প্রকাশিত: ২০১৬-০১-০১ ২১:০৩:৫২
বশির আহমদ জুয়েল:
গণমানুষের কবি দিলওয়ার। ছড়ার রাজা দিলওয়ার। কারো প্রিয় দিলু ভাই। কারো দিলু চাচা। অনেক গুনের মানুষ তিনি। হাজার ছিলো স্বপ্ন। এ বিশ্বটা একটি গ্রাম ছিলো তাঁর ভাবনায়। তাঁর লেখালেখিতে স্পষ্ট হয়ে উঠতো গণমানুষের কথা। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই।
২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান না ফেরার দেশে। আজ ১ জানুয়ারি ২০১৬, তাঁর ৮০তম জন্মদিন। দিলওয়ার, ছড়ার রাজা দিলওয়ার বা গণমানুষের কবি দিলওয়ার। এ রকম অনেক বিশেষণেই রয়েছে তাঁর। স্বনামধন্য একজন গীতিকবি হিসেবেও তাঁর নাম থেকে যাবে অনন্তকাল। কালের ধারাবাহিকতায় জীবিতকালে আমরা যাঁদের চিনতে পারি না, তাঁদের চেনার চেষ্টা করি মরার পরে।
ছড়াসাহিত্যের অগ্নিপুরুষ দিলওয়ার ছড়া লিখে দেশে-বিদেশে কাঁপিয়েছেন। এপার বাংলা ওপার বাংলায় সমানতালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অসংখ্য ছড়া। এ জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছেন অনেক। ছড়ার রাজা হিসেবে দিলওয়ারের নাম-ডাক রয়েছে দেশে-বিদেশে। ১৯৬৪-৬৫ সালে সত্যজিত রায় সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকায় তাঁর ছড়া ছাপা হতো নিয়মিত। সাথে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ছোটদের পত্রিকা ‘শুকতারা’য়ও লিখেছেন নিয়মিত। যা তখন বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা পাঠ করতো।
সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম সাক্ষী লর্ডক্বীন কর্তৃক নির্মিত ক্বীনব্রীজকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতা ‘ক্বীনব্রীজের সূর্যোদয়’ এবং তাঁরই লেখা ‘তুমি রহমতের নদীয়া’ গানটি সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সুরমা নদীর দক্ষিণ পারে ভার্থখলায় রক্ষণশীল পরিবারে ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি দিলওয়ার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলবী মোহাম্মদ হাসান খান ও মাতার নাম রহিমুন্নেসা। দিলওয়ার ছিলেন চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে সপ্তম। ঝালপাড়া পাঠশালায় শুরু হয় তাঁর শিক্ষা জীবন। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে রাজা জি.সি হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৫৪ সালে এম. সি কলেজ থেকে পাশ করেন ইন্টারমিডিয়েট। বাল্যকাল থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক ‘যুগভেরী’-তে ‘সাইফুল্লাহ্ হে নজরুল’ শীর্ষক কবিতাটি ছিলো তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা। তাঁর কর্ম জীবনর সুচনা ঘটে শিক্ষকতা পেশার মাধ্যমে। দক্ষিণ সুরমা হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি। কিছুদিন পরেই তিনি যুক্ত হোন সাংবাদিকতা পেশায়। ১৯৬৭ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে দু’বছর কাজ করার পর ফিরে আসেন সিলেটে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি চলে যান ঢাকায়। ১৯৭৩-৭৪ সালে দৈনিক গণকন্ঠের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকাস্থ রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত মাসিক উদয়ন পত্রিকার সিনিয়র অনুবাদক হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেন।
কবি দিলওয়ার-এর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে- জিজ্ঞাসা (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৫৩), ঐকতান (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৬৪), পুবাল হাওয়া (গানের বই- ১৯৬৫), উদ্ভিন্ন উল্লাস (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৬৯), বাংলা তোমার আমার (গানের বই- ১৯৭২), ফেসিং দি মিউজিক (ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ- ১৯৭৫) স্বনিষ্ঠ সনেট (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৭৭), রক্তে আমর অনাদি অস্থি (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৮১), বাংলাদেশ জন্ম না নিলে (প্রবন্ধগ্রন্থ- ১৯৮৫), নির্বাচিত কবিতা (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৮৭), দিলওয়ারের শত ছড়া (ছড়ার বই- ১৯৮৯), দিলওয়ারের একুশের কবিতা (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৯৩), দিলওয়ারের স্বাধীনতার কবিতা (কাব্যগ্রন্থ- ১৯৯৩), ও ছড়ায় অ আ ক খ (ছড়ার বই- ১৯৯৪) অন্যতম। এ ছাড়াও দিলওযার রচনা সমগ্র ২য় খন্ড পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছে। ২০০৮ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর প্রত্যাশা ছিলো তাঁর লেখা কবিতা বা ছড়া পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাবে। কিন্তু তা আর হয় নি। বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন ‘গণমানুষের কবি’ হিসেবে। অনেক কবিই হয়তো জানতেন না বা জানেন না যে, কবি দিলওয়ার-ই ছড়ার রাজা। বিশেষ করে বাংলাদেশের সকল ছড়াসাহিত্যিকই তাঁর জন্য গর্ববোধ করেন। ছড়াসাহিত্যের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে আমার গর্ব করাটা অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। কারণ আমার ছড়াসাহিত্যে হাতেখড়ি ছড়ার রাজধানী সিলেটে। ব্যতিক্রম ধারার ছড়াসাহিত্য সংগঠন ছড়া নিকেতন সিলেট এর প্রকাশনা ছড়াসাহিত্যের ছোটকাগজ ‘ছন্দালাপ’ সম্পাদনা করছি বেশ ক’বছর ধরে। সে সুবাধে দেশের সকল ছড়াসাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি নিয়মিত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে কিছু করার জন্য উদ্যোগী হই। সাথে সাথে পরামর্শ করি ছাড়াসাহিত্যের বরপুত্র লুৎফর রহমান রিটন ও ছড়া নিকেতেন সিলেট এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বিধুভূষন ভট্টাচার্যের সাথে। তাঁদের মতামত নিয়েই সিদ্ধান্ত নিই যে, ছন্দালাপ দিলওয়ার সংখ্যা প্রকাশের। অল্প সময়ের আহবানে দিলওয়ারকে নিবেদিত লেখা পেয়ে আমি অবিভুত হয়ে যাই।
সত্যিই দিলওয়ারের প্রতি ছড়াসাহিত্যিকদের ভালোবাসার কাছে আমি পরাজিত হই। নভেম্বর ২০১৩ এর মধ্যেই দিলওয়ার সংখ্যা প্রকাশ করতে সক্ষম হই। সত্যি কথা বলতে ছন্দালাপ ৬ষ্ঠ সংখ্যাটি ছিলো দিলওয়ার সংখ্যা। যা তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে প্রথম প্রকাশনা। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তখন পর্যন্ত এই ছড়ার রাজার একটি ছড়া বা কবিতা দেশের কোন পাঠ্যুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। যা জাতি হিসেবে আপনার আমার সকলের জন্য লজ্জার।
যার ফলে ‘ছন্দালাপ’ দিলওয়ার সংখ্যার সম্পাদকীয়তে দাবি ছিলো এরকম- ‘আমরা যারা ছড়াসাহিত্য নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করি বা দু’চার লাইন লিখি তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে এ দাবীটি আজ সরকারের প্রতি জোরালোভাবে করতে চাই- ছড়ার রাজা ও গণমানুষের কবি দিলওয়ারের লেখা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। যা কেবল আমাদের দাবি-ই নয়,বরং দেশ ও জাতির দায়িত্বও বটে।’
দিলওয়ারকে নিয়ে রয়েছে নানা জনের নানা মত। তা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। আমি কেবল বলবো দিলওয়ার ছড়াসাহিত্যকে যা দিয়েছেন সে তুলনায় আমরা তাঁর জন্য কিছুই করি নি। আমার সম্পাদনায় ‘ছন্দালাপ’ দিলওয়ার সংখ্যা প্রকাশ ছড়াসাহিত্যের ঋনশোধ নয়; তা কেবল ছিলো একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। দিলওয়ারকে নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু করেছেন কিন্তু তাঁকে নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর ছন্দালাপ-ই প্রথম প্রকাশনা হওয়ায় তৃপ্তির সাদ পেয়েছি।
ছড়ার রাজার লেখা বর্তমানে পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। এটা অবশ্যই আমার ও আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ। দুঃখ কেবল একটাই ছড়ার রাজা ও গণমানুষের কবি তা দেখে যেতে পারেন নি। উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা পাঠ্য বইয়ে দিলওয়ারের ‘রক্তে আমার অনাদি অস্থি’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে এ কবিতাটি অন্যতম।
দিলওয়ারের মৃত্যুর পর ছড়ার রাজধানী সিলেটে রাজাহীন রাজ্যে চলছে যেনো ছড়ার হাহাকার। আমার এ কথার সাথে অনেকেই সহমত পোষণ করবেন। তবে কেউ কেউ ছাড়া। আমরা ছড়ার রাজাকে হারিয়েছি। কিন্তু ছড়ার রাজধানীতে বাস করেও ছড়ার লালন করছি না যথাযথভাবে। আমরা যারা ছড়াসাহিত্য নিয়ে কাজ করছি তারাও কোনো উদ্যোগী হচ্ছি না দিলওয়ারের ছড়াকে পাঠুপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে। সুতরাং সিলেটের ছড়াসাহিত্য ভুবনে যে বর্তমানে খরা যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজাহীন রাজ্যে দুর্ভোগ থাকাটা অস্বআভাবিক নয়। তবে এ দুর্ভোগ যেনো দীর্ঘ না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে। সিলেটে রয়েছে অনেকগুলো ছড়াসাহিত্য সংগঠন। প্রতিটি সংগঠনের সাথে রয়েছেন প্রতিষ্ঠিত ছড়াসাহিত্যিকগন। কাজেই ছড়াসাহিত্যে সিলেটের যে সুনাম রয়েছে তা ধরে রাখার দায়িত্বটা বর্তমানদের নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে এককভাবে কাজ করাটা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সুতরাং সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায়ই এগিয়ে যেতে হবে আগামীর পথে। কাজেই আমাদের সকলের উচিত ছড়ার রাজা দিলওয়ারের ছড়া যেনো পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে স্থান পায় সে দাবি সরকারের প্রতি জোরালোভাবে জানানো। পরিশেষে বলবো পাঠ্যপুস্তকে দিলওয়ারের ছড়াকে স্থান দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে দিলওয়ারের পরিচিতি তুলে ধরা হোক। সে প্রত্যাশায় ছড়ার রাজার জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি নির্ণয়হীন ভালোবাসাসহ বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: সম্পাদক- ছন্দালাপ ও নির্বাহী পরিচালক- ছড়া নিকেতন, সিলেট।
আপনার মন্তব্য