প্রকাশিত: ২০১৬-০১-০৯ ২১:০৯:১০
আপডেট: ২০১৬-০১-১৭ ২৩:৫০:৩৫
কবির য়াহমদ:
আমার মৃত্যুদিনে
আমার জীবদৈহিক মৃত্যুদিনে মানুষের ঢল নেমেছিল
কিছু চাপা কান্না আর অভিসম্পাতে ভারী হয়েছিল পরিবেশ
কিছু কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় বুঝে উঠতে পারিনি অনেকেরই প্রতিক্রিয়া।
আমি ছিলাম ঠায় জাগতিক নীরবতা ভর করেছিল মুহূর্তেই
এ এক অদ্ভুত দৃশ্য আমাকে দিয়ে সাজানো মঞ্চ
অথচ অংশগ্রহণের সামান্য সামর্থ্য হারিয়েছিলাম নিমিষেই,
বুজে আছি চোখ, বন্ধ করা মনোদুয়ার দেখছি সব তবু মনে হয়
দেখিনি অথবা দেখা হয়নি কিছুই কেমন অচেনা-অজানা ক্ষণ।
হাত নাড়াতে গিয়ে দেখি নড়ে না হাত, নড়ে উঠে পৃথিবী
পা চালাতে দেখি বরফখণ্ড পা, সরে যায় পুরো ভূ-খণ্ড
চাঁদ-সূর্যের ভেদ ভুলে মনে হয় এমন কিছুই ছিল না কোনকালেই
মিহি বাতাস আসে শনশন স্বরে তবু অনুভূতিশূন্যতা মোড়া!
আমার জীবদৈহিক মৃত্যুদিনের মানবঢলে আমি কাউকেই চিনতে পারিনি
এমনকি আমার পরিজন যাদের সাথে ছিল আমার জন্মসহযোগ
আমার ধমনীতে বয়ে যাওয়া যে রক্তের ধারাতে আরও ক’জন
ভাগাভাগি করেছিল তাদেরও আলাদা করতে পারিনি সময়ের তোড়ে,
আমার রক্তে কিছু রক্তের জন্ম হয়েছিল বলে জানে লোকে তারাও অজানা ক্ষেত্র
মনে হয় আমি ছিলাম একা একজন; অনাহুত আগন্তুক কোন!
কেন এত মানুষের ঢল, কেন এত প্রার্থনাসভা অথবা শেষকৃত্যানুষ্ঠান
আমি ভাবতে গিয়ে থমকে যাই- কেউ একজন কেড়ে নেয় ভাবনা সক্ষমতা
আমার ভাবনাসমূহ আমাতেই ফিরে আসে সে বিরূপ সময়ে।
আমার জীবদৈহিক মৃত্যুদিনে আমার সক্ষমতা হারালাম আনুষ্ঠানিক
তার আগেই কোন একসময়ে হয়েছিল মনোদৈহিক মৃত্যু,
সে মৃত্যুদিনে আমার বাড়িতে নামেনি কোন মানুষের ঢল
এক ফোঁটাও অশ্রু ঝরেনি কারও চোখ দিয়ে
কেউ বসেনি প্রার্থনাসভায়, কোন আয়োজনই ছিল না শেষকৃত্যানুষ্ঠানের
পরিজন ভেবেছি যাদের তারাও খেয়ালে নেয়নি কখনও
অবেলায় নিজেকে হারিয়ে ঠায় পড়েছিলাম নিজস্ব ভূমিসমতটে।
আমার মৃত্যুদিন আমাকে শিখিয়েছে বিস্তর তাই আমি একাকীজন
আমার মৃত্যুদিন আমাকে বলেছে আমি ছিলাম প্রকৃতই অস্তিত্বহীন।
মানুষ, মানুষ
মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডা-গির্জা পুড়ে যায় যদি
খানিক মন খারাপ হবে হয়ত
হয়ত অস্ফুট স্বরে বলতে পারি- ইস!
কখনও বা কপালের বিন্দু ঘাম মুছে বলতে পারি
ধর্মের প্রতিপক্ষ মানুষ নয়, মানুষের প্রতিপক্ষ নয় ধর্ম
মানুষই ধর্মকে করেছে মহান, মানুষবিহীন ধর্ম এক অভাগা মহাশ্মশান।
আমার আত্মা থেকে উচ্চারিত হয় কিছু শব্দ, নিত্য
পথে পথে নামে যদি মৃত্যুফাঁদ, আমি তুমুল রৌদ্র বুকে নিয়ে অতিক্রম করি সভ্য শঠতা
এ নগরের উত্তাপকে আমি উত্তরাধিকার ভেবেছি গ্রাম্য ভাষায়
আমাকে মানুষ চেনাও, আমি মানুষের কাছে গিয়ে পালন করি মানবধর্ম।
আমি বুকে হাত দিয়ে টের পাই স্পন্দন নীল
আমি হাতে হাত রেখে অনুভব করি প্রাণের আকুলতা
আমাকে উপাসনালয় দেখাও, যেখানে বসা ঠায় প্রভু নিরঞ্জন
আমি স্পর্শে চাই অসীম ক্ষমতা; অস্ফুট বয়ান।
মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডা-গির্জা মানুষসৃষ্ট সব
কর্তার কর্ম কী, বলতে পারো?
অথচ দেখো মানুষ, মানুষ-
ধর্ম বলে- স্রষ্টা সৃষ্ট মানবজন্ম
তবে কেন তুমি বিপুল অন্ধকারে, হাতে নিয়ে নিলে শকুনের ঠোঁট?
মানুষ, মানুষ-
মানুষ মরে, মানুষ বাঁচাও
মানুষের চাইতে বড় নয় কোন উপাসনালয়!
বিদেহী আত্মা
রাত হলে বাড়ি ফিরি বলে আমার দিকে হেলে পড়েছে ঘরের দেয়াল। তার নির্বিকার চাহনিতে আমি দগ্ধ হই নিয়ত। মনে হয়, কে জানি ইঁদুরচোখে দেখছে আমায়। জানোই তো, ইঁদুরে আমার ভীষণ অপছন্দ, সেই আদিকাল থেকে। শুনেছি জন্মাবার পর থেকেই। বিশ্বাস করো, ইঁদুর-বিদ্বেষী আমি ছিলাম সেই সৃষ্টির আদি থেকে আমাদের আত্মারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছিলো কোন না কোন দেহ পাবার আশায়!
আমি ছিলাম আত্মা ছাড়া এক। শুধু শুধু দেহ নিয়ে আচানক লয়ে ঘুরছিলাম। তারপর মাঝপথে এসে কোন এক আত্মাকে বগলদাবা করে নিজেকে দিয়েছিলাম মানুষের অবয়ব! তাই পৃথিবীপথে আসতে গিয়ে হাওয়ায় ভাসা সবগুলো প্রশ্নকে উড়িয়েছিলাম নির্বিকার। ভাবনায় আমি ছাড়া ছিলনা কেউ বলে শুধাতে পারিনি আত্মার পেছনকার মালিকের নাম। তাই কিছুদিন থেকেছিলাম পরিচয়হীন!
ইত্যবসরে কোনা গেলো কোন এক বিদেহী আত্মাচরিত্র চুরি গেছে। যার নাম ছিল কবিদের কাতারের ঠিক সামনে। আমি আমাকে লুকাই, আমার আত্মাকে লুকাই কিন্তু দেহ লুকাতে গিয়ে ধরা পড়ি নিজের কাছে। চুরি করা মন চুপি চুপি চুপ হয়। নিজেকে আবিষ্কারের কালে আবিষ্কার করি কলম্বাসের সহোদর।
আমার ঘরের বারান্দায় আজ আমি একটা ছবি লটকে রাখতে চাই; ঠিক ঠিক আমি-প্রতিরূপ। ঘরে ঘরে আমার বাস বলে বারান্দাতেই থাক আমার প্রতিকৃতি। আমি আমাকে দেখতে গেলে উঁকি দেবো বারান্দায়! যেখানে রাতের চাঁদ এসে সরাসরি উপচে পড়বে আমার ওপর!
আমার আত্মা আমাকে ডাকে। আমি ডাকি দেহকে। দেহ ডাকে আত্মাকে। পড়ে যাই ঘূর্ণাবর্তে। ঘূর্ণনের কালে ঘূর্ণি উঠে সময়ে বিদেহী আত্মা আবারো দেহ খুঁজে নির্লিপ্ততাকে সাথে করে।
আপনার মন্তব্য