, , ১৮ অক্টোবর ২০১৮ ইং

‘আমি কুল হারা কলঙ্কিনী’

 প্রকাশিত: ২০১৭-০৯-১২ ০১:২৫:৩২

 আপডেট: ২০১৭-০৯-১৫ ০২:৫৪:৪০

মারূফ অমিত:

হাওরের বুক চিঁরে চলছে এক নৌকা। সেই নৌকায় একজন গুরু তার শিষ্যদের নিয়ে গান করছেন, বলছেন গানের ইতিবৃত্ত। আমি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের কথা বলছি।

ভাটির পুরুষ প্রামাণ্য চিত্রে বাউল শাহ আব্দুল করিম বলেছিলেন এভাবেই- 'আমার কাছে কেউ আইয়ো না, আমার পরামর্শ কেউ লিও না, আমার নীতি বিধান তোমরা মানিও না, আমি আমার কলঙ্ক ডালা মাতাত লইলাইছি, তোমরা কলংকি অইয়ো না, এইটা কইছি আরকি। ঔত মানুষে ভালোবাসেনা, কয় গান গায় এবেটায় মরলে জানাজা মরতাম নায়, ইতা নায় হিতা নায় মুল্লা গুষ্টিয়ে কয় আরকি '।

শাহ আবদুল করিম তাঁর লিখা এবং সুর করা 'আমি কুল হারা কলঙ্কিনী' গানটির ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবেই। বাউল করিমের শিষ্য আব্দুল ওয়াহেদ থেকে জানা যায়, একবার ঈদ জামাত শেষ হবার পর শাহ আবদুল করিমকে গ্রামের মোল্লারা আক্রমণ করে বসলো। বলা হলো তাকে গান ছেড়ে দিতে হবে। গান বাজনা না ছাড়লে তাঁকে একঘরে করে দেওয়া হবে। পরবর্তীতে করিম গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অর্থাৎ কালনী নদীর তীরে চলে গিয়েছিলেন যেখানে করিমের বাড়ি এবং সমাধি অবস্থিত। ৭১ টিভিতে বাউল শাহ আবদুল করিমের ছেলে বাউল শাহ নূর জালাল এমনটাই জানিয়েছিলেন।

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী খুব পছন্দের এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য অত্যন্ত পছন্দের একটি গান। পুরো গানটি হল-

আমি কুল হারা কলঙ্কিনী
আমারে কেউ ছোইয়ো না গো সজনী,
প্রেম করলাম প্রাণ বন্ধুর সনে
যে দুঃখ পেয়েছি মনে
আমার কেঁদে যায় দিন রজনী
আমারে কেউ ছোইয়ো না গো সজনী
আমি কুল হারা কলঙ্কিনী
আমারে কেউ ছোইয়ো না গো সজনী,
প্রেম করা যে স্বর্গের খেলা
বিচ্ছেদ অনল রকম জ্বালা.
আমার মন জানে আমি জানি।।
আমারে কেউ ছোইয়ো না গো সজনী,
আমি কুল হারা কলঙ্কিনী
আমারে কেউ ছোইয়ো না গো সজনী,
সখি আমার উপায় বলো না,
এ জীবনে দূর হলো না..
বাউল করিমের পেরেশানি,
আমারে কেউ ছোইয়ো না গো সজনী
আমি কুল হারা কলঙ্কিনী
আমারে কেউ ছোইয়ো না গো সজনী।

সাধারণভাবে এটিকে আমরা প্রেম বিরহের গান হিসেবেই ধরে নিই। একজন প্রেম করেছেন সমাজ সংস্কারের কাছে বিবর্জিত হয়েছেন এমনটাই ভাবি কথাগুলো শুনে।

গানটি নিয়ে অনেক ভাবলাম। উপরে বাউল করিমের নিজ কথা হুবহু লিখেছি। সেই কথার প্রতিচ্ছবি তাঁর এই গান। এটা তাঁর নিজ মুখে স্পষ্টভাবেই বলা। গানটিতে প্রথমে করিম বলেছেন- 'প্রেম করলাম প্রাণ বন্ধুর সনে, যে দুঃখ পেয়েছি মনে-আমার কেঁদে যায় দিন রজনী'। আমি মনে করি এখানে নিজের ভেতরের বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর লিখা- সুরে। শেষ অংশে আবার নিজেই বলেছেন জ্বালা বা বেদনাকে দূর করার ইচ্ছার কথা। বলেছেন- "সখি আমার উপায় বলো না, এ জীবনে দূর হলো না, বাউল করিমের পেরেশানি"।

বোধ করি গানটিতে দুঃখ ভরা মনে নীল বেদনা ফুটে উঠেছে তেমনি দুঃখকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াসও রয়েছে। আমার নিজের জীবন নিয়ে যদি ভাবি তবে গানটিতে অনেক প্রতিফলন পাই। হতাশা দুঃখকে মনে মনে যেমন লালন করি তেমনি দুঃখ ভরা মন নিয়ে পুনরুত্থানের চেষ্টা করি। এটাই স্বাভাবিক, সবাই তা করি।

অভিমানে ভরা এই গানটির পিছনে প্রতিবাদও রয়েছে, যা নীরব প্রতিবাদ। গান গাওয়ার জন্য করিমে ছেড়েছেন নিজ গ্রাম, এলাকা থেকে হয়েছেন বিতাড়িত। কিন্তু গান লিখা, সুর করা, গাওয়া বন্ধ হয়নি তাঁর। এটাকে নীরব প্রতিবাদ বলে মনে হয়। একটা কিছুর জন্য কট্টর কিছু মানুষকে প্রটেস্ট করে নিজের কাজ নিজের মতই চালিয়ে যাওয়া একটা প্রতিবাদ।

অন্যদিকে এটা প্রতিবাদী হওয়া একজন গণসংগীত শিল্পীর উদাহরণ। নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলে যাওয়া এমনটাই হবে স্বাভাবিক। বাউল করিম একজন গণসংগীত শিল্পীও ছিলেন। শুধু তাই নয় একটু অন্যদিকে যদি ভাবি, এই গান ছিল মোল্লাতন্ত্র, ধর্মতন্ত্রের কালো ছায়া থেকে বের হয়ে যাবার উদাহরণ। ঈদের নামাজের পরে ধর্মতন্ত্রের আক্রমণ এবং সেটাকে উপেক্ষা না করে, বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করে গান চালিয়ে যাওয়া ধর্মীয় মৌলবাদীতার বিরুদ্ধে কথা বলার এক অনন্য মাত্রা।

শাহ আবদুল করিম, হাওরের শহর সুনামগঞ্জে কালনীর তীরে বেড়ে উঠা একজন সংগীত সাধক। দীর্ঘকায় সাদাসিধে একজন মানুষ। বাংলাদেশ, বাঙালি ও বাউল গান ঘিরেই তাঁর স্বপ্নগুলো। একতারা, দোতরা সারিন্দা নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছেন সুরে সুরে। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এই মহান সংগীত সাধক।

শাহ আবদুল করিমের গানের মূল উপকরণ হচ্ছে মানুষ। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর গান কথা বলে যাচ্ছে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি রচনা করেছেন গণসংগীত, বিচ্ছেদ, ধামাইল, জারি, সারি, ভক্তিগীতি, আল্লা স্মরণ, নবী স্মরণ, ওলি স্মরণ, পীর-মুর্শিদ স্মরণ, মনঃশিক্ষা, দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, আঞ্চলিক, কেচ্ছা, পালা ও দেশের গান। দুঃখ, অভাব অনটন ছিল তাঁর চির সাথী। হাজারো দুঃখে পোড় খাওয়া করিম এভাবেই বলেন- 'দুঃখ বলব কারে/মনের দুঃখ বলব কারে/বাঁচতে চাই বাঁচার উপায় নাই/দিনে দিনে দুঃখ বাড়ে', শুধু দুঃখবোধ নিয়ে বসে থাকেননি করিম। বরং দুঃখ-নিরোধের সম্ভাব্য উপায়গুলোও চিহ্নিত করেছেন। বাউল আব্দুল করিম তাঁর গানে নজর কাড়া শব্দঝঙ্কার ব্যবহার করেছেন। সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও অধিকার চেতনাই তাঁর গণসংগীত পর্যায়ভুক্ত গানের মূল বিষয়বস্তু ছিল।

শোষকের অবিচার-অত্যাচার-অন্যায় ঘিরে করিমের প্রতিবাদী কণ্ঠ তাই হতদরিদ্র সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। গান গাওয়ার সূত্র ধরেই পরিচিত হন মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। বিচ্ছেদ রচনাতেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। তিনি বলেছেন- 'আমার বুকে আগুন বন্ধু/তোমার বুকে পানি/দুই দেশে দুইজনার বাস/কে নিভায় আগুনি রে/আর আমার দরদি নাই রে। তাঁর এই কথা থেকে সহজেই বোধগম্য হয় বিরহকাতর ব্যক্তির যন্ত্রণার অভিব্যক্তি তিনি কতটুকুই না উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

তাঁকে নিয়ে ড. মৃদুলকান্তি বলেছিলেন; "সীমার মাঝে থেকে অসীমের সন্ধান, দেহ থেকে দেহাতীতে, রূপ থেকে অরূপে যাওয়ার সাধনায় নিমগ্ন বাউল কবি। সেখানে প্রেম তাঁর নিত্যসঙ্গী। প্রেমে মিলনের চেয়ে বিরহ-বেদনগাথা প্রেমকে মহিমান্বিত করে।' সাধক প্রেম সন্ধানীও ছিলেন বটে। তিনি বলেছেন; "বাঁকা তোমার মুখের হাসিদেখে মন হইল উদাসী রে। ভ্রমরের বর্ণ জিনি কালো মাথার কেশশ্যামল বরণ রূপে পাগল করলা দেশ। আমি কালো তুমি ভালোভালো তোমার রূপের আলো"। এ রকম অজস্র গানে তিনি তাঁর প্রেয়সীর প্রেমের আরাধনা করেছেন। তাঁর সাধন-ভজন পথের বিপুল বিস্তার ছিল দেহকেন্দ্রিক। তিনি লিখেছেন-'কোথা হতে আসে নৌকা কোথায় চলে যায়'।

একটা জিনিস আমরা সবাই লক্ষ্য করি, জানি- বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের গান আজ অনেকেই করছেন। কিন্তু অনেকে তা করছেন বিকৃত সুরে। কম্পোজ, রিমেক করে বিশালভাবে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার জন্য বা নিজে হওয়ার জন্য করিমের গান হচ্ছে যা হিপহপ। কোনভাবেই তা কাম্য নয়। করিমের গান করা হবে, লালন, হাছন, রাধারমণের গান করা হবে, অন্য বাউলদের গান করা হবে তাতে অবশ্যই সাধুবাদ। অবশ্যই লোক শিল্পকে আমাদেরই বাঁচিয়ে রাখতে হবে, কিন্তু তা বিকৃতভাবে নয়। যেমন বেশ আগে এক শিল্পীর গান শুনেছিলাম। করিমের জনপ্রিয় একটি গান 'কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি"। সেই শিল্পী গানটা এভাবে করে যাচ্ছিলেন- কেন পিড়িতি বারাইলে বন্ধু ছেড়ে যাবে যদি"। এখানে করিমের গাওয়া পিরিতি মানে প্রেম আর ঐ শিল্পীর করা গানে পিড়িতি হচ্ছে পিড়ি (বসার জন্য বস্তু বিশেষ)। আবার বাড়াইলা হচ্ছে বৃদ্ধি পাওয়া কিন্তু ঐ শিল্পীর গাওয়া বারাইলা হচ্ছে বের হয়ে যাওয়া বা এগিয়ে যাওয়া (এক এক অঞ্চলে এক এক অর্থ)। তাহলে এই ভুল উচ্চারণের জন্য কোথাকার ভাব কী হয়ে গেল, কিসের অর্থ কী হয়ে গেল ভেবেই নেয়া যায় না। আবার ভাববাচ্য যদি আসা যায় তবে সেটা হয়ে যাওয়া, 'পিড়ি বের হয়ে গেল'। মানে একটি সাধারণ বাক্যও হয়নি, ব্যাকরণ মতে। পিড়ি ত আর জীব নয় যে হাঁটবে বা বেরুবে নিজে নিজে। এই ব্যাপারটা অনুচিত, যা মেনে নেওয়া যায়না।

শাহ আবদুল করিমের সরাসরি শিষ্য বাউল আবদুর রহমান ভাইয়ের সাথে প্রায়ই দেখা হয়। তিনি সবসময়ই বলেন, "বাজনা বড় কথা না, উনার (শাহ আবদুল করিম) গানের কথাগুলো শুদ্ধ বলা হয়"। আমি আশা করছি বাউল শাহ আবদুল করিমের গান সঠিক সুরে, সঠিক উচ্চারণে গাওয়া হবে।

শাহ আবদুল করিম। একজন মানবপন্থি সংস্কৃতিসাধক। অসাম্প্রদায়িক এই সংগীত সাধক হিন্দু -মুসলমান, জাত-কুল ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে মানুষ হিসেবেই উপলব্ধি করার এক প্রভাবশালী দর্শন জন্ম দিয়ে গেছেন তাঁর রচনা ও সুরের মাধ্যমে। শাহ আবদুল করিমের অফুরান সুরভাণ্ডার থেকে আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম উজ্জীবিত হবে। তাঁর গানের অনুরণনে ভাসবে বাংলাদেশ তথা বাংলা ভাষাভাষীর সুরপিপাসু সহস্র কোটি মানুষ।

আফতাব সঙ্গীত (১৯৪৮), গণসংগীত (১৯৫৭), কালনীর ঢেউ (১৯৮১), ধলমেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি (১৯৯৮), কালনীর কূলে (২০০১) ও শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র (২০০৯) এই বইগুলো তার যথার্থ প্রমাণ।

অনেক কিছুই, অনেক বিষয় নিয়ে, বিভিন্নভাবে করিমের লিখা, সুর, জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা করা যায়।

১২ সেপ্টেম্বর, ৮ম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা রইল মানবতাবাদী, অভিমানী, প্রতিবাদী, ভাটির পুরুষ, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রতি।

আপনার মন্তব্য