রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং

অভিজিৎ রায় ও তাঁর লেখালেখি

 প্রকাশিত: ২০১৯-০৯-১২ ২০:২৯:৪৮

 আপডেট: ২০১৯-০৯-১২ ২০:৩২:১৮

রতন কুমার সমাদ্দার:

অনলাইনে অভিজিৎ রায়ের সর্বশেষ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিলো ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, যেদিন তাকে হত্যা করা হয়েছিলো সেদিন। বিডিনিউজে প্রকাশিত লেখাটির শিরোনাম ‘কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে? (Why there is something rather than nothing?)’। অতীতে বিজ্ঞানের কাছে এই প্রশ্নটির কোন উত্তর ছিলো না; এটি ছিলো ধর্ম ও দর্শনের এখতিয়ারে। ধর্মবেত্তারা এই সুযোগে তাদের নিজ নিজ ধর্মের উদ্ভট ব্যাখ্যাকেই কেবল মানুষের কাছে অখণ্ডনীয় (irrefutable) সত্যরূপে প্রচার করে ক্ষান্ত হননি, তারা এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে বিজ্ঞানকে খাটো করতে চেয়েছেন।

অভিজিৎ রায় তাঁর সর্বশেষ নিবন্ধটিতে তুলে ধরেছেন কিভাবে আধুনিক বিজ্ঞান নিত্য নতুন গবেষণার মাধ্যমে এই প্রশ্নটিকেও আজ নিজের করে নিয়েছে এবং ধর্মবেত্তাদের মুখ থামিয়ে দিয়েছে। প্রবন্ধটি অভিজিৎ রায়ের সর্বশেষ বই ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইয়ের নির্যাস হলেও আমার কাছে মনে হয়েছে, এই শিরোনামটি যেন তিনি আমাদের উদ্দেশ্যেই রেখে গিয়েছেন, যেন তিনি আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন, ‘দেখো, কেন আজকের প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চা একেবারেই না-থাকার বদলে কিছু হলেও আছে’।

হ্যাঁ, অভিজিৎ রায়ই সেই ব্যক্তি যিনি বাংলাদেশী তরুণদের নিকট বিজ্ঞান সাহিত্যকে জনপ্রিয় করেছেন, তাদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতাকে জাগিয়ে তুলেছেন। বিজ্ঞানের নিত্য নতুন তথ্য ও তত্ত্বকে বাংলা ভাষায় সহজ ও সাবলীল রূপে তুলে ধরে তাকে জনপ্রিয় করার দাবীদার একমাত্র তিনিই। তিনিই প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি যিনি সমকামিতার বৈজ্ঞানিক দিকগুলো তুলে ধরে বাংলা ভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছেন যা হাজারো বাঙালির সমকাম বিষয়ে পূর্বেকার ধারণা আমূল পাল্টে দিয়েছে। তাঁর ‘ভালবাসা কারে কয়’ সম্ভবত বাংলা ভাষায় একমাত্র বই যেটি প্রেম ও যৌনতার বিবর্তনীয় মনোবৈজ্ঞানিক দিকটিকে অনেকটা গল্পের আলোকে তুলে ধরেছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তাঁর আরেকটি বই ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো– এক রবি বিদেশিনীর খোঁজে’ বইটিতে তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবনে বিভিন্ন সময়ে আসা নারীদের বিষয়টি যেভাবে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন, তা একেবারেই অভিনব।

অভিজিৎ রায় ছিলেন একজন আপাদমস্তক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের কাছে অভিজিৎ রায়ের বড় পরিচয় নাস্তিক হলেও তাঁর নাস্তিকতা ছিলো আসলে বিজ্ঞানমনস্কতার ফল। হ্যাঁ, নাস্তিকতা নিয়ে তিনি প্রচুর লিখেছেন। ব্লগে লেখা তার বহু প্রবন্ধ ছাড়াও তাঁর দুটি বই– রায়হান আবিরের সাথে যৌথভাবে লেখা ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ এবং তাঁর একার লেখা ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’– প্রায় পুরোটাই নাস্তিকতার ওপরে লেখা হলেও প্রতিটা প্রবন্ধের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে বিজ্ঞান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি বিজ্ঞান দিয়েই ধর্মকে খণ্ডন (refute) করেছেন। আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে যে, অভিজিৎ রায় প্রচলিত ধর্মগুলোর বিরুদ্ধে যে লিখতেন তা নাস্তিকতা প্রচারের জন্য নয়, বরং ধর্মগুলো যে বিজ্ঞান চর্চার পথে অন্তরায় এবং বিশ্বাস ও কুসংস্কারের মাধ্যমে মানুষকে হত্যা ও শোষণ করে তার জন্যে। অভিজিৎ রায় মনে করতেন বাঙালি সমাজের অশিক্ষা-কুশিক্ষার পিছনে দায়ী প্রধানত ধর্ম। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি যুক্তি-নির্ভর মুক্ত সমাজ, যা সত্যিকারার্থেই ধর্মকে এড়িয়ে গিয়ে গড়া সম্ভব নয়। আর তাই বিজ্ঞানের পাশাপাশি তাঁর লেখার অন্যতম বিষয় ছিলো ধর্ম ও ধর্মীয় সমাজের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা।

এই আলোচনায় অভিজিৎ রায়ের পরিচয় তুলে ধরার তেমন কোন আবশ্যকতা রয়েছে বলে মনে করি না, বরং তার সৃষ্টি ও দর্শন বিষয়ে আলোকপাত করাই যথার্থ হবে বলে মনে করি। চিন্তায় তিনি ছিলেন যুগের চেয়ে অগ্রগামী। সেই ২০০১ সালে তিনি যখন বাংলাভাষীদের জন্য মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করার লক্ষ্যে ইয়াহু গ্রুপে মুক্তমনার যাত্রা শুরু করেন, বেশিরভাগ মানুষই তখন ইয়াহুতে যেতো মূলত বিনোদনমূলক চ্যাট করতে। ওয়েবসাইট হিসেবে মুক্তমনা যাত্রা শুরু করেছিলো ২০০২ সালে। মুক্তমনার এই দীর্ঘ পরিক্রমায় ওয়েবসাইটটি তথা ব্লগটি যে হাজারো বাঙালির চিন্তা-চেতনার জগতকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাঙালি তরুণদের ওপর মুক্তমনার প্রভাব সম্ভবত অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি।

অভিজিৎ রায় কেবল লেখকই ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রেরণাদায়ী মানুষও। অন্য অনেককেই তিনি লেখক বানিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন লিখতে। তিনি জানতেন ও মানতেন যে, শিক্ষা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তা সমাজের তেমন কোন উপকারে আসে না, জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমেই কেবল মানুষের চিন্তা-চেতনাকে পরিবর্তন সম্ভব। মুক্তমনাতে আইডি নেই কিন্তু যৌক্তিক মন্তব্য করছেন, এমন কাউকে পেলেই তিনি তার নামে আইডি খুলে ইমেইল করতেন। কেবল মুক্তমনাতেই নয়, ফেসবুকের লেখা পড়েও তিনি অনেককে মুক্তমনায় লেখায় উৎসাহিত করতেন। এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, লেখক খোঁজায় তাঁর উদ্দেশ্য কেবল মুক্তমনাতে লেখানোতেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। তিনি জানতেন যে, কেউ মুক্তমনায় লিখতে চাইলে তাকে পড়তে হবে, জানতে হবে, লেখক হবার সাথে সাথে তাকে হতে হবে পাঠকও। লেখক ও পাঠক দুটো তৈরিতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

অভিজিৎ রায়ের মতো বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী লোক বাংলা ব্লগে খুব কমই ছিলেন বা আছেন। বিরুদ্ধমতের প্রতি তিনি ছিলেন অসম্ভব রকমের উদার। আমরা দেখতে পাই, ব্লগারদের অনেকেই সমালোচনা সইতে পারেন না, বিরুদ্ধমতে রেগে যান। কিন্তু অভিজিৎ রায় এদিক দিয়ে ছিলেন খুব বেশিরকম সহনশীল। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুক্তিসহকারে তর্ক করতেন; ব্লগের কোন পোস্টে তাকে রেগে যেতে দেখেছি, এমনটা মনে পড়ে না। আমি অবাক হতাম তিনি তাঁর দৈনন্দিন রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে এতোটা সময় কী করে বের করতেন। বাংলা ব্লগে তাঁর চেয়ে বেশি রেফারেন্সসহ লেখা কারো আছে বলে মনে হয় না; তাঁর মতো এতো বিচিত্র বিষয় নিয়েও কেউ সম্ভবত লেখেননি। তার মানে তাঁকে প্রচুর পড়তে হতো। আবার মুক্তমনাতে প্রকাশিত যে কোন গুরুত্বপূর্ণ পোস্টও তিনি পড়তেন এবং মন্তব্য করতেন। সবার ওপর নিজের পোস্ট ও বই লেখা তো ছিলোই; লিখতেন পত্রিকাতেও। যোগাযোগ রাখতেন দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাথে। একজন মানুষ সংসারে বাস করে কিভাবে এতোটা সময় বের করতেন ভাবতে আশ্চর্যই হতে হয়। আমার তো মনে হয়, বন্যা আহমেদের মতো একজন স্ত্রী পেয়েছিলেন বলেই তিনি আজকের অভিজিৎ রায় হয়ে উঠেছিলেন, নইলে সংসারের যাঁতাকলে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো।

অভিজিৎ রায় ছিলেন বাংলাদেশের ব্লগারদের দুর্দিনের কাণ্ডারি। ২০১৩ সালে যখন চারজন ব্লগারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হলো, অভিজিৎ রায় বুঝতে পারলেন যে কেবল আভ্যন্তরীণ লবিংয়ের মাধ্যমে তাদেরকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে বাংলাদেশের ওপর। তিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে লিখতে শুরু করলেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়েছিলো। সব ব্লগাররাই মুক্ত হয়েছিলেন এবং আজ মুক্তভাবে জীবনযাপন করছেন। ২০১৫ তথা পরবর্তীতে বাংলাদেশী নাস্তিক ব্লগাররা এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অভিজিৎ রায় বেঁচে থাকলে তিনি যে ব্লগারদের এমন দুর্দিনে কাণ্ডারি হিসেবে অবতীর্ণ হতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অভিজিৎ রায়ের লেখায় আরেকটি বিষয় যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো তা হলো তাঁর কাব্যিক রসবোধ। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি অনেকসময়ই কবিতাকে টেনে আনতেন। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, ওমর খৈয়াম থেকে শুরু করে বহু বিদেশী কবির উদ্ধৃতি পাওয়া যায় তার বিজ্ঞান প্রবন্ধগুলোতে। ফেসবুকে অভিজিৎ রায় আমার কোন পোস্টে প্রথম মন্তব্যও করেছিলেন সম্ভবত একরকম একটি লেখার সূত্র ধরে। আমি বিজ্ঞান বক্তা আসিফের লেখা বই ‘কার্ল সাগান– এক মহাজাগতিক পথিক’ নিয়ে লিখতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ বা রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম। অভিজিৎ রায় সেখানে লিখেছিলেন যে, তিনিও আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী বইয়ে ঐ বিষয়ে একই তুলনা দিয়েছেন। তাঁর দুটি বই– আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী ও ভালবাসা কারে কয়– রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতা থেকে নেয়া। নিরস বিজ্ঞানকে যিনি এমন কাব্যরসময়তায় টেনে আনতে পারেন, তিনি তো মানুষের কাছে জনপ্রিয় হবেনই।

অভিজিৎ রায়ের কাব্য রসবোধ নিয়ে বলতে গিয়ে তাঁর লেখা ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো– একজন রবি-বিদেশিনীর খোঁজে’ বইটির কথা বলতে হয়। রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের একজন প্রেমিকা কেন একজন বিজ্ঞান লেখককে টানবে? কেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে তিনি পুরো একটা বই লিখতে গেলেন? আর্জেন্টিনা ভ্রমণে গিয়ে অভিজিৎ রায় দেখলেন যে, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে আমরা যেভাবে চিনি, সেটা আসলে ওকাম্পোর খুবই খণ্ডিত একটি রূপ। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আর্জেন্টিনা তথা ল্যাটিন আমেরিকার একজন প্রভাবশালী নারীবাদী লেখক যার সাথে ঐ সময়কার ইউরোপ-আমেরিকার প্রায় সমস্ত বিখ্যাত লেখকদের সাথেই ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিলো। এটাও তাঁকে নিয়ে বই লেখার কোন যৌক্তিক কারণ ছিলো না। আরও খুঁজতে গিয়ে অভিজিৎ রায় পেলেন যে, ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথের জীবনে কেবল একজন নারীই ছিলেন না, তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে ও জীবনে বেশ কিছু নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে পরিচয়ের পূর্বে নারী বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো সেকেলে। ঠাকুর পরিবারে কন্যাদের শিশুবিবাহ প্রচলিত ছিলো এবং রবীন্দ্রনাথ এতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি তাঁর তিন কন্যাকেই অল্প বয়সে পাত্রস্থ করেছিলেন। এছাড়া নারীবাদকে তিনি বহুবার আক্রমণ করেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে ও গল্পে (প্রগতিসংহার)। এমনকি নারীবাদ বিষয়ক সাহিত্যকেও আক্রমণ করেছেন- এক্ষেত্রে নরওয়েজিয়ান লেখক হেনরিক ইবসেনের লেখা নাটক ‘একটি পুতুলের ঘর’-এর সমালোচনা উল্লেখ্য। কিন্তু ওকাম্পোর সাথে পরিচয়ের পরে রবীন্দ্রনাথের সেই সেকেলে ধারণা অনেকটাই পাল্টে যায়।

নারী বিষয়ক চিন্তার পরিবর্তন ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের জীবনে আরও অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। তাঁর গৃহে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথের কবিতার খাতার আঁকাআঁকি দেখে ওকাম্পোই প্রথম রবীন্দ্রনাথকে বুঝান যে, তাঁর মধ্যে এক চিত্রশিল্পী সত্তা আছে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকা শুরু করেন এবং পরবর্তী কয়েক বছরে কয়েক হাজার ছবি আঁকেন। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও করে দেন ওকাম্পো, যা বিশ্ববাসীর কাছে রবীন্দ্রনাথের এক নতুন পরিচয় তুলে ধরে। এরপর একে একে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয় লন্ডনসহ ইউরোপের বহু শহরে।

ওকাম্পোর সাথে রোমান্টিক সম্পর্কটি রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নিয়ে আসে এক নতুন রোমান্টিকতা যা সংকলিত হয় পূরবী কাব্যগ্রন্থে। পূরবী কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন বিজয়াকে। এই বিজয়া আর কেউ না, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোই। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিজয়া নামেই ডাকতেন।

রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাসে লাবণ্য চরিত্রের দৃঢ়তা আসলে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর চারিত্রিক দৃঢ়তাই। উপন্যাসটির শেষের দিকে যে কবিতাটি রয়েছে, তার দুটি লাইন ‘তোমায় যা দিয়েছিনু তা তোমারই দান— গ্রহণ করেছো যতো ঋণী তত করেছো আমায়।’ আসলে রবীন্দ্রনাথকে লেখা ওকাম্পোর চিঠির লাইনের প্রায় হুবহু অনুবাদ। অভিজিৎ রায় এই বইটিতে এসব তুলে ধরেছেন প্রমাণসহ। আর রবীন্দ্রনাথের জীবনে নারী নিয়ে তিনি যে বিবর্তনীয় মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সে বিষয়ে প্রথমেই বলেছি।

এবারে অভিজিৎ রায়ের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলছি। তাঁর সাথে আমার একবারই দেখা হয়েছিলো। ২০১২ সালের বইমেলায়। ঐ সময় পর্যন্ত তিনি যেহেতু ফেসবুক বা ব্লগে কোন ছবি দেননি, তিনি দেখতে কেমন হবেন সেটা ছিলো একেবারেই অনুমাননির্ভর। প্রথম দেখায় একটু অবাকই হয়েছিলাম, কারণ সে অনুমানের সাথে কিছুই মেলেনি। দেখলাম আমার মতো তাঁরও বেশ খানিকটা বাঙালি-ভুড়ি আছে। আমি মুক্তমনার ব্লগার ছিলাম না; তবুও তিনি আমাকে দেখেই কাছে টেনে নিলেন। চটপটি খেতে খেতে নিজের ভুরি নিয়ে রসিকতাও করলেন। বিশ্বাস ও বিজ্ঞান বইটিতে অটোগ্রাফ দিলেন এবং প্রথম দেখার নিদর্শন হিসেবে আমাকে ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ বইটি উপহার দিলেন।

অভিজিৎ রায়ের হত্যা বাঙালিদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা যতোই বলি যে, একজন অভিজিতের মৃত্যুতে হাজারো অভিজিতের সৃষ্টি হবে, এটা কেবলই কথার কথা; পরবর্তী একশ বছরেও অভিজিৎ রায়ের মতো কেউ আসবেন, এমনটা আমি মনে করি না। হয়তো কেউ অভিজিৎ রায়ের লেখার চেয়ে উন্নত মান নিয়ে আসতে পারেন, কিংবা আরও বেশি কর্মঠ কেউ আসতে পারেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাকে কেউ ছুঁতে পারবেন এমনটা ভাবা আমার পক্ষে কঠিন। ২০১৫ সালের এই দিনটির কথা মনে পড়ে। সেদিন তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে শুভ্র আর আমি ফোনে খুব কাঁদছিলাম। শুভ্র কী জন্য কেঁদেছিলো জানি না, তবে আমার সেই কান্না কোন ব্যক্তি অভিজিৎ রায়ের জন্য ছিলো না, আমার কান্না ছিলো অভিজিৎ রায়ের অনুপস্থিতিতে আমরা কতো বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হলাম, বা অভিজিৎ রায় যদি আরও ২০টি বছরও বাঁচতেন তাহলে আমাদেরকে তথা পৃথিবীর মানুষকে আরও কত কী দেয়ার ছিলো, তা ভেবে। হয়তো ভাবছেন, আমার কান্নাতে স্বার্থপরতা ছিলো। জানি না, হয় তো তাই-ই হবে।

আপনার মন্তব্য