বৃহস্পতিবার, , ১৮ অক্টোবর ২০১৮ ইং

কবি বেলাল চৌধুরীর শোকদর্শন

 প্রকাশিত: ২০১৮-০৫-১৯ ১২:৪০:১২

জহিরুল হক মজুমদার:

কবি বেলাল চৌধুরী আজ আমাদের শোকের অংশ। কবিকে নিয়ে অনেকেই লিখবেন। তাঁর কাব্যের উপর লিখবেন কাব্য সমালোচকরা আর জীবনের উপর লিখবেন সতীর্থ কবিরা। এই লেখা এক অভাজন নাগরিকের লেখা, যার সুযোগ হয়েছিল বেলাল চৌধুরীকে শোকগ্রস্ত দেখার।

ঢাকায় খবর এলো কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় মারা গেছেন। চারুকলার বকুলতলায় হবে তাৎক্ষণিক স্মরণসভা। সুদূর কলকাতায় তখনো প্রয়াত কবির শেষকৃত্যের আয়োজন শেষ হয়েছে কি হয়নি। কিন্তু চারুকলার বকুলতলা লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঢাকায় কেমন জনপ্রিয় ছিলেন তা ওই জনসমাগমে প্রতিফলিত হয়েছিল। কিংবা অনেক দিন পর এখন ভাবলে মনে হয়, ঢাকা কত সংবেদনশীল একটি শহর ছিল। বাংলাভাষার একজন কবির মৃত্যুতে যেন গোটা শহরটাই ভেঙে পড়েছিল চারুকলার বকুলতলায়।

এরপর কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চলে গেলেন। চলে গেলেন চলচ্চিত্রকার ঋতুপর্ণ ঘোষ। তারও পর চলে গেলেন কোলকাতা প্রবাসী ঢাকার নারায়ণগঞ্জের ছেলে অভিনেতা পীযূষ গাঙ্গুলি। কিন্তু ঢাকা আর তেমন করে শোকে জেগে উঠেনি।

ঢাকা কি শোক করতে ভুলে গেছে? ঢাকা কি জীবন যাপনের চাপে এক দীর্ঘ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়েছে যে এখানে শোকের আলোড়ন এক গভীর বিষণ্ণতার ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে গেছে? না কি আমরা ক্রমাগত রাজনৈতিক সহিংসতার চাপে মৃত্যু নিয়ে এক ধরণের নির্বিকারত্বে আক্রান্ত হয়েছি? অথবা গভীর ভোগ, যা শোকের বিষণ্ণতা গ্রাস করুক তা আমরা চাইনা বলে, একধরণের স্বার্থপরতার অন্ধকারে আমরা ডুবে গেছি।

মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন কবি রফিক আজাদ, কবি মহাদেব সাহা এবং কবি বেলাল চৌধুরী। শুরুটা হয়েছিল বেলাল চৌধুরীর স্মৃতিচারণ দিয়ে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনেক কাছের অনুজপ্রতিম বন্ধু। বেলাল চৌধুরী কাঁদছিলেন। আবার মাঝে মাঝে শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে আবেগ সংবরণ করছিলেন, যেটা তাঁর জন্য কঠিন হচ্ছিল। কোলকাতা পৌঁছামাত্র শক্তি আর বেলালের উচ্ছ্বাসমাখা সময় যাপন, কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় হাঁটা এইসব উঠে আসছিল তাঁর স্মৃতিচারণে।
আমি এই প্রথম বেলাল চৌধুরীকে দেখি। তার আগে তার নাম ছাপা দেখতাম “ভারত বিচিত্রা”র সম্পাদক হিশেবে। ভারত বিচিত্রা ঢাকার সংস্কৃতজনরা পেতেন আর পেতেন প্রতিষ্ঠানগুলো। আমাদের মত অভাজনরা ফুটপাত থেকে কিনে পড়ার স্বাদ মিটিয়েছি। জানার ছিল অনেক কিছু। ছিল সংগ্রহে রাখার মত।

কবি মহাদেব সাহা স্মৃতিচারণ করতে উঠে বলে উঠলেন “শক্তি চৌধুরী”। শোকের আবহের মধ্যেও উপস্থিত নাগরিকরা একটু হেসে উঠলেন। কবি মুহূর্তে সামলে নিয়ে বললেন, দেখুন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাথে বেলাল চৌধুরীর বন্ধুত্বটা এমনই যে নাম পরিবর্তন করে “শক্তি চৌধুরী” কিংবা “বেলাল চট্টোপাধ্যায়” বললে খুব একটা ভুল বলা হয়না। মহাদেব সাহার গাম্ভীর্যপূর্ণ অবস্থান আমাদের কৌতুকের মৃদুহাস্য থেকে আবারও সত্যিকারের শোকের স্রোতের দিকে নিয়ে যায়।

কবি রফিক আজাদ বলছিলেন, জীবনের মোমবাতি দু’দিক থেকে জ্বালিয়েছিলেন বলেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় অকালে ঝরে গেলেন। আমরা ওইখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করতে পারি সেই মোমবাতির একটি শিখা ছিলেন বেলাল চৌধুরী। আজ অনেকদিন পর মনে হল পশ্চিমের শিখাটি নিভে যাওয়ার অনেক বছর পর এবার পূবের শিখাটিও নিভে গেল।

এক কাপড়ে কোলকাতা চলে গিয়ে অনেক বছর থেকে গিয়েছিলেন বলে বেলাল চৌধুরী সম্পর্কে শুনেছিলাম। সেই এককাপড় কতটা রৌদ্র-জল পোহানোর পর পরিত্যক্ত হয়েছিল, কোলকাতা শহর তার সাক্ষী। কিন্তু বেলাল চৌধুরী যে এই সীমানা ভাঙা অভিযাত্রায় অসম্পর্কের আর বিভেদের সীমানা দেয়াল ভেঙে তাঁর ভাষার সীমানার অধিকার ঘোষণা করেছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। যেমনটা কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা বলে থাকেন, যতদূর বাংলা ভাষা, ততদূরই বাংলাদেশ।

একজন কবির মৃত্যু হল এই কালবৈশাখীর কালে। শহর জুড়ে শেষ বিকেল থাকে ঘরে ফেরার তাড়া মাখা। শহীদ কাদরী’র বৃষ্টির সন্ত্রাসে দোকানের চাতালে আশ্রয় নেই এই আমরা। আবুল হাসানের ডাউন ট্রেনের মত বৃষ্টি নামা এক শহরে পাড়ার দোকানে চায়ের মধ্যে একটুখানি চিনি বাড়িয়ে দেবার আকুতি মাখা স্বর সফলতা পায় দোকানীর মৃদু হাস্যে। আর চায়ের কাপে আকাশের ছায়ার গভীরতার ভেতরে তাকালে কারো না কারো মনে পড়বে কবি বেলাল চৌধুরীর কথা।

কানে কানে তিনি বলবেন, আমি আছি ওদের মাঝে আবুল হাসান, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আর তোমাদের মাঝেও।

আপনার মন্তব্য