বুধবার, , ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং

বইমেলার ডায়েরি-২৬

 প্রকাশিত: ২০১৮-০২-২৮ ০৩:৩৮:৫২

রেজা ঘটক:

মঙ্গলবার ছিল সাতাশে ফেব্রুয়ারি। অমর একুশে বইমেলার শেষ মঙ্গলবার। ছুটির দিন না হলেও বইমেলায় বেশ ভিড় ছিল। বইপ্রেমীরা বই কিনছেন নিজেদের পছন্দে। আমিও কিনেছি।

শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশ পেয়েছে এবারের বইমেলার আরেকটি সেরা বই সৈয়দ বদরুল আহসানের 'Glory and Despair: The Politics of Tajuddin Ahmad' (গ্লোরি অ্যান্ড ডেসপেয়ার: পোলিটিক্স অব তাজউদ্দিন আহমদ)। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী রবীন আহসান। এ বইটিও ইংরেজিতে লেখা।

ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ প্রকাশ করেছে খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক শওকত আলী'র আত্মজীবনী ‘অবিস্মৃত স্মৃতি’। এই আত্মজীবনী শওকত আলী নিজে লেখা শুরু করলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষ করতে অনুলেখকের সহায়তা নিয়েছিলেন। লেখক শিবিরের অন্যতম কর্মী আব্দুস সাত্তার পালন করেন অনুলিখনের দায়িত্ব। শওকত আলী তাঁর এই আত্মজীবনীতে তুলে ধরেছেন ব্যক্তিজীবন ও শিল্পের সঙ্গে ব্যক্তির সংযোগের বিষয়টি।

ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে প্রকাশ পেয়েছে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের নতুন গল্পের বই ‘রাই কুড়িয়ে বেল’। ১২টি গল্প নিয়ে এই গল্পগ্রন্থ। বইটির মূল্য ২০০ টাকা। বেহুলা বাংলা প্রকাশ করেছে রিয়াসাত জ্যোতি'র ভ্রমণ বিষয়ক বই 'মিশন মেলায়ু'।

বাংলা একাডেমির বহেরাতলায় লিটলম্যাগ কর্নারে ছোটকাগজ মাদুলি প্রকাশ 'তারেক মাসুদ সংখ্যা'। ৬০০ পৃষ্ঠার এই বিশেষ সংখ্যায় উঠে এসেছে অকালপ্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদকে নিয়ে এ যাবত লেখা প্রায় সকল আর্টিকেল। লিটলম্যাগ 'মাদুলি'র সম্পাদক কবি অরবিন্দ চক্রবর্তী।

শাহবাগের জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রধান অডিটোরিয়ামে ছিল বাউল শাহ আবদুল করিমের জীবনের উপর নির্মিত বায়োগ্রাফিক্যাল চলচ্চিত্র ‘রঙের দুনিয়া’র তিনটি স্পেশাল প্রদর্শনী। বিকাল ৩টা, ৫টা ও ৭টায় পরপর ‘রঙের দুনিয়া’ প্রদর্শিত হয়। তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা মোক্তাদির ইবনে ছালাম নির্মিত চলচ্চিত্রটি ইতোমধ্যে ইংল্যান্ডের তিনটি শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য মুক্তি দিয়েছে বেঙ্গলি ফিল্ম ক্লাব ইউকে। ঢাকার আজকের প্রদর্শনীগুলোর প্রথম শোটি আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।

ছবিটি আমি আরেকবার দেখতে চাই। বাউল শাহ আবদুল করিমের জীবনের প্রধান প্রধান ঘটনা দেখাতে গিয়ে নির্মাতা মোক্তাদির যে ফিকশন করেছেন, সেখানে কেবল একটা জায়গায় আমার ফিকশন মনে হয়েছে। যখন শাহ করিম মৌলভীকে সোজা বলে দেন, আপনি আমার শিষ্যের জানাজা না পড়াতে পারলে, আমি নিজেই পড়াব। এই জায়গাটায়। বাকি ঘটনাগুলো প‌্যারালাল ছবিতে ঘটতে দেখা গেলেও কোনো উত্তেজনা তৈরি করেনি বলে আমার মনে হয়েছে।

বিশেষ করে শাহ করিমের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় দেখাতে গিয়ে যৌবনের শাহ করিমের চরিত্রে আগুন-এর অভিনয় অংশটি কেন জানি ভালো লাগেনি। বরং বৃদ্ধ বয়সের করিমের চরিত্রে খায়রুল আলম সবুজ শাহ করিমের জীবনকে অনেকটাই রিপ্রেজেন্ট করতে পেরেছেন বলে মনে হয়েছে। খায়রুল আলম সবুজ যতোটা চরিত্রে ছিলেন ছবির অন্য চরিত্রগুলো যেন ততোটাই ছিলেন না। টানা গান দেবার কারণে এক ধরনের একঘেয়েমিও লাগতে পারে দর্শকদের।

বাউল শাহ আবদুল করিমের বায়োগ্রাফিক্যাল চলচ্চিত্রের জন্য নির্মাতার যে প্রজ্ঞা ও নির্মাণ কৌশল দেখানোর প্রয়োজন ছিল, তা দেখাতে নির্মাতা কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলেছেন। বিশেষ করে পিরিয়ডিক্যাল ছবিতে শাহ করিমের জীবদ্দশায় হাওরের যে সুর, সেই ভাটি আমি ছবির কোথাও খুঁজে পাইনি। ভাটির পুরুষের সেই ভাটি ছবিতে দেখতে গিয়ে আমি বরং হতাশ হয়েছি। শাহ করিমের বায়োগ্রাফিক্যাল ছবিতে গাজীপুরের শালবনের লোকেশন মোটেও যথার্থ সিলেকশন মনে হয়নি। বরং সুনামগঞ্জের হাওর কোথায়? যা ছবিতে খুব প্রয়োজনীয় ছিল বলে আমি মনে করি। তবুও তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা মোক্তাদির ইবনে ছালামের ‘রঙের দুনিয়া’ চলচ্চিত্রের জন্য আমার প্রাণান্ত শুভেচ্ছা। ছবি বানানোর আগে শাহ করিমের জীবনের উপর মোক্তাদিরের আরও গবেষণা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয়েছে।

কারণ এর আগে শাহ করিমের উপর নির্মিত শাকুর মজিদের ডকুমেন্টারি 'ভাটির পুরুষ' ও জীবনীগ্রন্থ 'ভাটির পুরুষ কথা' দুটোই আমার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা ও পড়া। যে কারণে জানা বিষয়ে নতুন করে দেখতে বসেই নির্মাতার একটা ঝলক আমি প্রত্যাশা করেছিলাম। আমি শাকুর মজিদকেও তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা মোক্তাদির ইবনে ছালামের ‘রঙের দুনিয়া’ চলচ্চিত্রটি দেখার অনুরোধ করব। এবং তাঁর প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করব।

সিনেমা শেষ করতেই আমার বন্ধু ইফতেখার আলী ডনের ফোন। বন্ধু তুই কোই? বললাম পাবলিক লাইব্রেরিতে সিনেমা দেখলাম। জবাবে ডন বলল, তুই রাস্তা ক্রোশ করে এপার আয়। গিয়ে দেখি ডন ওর ছোট মা আমাদের লিটল প্রিন্সেসকে নিয়ে বইমেলায় যাচ্ছে। আমাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ডন লিটল প্রিন্সেসকে জুতা পরালো। টিএসসি এসে আমরা গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে বইমেলায় ঢুকলাম।

লিটল প্রিন্সেস বইমেলায় ঢুকে আমাদের দুই বন্ধু'র দফা একেবারে ঠাণ্ডা করে দিছে। শেষপর্যন্ত অনেক দৌড়ঝাঁপের পর ছোটমা যখন শান্ত হয়ে বলল, এবার আম্মু যাবো, তখন ডন বলল, বন্ধু এবার আমাদের এগিয়ে দে। আরা পারি না রে। পা ব্যথা হয়ে গেছে। ছোটমা আর ডনকে বিদায় জানিয়ে গেলাম বিদ্যাপ্রকাশে। যথারীতি কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল, জুলফিয়া ইসলাম ও ফারহানা আজিম শিউলীকে পেলাম। হালকা একটু আড্ডা। তারপর আবার ছুট।

বাংলা একাডেমির বহেরাতলার লিটলম্যাগ কর্নারে গিয়ে পেলাম বন্ধু হাসান মাহমুদ ও তার পরিবারকে। ভাবী, মেয়ে মাটিয়া ও পুত্র অরিত্রকে আজ প্রথম দেখলাম। আমার সাথে ছিল তরুণ কবিবন্ধু জিনাত ও লিমন। বন্ধু হাসান পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আমরা পুকুর পাড়ে গিয়ে কফি খেলাম। কিছুক্ষণ পর আমাদের সাথে যোগ দিল আমার আরেক কবি বন্ধু সুমনা। তারপর কবি নীলসাধুর জন্য অপেক্ষার পালা যখন শেষ হলো, তখন সবাই মিলে আবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢু দিতে গেলাম।

এবার আমাদের সাথে যোগ দিল বন্ধু কবি শাহেদ কায়েস ও কবি স্নিগ্ধা বাউল ও কবি সেঁজুতি বড়ুয়া। ততক্ষণে আমার সাথে যোগ দিয়েছে নির্মাতা স্বরূপ আনন্দ ও লিয়াকত লিকু গং। সব্যসাচীতে যাবার পর আমার প্রকাশক শতাব্দী ভব ধূমপান করালো। সেই সুযোগে সব্যসাচীতে তসলিমা নাসরিনের নতুন কাব্যগ্রন্থ 'গল্প' কিনতে সাদিয়া নাসরিনের নেতৃত্বে নারীবাদী লেখিকাদের বিশাল ঢল চোখে পড়ল। তারা আমাদের একদম পাত্তাই দিল না। তারপর আমরা ঘুড়িতে ঢু মেরে শ্রাবণে চা থেকে গেলাম। সেখানে যাবার পর সেই নারীবাদীরা এসে আবার আমাদের সাথে যোগ দিলেন।

এই ফাঁকে একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। আমাদের লীনা পারভীনের প্রথম বই 'আমাদের যা বলার বলবে এবার বাংলাদেশ' শ্রাবণ থেকে প্রকাশ পাবার পর থেকে লীনা বইমেলায় শ্রাবণ ছাড়া আর কোথাও যায় না কেন, সেই রহস্য উন্মোচনে আমরা যখন আকরাম ভাইয়ের নেতৃত্বে এক সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন নিয়ে ব্যস্ত, তখন সৈয়দ বদরুল আহসান, রবীন আহসান, রুমি আহমেদ ও ফেরদৌস আরা রুমি আমাদের সেই অভিযানে ঘা দিয়ে আউলা করে দিল।

তখন মারুফ রসুলের আগমন। মারুফ বদরুল ভাই'র নতুন বই 'Glory and Despair: The Politics of Tajuddin Ahmad' দেখতে ব্যস্ত হয়ে গেল। ততক্ষণে আমাদের সাথে হুট করে যোগ দিলেন 'সেই সব শেয়ালেরা'র লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন। ফারুক ভাই ছো মেরে আসলেন আর কোথায় যেন হুট করে হারিয়ে গেলেন। পরে আমরা বইমেলা থেকে বের হয়ে আবার পাবলিক লাইব্রেরিতে ফেরত আসলাম তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা মোক্তাদির ইবনে ছালামকে সঙ্গ দিতে।

সেখানে এসে পেলাম তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা অন্ত আজাদ ও নির্মাতা প্রশান্ত অধিকারীকে। উল্লেখ্য, দুপুরে আমরা যখন সিনেমা দেখা শুরু করি তখন আমার সাথে ছিল নির্মাতা স্বরূপ আনন্দ, নির্মাতা সন্দীপ বিশ্বাস ও অভিনেতা কাজী ফয়সল। সন্দীপ আর ফয়সলের সাথে পরে আর দেখা হলো না। তাহলে আরও ছবিটি নিয়ে আড্ডা মারা যেত।

আগামীকাল মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলার পর্দা নামছে। আমাদের আড্ডার বহরও তাই আরও লম্বা হচ্ছে। আর মাত্র একদিন পরেই মাসব্যাপী এই অমর একুশে বইমেলার সমাপ্তি হচ্ছে। পুরনো বন্ধুদের সাথে আড্ডায় আড্ডায় সময়গুলো তাই ভারী মধুর যাচ্ছে।

অমর একুশে বইমেলা আগামী দিন শেষ। কীভাবে যে গোটা একটা মাস হুট করেই ফুরিয়ে গেল, একদম টের পেলাম না। এখন খুব মায়া হচ্ছে। আহা পরশু আর বইমেলায় বন্ধুদের এমন আড্ডা বসবে না। তবুও শেষদিন বন্ধুরা বইমেলায় আসুন, নিজের পছন্দের বই কিনুন। প্রিয়জনকে বই উপহার দিন। সবাইকে অমর একুশে বইমেলার শুভেচ্ছা। বইমেলা অমর হোক। ভাষা শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করি। জয়তু অমর একুশে গ্রন্থমেলা। জয়তু ভাষার মাস।
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

  • রেজা ঘটক: কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা।

আপনার মন্তব্য