মঙ্গলবার, , ১৩ নভেম্বর ২০১৮ ইং

হাই, ফেসবুকে আইডি আছে?

 প্রকাশিত: ২০১৮-০৪-১৪ ১৭:৫৮:০১

 আপডেট: ২০১৮-০৪-১৪ ১৭:৫৯:৩৯

মাসকাওয়াথ আহসান:

বোশেখের প্রথম দিনটিতে হোম মিনিস্টারের সাংঘাতিক ব্যস্ত সময় কাটছে। তিনি বৈশাখি মেলার আনন্দের ঢলে দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুরছেন।

র‍্যাবের এক কর্মকর্তা হোম মিনিস্টারকে সালাম দিয়ে বলে, শুভ নববর্ষ স্যার।

হোম মিনিস্টার জিজ্ঞেস করেন, কেমন কাটছে আজকের দিনটি; ডিউটি তো এমন দিনে আনন্দের অভিজ্ঞতা; নাকি বলেন!

--সে তো বটেই। কিন্তু স্যার পাঁচটার পরেও ডিউটি থাকায় বাসায় গিয়ে ফ্যামিলিকে সময় দিতে পারছি না স্যার।

হোম মিনিস্টার বিব্রত বোধ করেন। অনুতাপের সঙ্গে বলেন, কাল ছুটি নিয়ে নিন। কাল তো কলকাতায় পয়লা বৈশাখ। কাজেই কালও নববর্ষের আনন্দ থাকছে; কাল ফ্যামিলিকে সময় দিন।

র‍্যাব কর্মকর্তা মন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে ডিউটিতে চলে যান।

মন্ত্রীর চোখে পড়ে কয়েকজন নারী এক লাল পাঞ্জাবি পরা বখাটেকে ঘিরে ধরে শাসাচ্ছে। দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে; আমি কী কোন সাহায্য করতে পারি!

একজন নারী বলেন, লাগবে না পুরুষ মানুষের হেলপ। এর জন্য আমরাই যথেষ্ট।

--তা কী করেছে এই ছেলে।

আরেক নারী তার স্মার্ট ফোনে ফেসবুক ইনবক্সের কতগুলো স্ক্রিনশট বের করে দেখায়। খুবই "ইনডিসেন্ট প্রোপোজাল"-এ ভরা সেসব বার্তা।

হোম মিনিস্টার বলেন, প্লিজ আইনকে হাতে তুলে নেবেন না; সাইবার আইনে এর বিচার হবে।

নারীরা সমস্বরে বলে, না না ওসব দরকার নাই; একে বিচার বহির্ভূত জুতা পেটা করতে চাই।

ভাব ভালো নয় দেখে হোম মিনিস্টার অন্যদিকে হাঁটা দেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখেন। এতো রঙ এতো আনন্দ আদ্র করে হোম মিনিস্টারের মন। ফোন বেজে উঠলে তাকিয়ে দেখেন, স্বয়ং আসল হোম মিনিস্টার ফোন করেছেন।

--কী ব্যাপার লোকজনকে এতো আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটানোর পরামর্শ দিচ্ছো। আর নিজে কী করছো!

হোম মিনিস্টার ঘাবড়ে যান। অনুনয় করে বলেন, দেখো আজকের দিনটা আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে চাই। কাল বাসায় তোমাদের সঙ্গে কাটাবো।

ফোনের ওপার থেকে আসল হোম মিনিস্টার বলেন, অনেক রেগে ছিলাম; কিন্তু তুমি "গুরুত্বপূর্ণ কাজ" কথাটা বললেই শৈশবের মতো প্রাণ খুলে হাসতে পারি। রাখছি। খেয়ে নিও কিন্তু।

হোম মিনিস্টারের তীব্র অভিমান হয়। বাম পাশে বচসার শব্দ শুনে সেদিকে যান। একটা ফুচকার দোকানে সবগুলো চেয়ার দখল করে বসে আছে কতগুলো তরুণ। এক তরুণী তাদের বলে, সামান্য কার্টেসি শেখোনি তোমরা। জেন্টলম্যানেরা কখনো মেয়েদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে এমন পাঞ্জাবিতে ফেভিকল লাগিয়ে চেয়ারে বসে থাকে না। উঠে তাদের বসতে জায়গা দেয় ।

এক তরুণ তার মাউথ অর্গান বাজানো থামিয়ে বলে, দেখো ভাই; কোটা বাতিল হয়েছে। নারী কোটা আর নেই। উই আর সরি।

তরুণীরা হোম মিনিস্টারের দিকে তাকায়। হোম মিনিস্টার বলেন, দেখো সামাজিক জীবন যাপন করতে গেলে সারাক্ষণ কোটা পদ্ধতির কথা ভাবলে চলে না। সেখানে ভদ্রতা কোটাটাই আসল।

তরুণেরা উঠে তরুণীদের বসতে দেয় চেয়ারে। একজন বলে, একজন বৃদ্ধ মানুষ অনুরোধ করেছেন; তাই মাফ কইরা দিলাম।

হোম মিনিস্টার আবার একটু বিষণ্ণ হন। মনের মধ্যে "তিনি বৃদ্ধ হলেন" গানটা বাজতে থাকে।

হাঁটতে থাকেন রমনার সবুজ বাগানে। গাছগাছালি; পাখির কিচির মিচির, নারী-পুরুষের হাসির ফোয়ারায় তার মনে পড়ে, এই তো মনে হচ্ছে গতকালই এই বৈশাখি আড্ডায় স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরেছিলাম; মাঝখান থেকে তিরিশ বছর যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

একদল তরুণের কোথাও যাবার তাড়া নেই এমন জীবনানন্দনীয় হাব-ভাব দেখে হোম মিনিস্টার জিজ্ঞেস করেন, বাসায় যাবে না। যাও আত্মীয়-পরিজনকে সময় দাও।

এক পটপটে টাইপের তরুণ বলে, এখনি কী করে ফিরি স্যার। বৈশাখি আনন্দ শেষ হতে না হতেই আবার কাকরাইল মসজিদে যেতে হবে শবে মেরাজের নামাজ পড়তে।

হঠাত বৃষ্টি নামে। হোমমিনিস্টার ভাবেন, জগত রহস্যময়; ঠিক পাঁচটায় বৃষ্টি নেমেছে। এবার সবাই নিশ্চয়ই নিজ বাড়িতে ফিরে আত্মীয়কে সময় দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু ওরা যেন বৃষ্টিতে ভিজতে চেয়েছিলো। কারো ঘরে ফেরার লক্ষণ নেই।

হোম মিনিস্টার নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে এবার একটু আবাসিক এলাকার দিকে যান। ট্রাফিকে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে পাশের গাড়ির ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেন, নিজের বাসায় ফিরছেন তো!

--ফিরছি; তবে নিজের বাসায় না; ভাবছি বন্ধুদের সঙ্গে একটু আড্ডা দিয়ে যাবো।

মন্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এলিয়েনেশান; এলিয়েশান।

ভদ্রলোক মুচকি হাসি দিয়ে বলেন, আরবানাইজেশান মানেই এলিয়েনেশান। তবে সংসারের ফাঁদে পড়ে যে স্কুলের বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি; তাদের সঙ্গে দেখা করতেই যাচ্ছি।

মন্ত্রী হেসে হাত নেড়ে বিদায় নেন। এক ভদ্রমহিলাকে সালাম দিয়ে বলেন, আপা বাসায় ফিরছেন তো!

ভদ্রমহিলা ক্ষেপে গিয়ে বলেন, আশ্চর্য প্রশ্ন তো! প্রথমে ঘোষণা দিলেন, বিকেল পাঁচটার মধ্যে বাসায় ফিরে আত্মীয় স্বজনকে সময় দেন। পরে আবার বললেন, আপনারা সন্ধ্যার পর যে যার বাড়িতে ফিরে যাবেন। আমার বাসায় আমি আর আমার হাজব্যান্ড থাকি। আত্মীয়রা কী থাকে! আপনার প্রথম ঘোষণার পরেই আত্মীয়দের জানিয়েছি তাদের বাসায় যাবো; এখন সেখানেই যাচ্ছি।

হোম মিনিস্টার কী বলবেন ঠিক বুঝতে পারেন না। ধানমণ্ডি লেকের পাশে কয়েকজনকে আড্ডা দিতে দেখে বলেন, কী ব্যাপার নিজের বাড়িতে ফিরবেন না!

একজন উত্তর দেন, ঘর-বাড়ি ভালা না আমার।

আরেকজন বলে, ঘর করলাম নারে আমি সংসার করলাম না।

তৃতীয়জন এক গাল হেসে বলে, আমরা হলাম গিয়ে বাউল টাইপের লোক। আর জানেনই তো, বাউল কখনো গৃহস্থ হয়না।

মন্ত্রী এবার সিদ্ধান্ত নেন কয়েকটা এপার্টমেন্টে গিয়ে দেখবেন মানুষ আসলেই নিজ বাড়িতে ফিরে আত্মীয়কে সময় দিচ্ছে কীনা!

একটা এপার্টমেন্ট দালানের প্রহরী জানায়, বেশিরভাগ বাসার লোকই ফেরেনি। শুধু একটা এপার্টমেন্টে মানুষ আছে।

হোম মিনিস্টার খুশী হন। যাক সবাই বিচ্ছিন্নতার রোগী নয়। এখনো বন্ধনের উষ্ণতা বেঁচে আছে সমাজে।

কলিং বেল বাজাতেই একটা ছেলে স্মার্ট ফোনে চ্যাটিং করতে করতে দরজা খুলে দিয়ে চলে যায়। মন্ত্রী সংকোচে ঘরে ঢুকে দেখেন এ ঘরের প্রতিটি মানুষের হাতেই স্মার্ট ফোন। সবাই ফোনের চ্যাটিং-এ ব্যস্ত।

মন্ত্রী বলেন, হ্যালো।

একটা ছেলে বলে, হাই; ফেসবুকে আপনার আইডি আছে; কিংবা হোয়াটস এপে! আমাকে এড করে নিন; তারপর কথা হবে।

আপনার মন্তব্য