প্রকাশিত: ২০১৫-০১-০৩ ১৭:৩৫:৩১
আপডেট: ২০১৫-০১-০৩ ১৭:৩৮:২১
অঞ্জন আচার্য :
আর মাত্র মাসখানিক পরেই শুরু হতে যাচ্ছে বইমেলা, বাঙালীর প্রাণের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। জাতীয় চেতনার এক বৃহত্তর আদর্শের নাম এ গ্রন্থমেলা। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহক এ মেলায় জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি। মাসব্যাপী এমন আয়োজন পৃথিবীর অন্য কোথাও হয় কিনা জানা নেই। লেখক-পাঠক-প্রকাশকসহ সর্বস্তরের মানুষের এক মহাসম্মিলন ঘটে এ মেলাকে ঘিরে। বাংলাদেশ, তথা সমগ্র বাঙালীর মাসজুড়ে ধারাবাহিক এ বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও নৈকট্য পরিণত হয় পবিত্রতম উৎসবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে বাংলাদেশের মানুষকে এক মঞ্চে ঠাঁই দেয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। তাই এই মেলাকে ঘিরে চলে নানা আয়োজন। তবে গ্রন্থপ্রণেতাদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায় মেলা শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই।
লেখা, পাণ্ডুলিপি তৈরি করা, পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করা, চূড়ান্ত প্রুফ দেখা ইত্যাদি নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় লেখকদের। সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সেই পাণ্ডুলিপি হাতে পাওয়ার পর সেটি চলে যায় প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক সেটিকে পাঠায় মুদ্রণ কারখানায়। সেখানে মুদ্রণের পর অঙ্গসজ্জা ও বাঁধাইয়ের পর সেটি প্রকাশিত হয় বই আকারে। পাঠক পায় নতুন বইয়ের ঘ্রাণ ও স্বাদ। লেখকদের এ পূর্বব্যস্ততার বিষয়ে কথা হয় সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখনও বলতে পারছি না, কতগুলো বই আমার প্রকাশিত হবে। তবে ২৭ ডিসেম্বর আমার জন্মদিন উপলক্ষে শুদ্ধস্বর থেকে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ৮০তম জন্মদিনে আমার ‘তরঙ্গের অস্থির নৌকায়’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পূর্বে কিছুটা ব্যস্ততা ছিল। এ মুহূর্তে বেশ কিছু লেখা হাতে আছে। এখনও শেষ করে উঠতে পারিনি। তাই বইয়ের সংখ্যা এখনই জানাতে পারছি না।’ এদিকে গত কয়েক বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের সিরিজ। ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে ইতোমধ্যেই লেখকের তিনটি আত্মজীবনী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এসব আত্মজীবনীতে ফুটে উঠেছে লেখকের অনেক জানা-অজানা কথা। সেই সঙ্গে তৎকালীন সমাজবাস্তবতার পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র উঠে এসেছে লেখনিতে। আসছে বইমেলায় লেখকের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সেইভাবে আর আগের মতো লিখতে পারি না। শারীরিক অসুস্থতা এর জন্য দায়ী বলা যায়। তবে এরই মধ্যে বেশ কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। মূলত আত্মজীবনী লিখতেই বেশি সময় দিতে হচ্ছে আমাকে। প্রতিবারের মতো চতুর্থ খণ্ডটিও যথারীতি ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে। এছাড়া আমার ৫০টি গল্প নিয়ে অন্যপ্রকাশ একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করছে। এছাড়া আমার প্রথম উপন্যাস ‘শামুক’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভাষা ভাবনা’ নামে একটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ করছে কথাপ্রকাশ।’ আত্মজীবনীটি সম্পূর্ণ করতে কতখানি লেখা বাকি রয়েছে- জানতে চাইলে হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘খুব বেশি বাকি নেই। আর মাত্র পনেরো-কুড়ি দিন লিখব। তাতেই আশা করি এ পর্ব শেষ হয়ে যাবে।’
প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা কথাশিল্পী বিপ্রদাশ বড়ুয়া। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ব্যস্ততার ভেতর দিয়েই দিন কাটাচ্ছেন তিনি। চলছে মেলাকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। সেই সঙ্গে প্রেম চলছে প্রকৃতির সঙ্গে। ব্যক্তিগত প্রেম আছে কিনা- জানতে চাইলে, উনি হেসে বলেন, ‘ব্যক্তিগত প্রেমের কথা বলে আবার কোন ঝামেলায় পড়তে হবে ভাই। তার চেয়ে বরং সে কথা থাক। আসছে মেলায় কী কী বই আসছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিপ্রদাশ বড়ুয়া বলেন, ‘আশা করছি ১০টি বই প্রকাশিত হবে মেলায়। তবে এর মধ্যে কয়েকটি বইয়ের কাজ শেষ, কয়েকটির কাজ এখনও বাকি আছে। সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত রাখতে হচ্ছে নিজেকে। এ মুহূর্তে বলতে গেলে বলা যায়, পার্ল প্রকাশনীতে থেকে আমার গল্পগ্রন্থ ‘নীল যৌবন নীল মৃত্যু’, ‘প্রকৃতির শব্দ-চিত্র-গন্ধমালা’ প্রকাশিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে ছোটদের গল্পসমগ্র প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করছে আদিগন্ত প্রকাশনী। অ্যাডর্ন থেকে প্রকাশিত হচ্ছে ‘জসীমউদ্দীন’ ও ‘বিদ্যাসাগর’-এর ওপর জীবনীমূলকগ্রন্থ।’
কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান এখন আর তেমনটা লিখেন না লেখকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল। তিনি বলেন, ‘বইমেলাকে ঘিরে আমার ভেতর তেমন ব্যস্ততা নেই। মেলায় কী বই বের হবে কি হবে না তা নিয়েও মাথা ঘামাই না। একটা সময় ছিল যখন এ নিয়ে অনেক ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে আমাকে। তবে জীবনের এ লগ্নে এসে তা আর ভাল লাগে না।’ এ মুহূর্তে কী লিখছেন? জানতে চাইলে রিজিয়া রহমান বলেন, ‘স্মৃতিকথাটাই লিখছি। তবে সেটি শেষ করতে আরও মাসখানিক সময় লেগে যাবে মনে হচ্ছে। এই সিরিজের প্রথম খণ্ড ‘নদী নিরবধি’, দ্বিতীয় খণ্ড ‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’, তৃতীয় খণ্ড ‘অভিবাসী আমি’ ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। চতুর্থ খণ্ডটির নাম রেখেছি ‘দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়ি’। বইটি প্রকাশ করছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ। পাশাপাশি বেশ কিছু পুরোনো বইয়ের পুনঃসংস্করণ হচ্ছে। এর মধ্যে ‘সূর্য-সবুজ-রক্ত’, ‘শিলায় শিলায় আগুন’ প্রকাশিত হচ্ছে আবারও।’ কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বরাবরই একটু আলাদা। প্রতিবারেই উনার নতুন কোন চমক থাকে মেলায়। আসছে বইমেলায় মোট ৪টি বই প্রকাশিত হচ্ছে জীবন ও জগৎসংশ্লিষ্ট এ শক্তিমান লেখকের। এর মধ্যে ‘প্রথমা’ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে উপন্যাস ‘দিনকালের কাঠখড়’ এবং অন্যপ্রকাশ থেকে ‘স্বপ্নের বাজপাখি’। অন্যদিকে ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত লেখকের বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘সোনালি ডুমুর’ বইটি বাংলাদেশ থেকে প্রথম মুদ্রিত হচ্ছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে। এছাড়া লেখকের ১৫টি গল্প নিয়ে একটি সংকলন ‘নুন-পান্তার গড়াগড়ি’ প্রকাশ করছে কথাপ্রকাশ। এ মুহূর্তে ব্যস্ততা সম্পর্কে জানতে চাইলে লেখক বলেন, ‘ব্যস্ততা বলতে ‘স্বপ্নের বাজপাখি’ বইটির চূড়ান্ত প্রুফ দেখে দিচ্ছি। সেই সঙ্গে নিয়মিত গল্প-গদ্য লেখা তো হচ্ছেই।’
মাস দুই-এক আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সেই অসুস্থতার ধকল এখনও কাটেনি, তা উনার সঙ্গে কথা বলেই অনুমান করা গেল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তেমন কোন লেখালেখিই হচ্ছে না বলে জানান কবি। তাই এসময়টায় ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে টিভি দেখে বা ফেসবুকে ব্রাউজ করে। তবে বিভাস প্রকাশনী থেকে কবির একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে বলে জানালেন তিনি। যদিও সেটির নাম এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
বরবারই ভিন্নধর্মী লেখা লিখেন কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার। রাজধানী থেকে আবাসস্থল তুলে নিয়ে বর্তমানে স্থায়ী আবাস গড়েছেন তিস্তাপাড়ের নিজের জন্মস্থান রংপুরের পীরগাছার সাওলা গ্রামে। কখনই খুব বেশি লেখালেখির দলে নিজেকে ভেরাননি তিনি। তবে লেখার সংখ্যাও নেহাতই কম নয়। জানা গেল, অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হচ্ছে লেখকের গল্পের বই ‘রূপান্তরের গল্পগাথা’। এছাড়া কিশোরদের গল্প সংকলন ‘ছদ্মবেশী ভূত’ প্রকাশ করছে চন্দ্রদ্বীপ প্রকাশনী। চন্দ্রবতী একাডেমি থেকে প্রকাশ পাচ্ছে লেখকের কিশোর উপন্যাস ‘মস্ত বড়লোক’। মঞ্জু সরকার বলেন, ‘বইয়ের কাজ প্রায় চূড়ান্ত। সামান্য কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। আশা করছি, এ সপ্তাহেই তা শেষ হয়ে যাবে।’
নিরীক্ষাধর্মী লেখা লিখে ইতোমধ্যেই পাঠকমহলে নিজের একটি জায়গা করে নিয়েছেন গল্পকার মামুন হুসাইন। চাকরির সুবাদে রোগী নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় তাঁকে। তবে এরই মাঝে নানা বিষয়ের ওপরই লিখতে হচ্ছে বলে জানালেন তিনি। এ মুহূর্তে ছোটকাগজ গল্পপাঠ-এর ‘সেলিনা হোসেন সংখ্যা’র জন্য একটি লেখা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আসছে বইমেলায় আপনার কী বই হাতে পাবেন পাঠক? এমন প্রশ্নের জবাবে মামুন হুসাইন বলেন, ‘‘একটা গদ্যের বই প্রকাশ হওয়ার কথা আছে। ‘ছায়াবীথি’ প্রকাশনী বইটি প্রকাশ করছে।”
কথা হলো কথাকার আহমদ মোস্তাফা কামালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বইমেলাকে ঘিরে আমার কোন ব্যস্ততা নেই। কারণ আগামী বইমেলায় একটি মাত্র বই আসছে আমার। ‘একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায়’ নামে মুক্তগদ্যের সেই বই প্রকাশ করছে নান্দনিক প্রকাশনী। পাশাপাশি গল্প, গদ্য লেখা হচ্ছে অল্পসল্প। কী পড়ছেন জানতে চাইলে তিনি জানালেন, কবি শঙ্খ ঘোষের গদ্যসমগ্র এ মুহূর্তে তাঁর পাঠসঙ্গী হিসেবে আছে।
অঞ্জন আচার্য
কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক
আপনার মন্তব্য