ফিরে দেখা এক জন্মকথা- ৭

পশ্চিমবঙ্গের লেখক রাজা সরকারের স্মৃতিচারণমূলক লেখা 'ফিরে দেখা এক জন্ম-কথা', যেখানে ওঠে এসেছে একাত্তর এবং সে সময়কার সমাজ, রাজনীতিচিত্র ও মানুষের দুর্ভোগ এবং ওঠে আসার বিস্তারিত বর্ণনা। দীর্ঘ এ লেখাটি সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম পাঠকদের জন্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে

 প্রকাশিত: ২০১৬-০২-০৮ ২৩:২৪:৫২

রাজা সরকার:

[পূর্ব প্রকাশের পর...]
১৯
ন্যুনতম চাহিদা হলেও জীবন সচল রাখতে গেলে ন্যুনতমটাই যে অনেক কিছু মনে হচ্ছে গত কয়েক মাস ধরে। মোহনগঞ্জে মিলিটারি ক্যাম্প হওয়ার কথা শোনা গেলেও গ্রামের মানুষকে প্রয়োজনে মোহনগঞ্জেও যেতে হয়। পুলিশ মিলিটারির ভয় সত্ত্বেও এই যাতায়াত করতে  হয়। বর্ষার সুযোগে নৌকায় যাতায়াত হওয়াতে মন্দের ভাল হয়েছে। পাকিস্তানী খানসেনাদের জলে ভয় । ভাটি অঞ্চলের এই সুবিধাটা আছে। হাতুড়ে ডাক্তার মধুসাধুর পুত্র যোগেশকেও মোহনগঞ্জে যেতে হয় ওষুধ আনতে। দেশজোড়া এই নৈরাজ্যকালীন বর্ষা কালে রোগব্যাধিরত আর বিরাম নেই। বিশেষ করে বাচ্চাদের। দলে মিশে যোগেশ লুঙ্গি পরেই যায়। পাড়ার মুদি দোকানের মাল পত্র  শেষ হলে বসে থাকার উপায় নেই দোকানদারের। মানুষের তাগাদার কারণে তাকেও যেতে হয়। উপরওলার স্মরণ নিয়ে সকলেই নৌকায় চেপে বসে। কপাল ভাল বলতে হবে এখন পর্যন্ত তেমন কোন বিপদ হয়নি কারোর। স্থানীয় সাপ্তাহিক হাট প্রথম প্রথম বন্ধ থাকলেও এখন সপ্তাহের শুক্রবার বসে। এ নিয়ে অবশ্য থানা থেকে ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার কাছু মিয়ার কাছে একটা হুমকি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তাতে বলা হয় যেকোনো প্রকারে বাজার যেন পরের শুক্রবার খোলা থাকে। না হলে মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে ক্যাপ্টেনের কাছে কারণ দর্শাতে হবে। ব্যস, বাজার  বসে যায় নির্দিষ্ট দিনে।  
 
স্থানীয় বাজারগুলো চালু রাখা খুব জরুরি। ওখানে শুধু লেন দেন বিক্রি বাটা হয় না, হয় আরো কিছু, যা থেকে স্থানীয় ইনফরমাররা নানা  খবরাখবর তুলতে পারে। তাছাড়া দেশি মুরগি বা খাসি ক্যাম্পের জন্য নেয়া যায়। মূল রেশন ময়মনসিংহ থেকে এলেও লোকাল নরম মাংস সাহেব সুবোরা খেতে পছন্দ করে। যদিও মাছ তথা মছলি তারা একদম পছন্দ করে না। বাজার খোলার পর এই সব সংগ্রহের কাজে আমিত্তিপুরের জব্বার প্রতি শুক্রবার সারাক্ষণ বাজারেই থাকে। সিভিল ড্রেসের একটা টিম, শান্তিবাহিনী না রাজাকার কে জানে, বাজারে ঘুরে বেড়ায় । তাদের কারো হাতে রাইফেল, কারো হাতে খাপে ঢোকানো সোর্ড বা লাঠি থাকে। বাজারের দোকানদার বা নিরীহ ক্রেতারা প্রথম দিকে কিছুটা ভড়কে গেলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মানিয়ে নেয়। কারণ তারা কিছু ক্ষতি করে না। বরং যেচে আলাপ-সালাপও করে। একদিন যোগেশ ডাক্তার তাদের সামনে পড়ে ।--ডাক্তর সাব আছুইন কেমন ? সামান্য তোতলা গো-বেচারা ডাক্তার থতমত খেয়ে অনেক কষ্টে বলে উঠে—অ অ আ আছি বালা—আছি বালা। --বালা আছুইন  না—হা হা—তো আফনাগো জাইতের হগলেইত গেছে গিয়া , আফনে অহনও আছুইন এইডা খুব বালা অইছে—রোগ বালাইএর লাগি ডাক্তার বদ্যিত লাগেই। ভয় ফাইন্যাযে আমরা আছি আফনাগো পাহারায়,---বলে দলটা হাসি মস্করা করতে করতে অন্য দিকে যায়।

অতঃপর সেদিন বাড়ি ফেরার পথে যোগেশ অনেক ভেবেও এদের কারোর মুখ মনে করতে পারলো না। অথচ জন্ম থেকে সে এই অঞ্চলেরই একজন। ডাক্তারির স্বার্থে অনেক দূরের মানুষের সঙ্গেও তার জানাশোনা। তবে--। যোগেশকে খুব চিন্তিত দেখালো। হায়রে, ঘাতক যখন পাহারার কাজে নামে তখন আমরা—। আমরার মাফুজ মিয়ার পোলা জব্বার কী কাম করে—কোথায় করে—এটাও একটা চিন্তা যে বাজারের মধ্যে বাহিনীর লোকদের সঙ্গে সেও ঘোরে-- সেইতো আমার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছিল। পোলাডা কী চায় কে জানে!

আমিত্তিপুরের জব্বার মোহনগঞ্জের ক্যাম্পের শুরু থেকেই আছে। ঝাড়ুদারের কাজ করে। থানা আর মিলিটারি ক্যাম্পের মধ্যে সারাদিন যাতায়াত করতে হয়। যোগাযোগের মাধ্যম সে। থানার বড়বাবুর কাছে প্রতিদিন তাদের গ্রাম সহ আশপাশের গ্রামের খবরাখবর সরবরাহ করতে হয়। জব্বার সত্যিই খুব এলেমদার ছেলে। সকালে কাজে বেরিয়ে গিয়ে তার বাড়ি ফিরতে রাত হয়। ক্যাম্পে তার খুব খাতির। তাতে  নিজের চাষাভুষাদের গ্রামে তার গুরুত্ব পাওয়ারই কথা। কিন্তু তার সমবয়সী বন্ধুরা তা মানে না। দেখলেই এখনও আগের মতই পুঙ্গির ভাই, চুতমারানি, হালা—ইত্যাদি সম্বোধনই করে থাকে। আবার উপর তলার খবরাখবরও জানতে চায়। উত্তরে দাঁত বের করে হাসলেও মনে মনে সে খুব কষ্ট পায়। মনে মনে সে ভাবে—তুমরা হালা আমারে বুন্দা পাইছ—জিগাইলা আর আম্মো কইলাম—ঐ সব বড় মাইনষের মুখের খবর—তরার লাহান চাষার বেডা চাষাদের দেওনের লাইগ্যা না। তবু সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে  একটা উত্তর সে দেয় যে---খবর আর কিতা—রাইখ্যসের লাহান লাশ এহেকটা--খালি খাওনের ফরমাইস—চারদিকের ফানি দেইখ্যা ভয় ফায়—আমারে দেখলে খালি কয়—লেড়কি লে আও—টেকা মিলেগা--লে লো সিগারেট ---। বলে হয়তো একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয়।

 কিন্তু এটা পরিষ্কার হয়না যে জব্বার তার সাহেবদের জন্য লেড়কির ব্যব্যস্থা করে কিনা। সন্দেহটা তাই থাকে। মফিজের ব্যাটা জব্বার এভাবেই একটা সন্দেহের বস্তু হয়ে যায়। এমনকি সাথে পাছে না থাকা সৈয়দ আকবর আলির কাছেও। গ্রামের পেছন দিকের ক্ষেতে  লাশ  পাওয়ার পর বেশি সাহস করে একদিন সে আকবর আলি সাহেবের বারান্দায় গিয়ে হাজির হয়। নিজের ইজিচেয়ারে চোখ বুজে আধশোয়া অবস্থায় থাকা আকবর আলি টের পান যে কেউ এসেছে।কিন্তু চোখ খুলে যাকে দেখলেন তাকে ঠিক চিনতে পারলেন না। বললেন—কেডা তুমি---/আজ্ঞে আমি মফিজ মিয়ার ব্যাটা জব্বার---/ও আইচ্ছা ভালা—তুমারেত আগে দেখচি মনে অইতাছেনা—থাক কই তুমি---/আজ্ঞে আমিত গেরামেই থাহি---/ও আইচ্ছা তা এইহানে কুন কামে—/আজ্ঞে লতিফ ভাইরে দেহিনা অনেকদিন, তেনা্র লগে একটা কাম আছিল—/তুমি কি লেহাপড়া কর—/আজ্ঞে না—/তুমি লেহাপড়া করনা,লতিফের লগে তুমার কাম,--- বুঝতাছিনা কি কইবার চাও,তয় হুন, লতিফত ঢাকায় থাইক্যা পড়তো , কিন্তু কয় মাস তার কুন খবর পাই না। তা এহন কও তুমার কামডা কি--। জব্বার এই পর্যন্ত শুনে একটু বেকায়দায় পড়ে গেল। এবার তার উঠে পড়তে হয়। --আজ্ঞে চাচা কাম তেমন কিছু না –লতিফ ভাই আহোক--ঠিক আছে--আইজ আমি যাই--। বলে আর দেরি না করে সে বারান্দা থেকে নেমে পড়লো। এবং তাড়াতাড়ি পা চালালো। আকবর আলি তার গমন পথের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন।

২০
২৫শে মার্চের সেই ঘটনার পর ক’মাস হয়ে গেল। ঢাকা সহ অন্যান্য যে সব স্থানে গণকবর খোঁড়া হয়েছিল সে গুলো এখন ঘাসে ঢেকে গেছে। পলি মাটির এই দেশে একটু জল পেলেই ঘাস জন্মায়। ঘাসের হয়তো জন্মানোর আনন্দ আছে। কিন্তু তার জানার কথা নয় যে   তার এই নবীনকান্তি বাড়ন্ত শরীরের তলে শায়িত আছে অগুনতি মানব শরীর।  খোলা বধ্যভূমির কথা অবশ্য আলাদা। পশুপাখিতে যা খাওয়ার খেয়ে গেছে । বাকি থাকে হাড়গোড় যা সেখানে খোলাই পড়ে আছে। হয়তো আরো কিছুদিন থাকবে। তারপর ঘাসেরা হয়তো সেগুলোও ঢেকে দেবে। ঘাসেরা তখনও হয়তো জানবে না যে এখানেও পড়েছিল গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত মানব জাতিরই এক অংশ। অনেকেই  হয়তো বলবে এদের কপালই ছিল খারাপ, হয়তো বলবে এরকম মৃত্যুই এদের নিয়তি ছিল, অনেকেই হয়তো বলবে সামরিক কর্তৃপক্ষের ছলনা বুঝতে কেন ভুল করলো, রাজনীতিতে ভুলের মাশুল কত মারাত্মক তা কি জানতো না? কেউ কেউ হয়তো বলবে যা হয়েছে তা  ন্যায্য।একটা দেশত আর ছিনিমিনি খেলার বস্তু নয়। যদিও এই সকল কথা বা বাক্যে কিছু যায় আসেনা। ভীষণ ভারি মৃত্যুর চাকাটি ঠিকই গড়াতে থাকে দেশ জুড়ে, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত। আর তার তলায় মানুষ লাশ হতে থাকে অবিরাম।  

মানুষের শরীরটা এমন যে গুলি করলে রক্ত বের হয়,কারো ঘিলু মাংস ইত্যাদি ছিটকে যায়,কারোর মল মুত্রও ঝরে—এ সব সাফ সুতরো করে কে— এত এত মুর্দার গায়ে হাত দিতে আর কারই বা ইচ্ছে হয়। ক্যাপ্টেনরা সিপাইদের অনীহাগুলো টের পায় তাই পরবর্তী কালে মাস কিলিং এসাইনমেন্টে শান্তি বাহিনীর সঙ্গে গুটি কয় মুদ্দোফরাসের নিযুক্তি দেয়া হয় । যারা লাশএর  ব্যবস্থা ঠিক মতোই করতো বলে দাবি করা হয়।

প্রথম রাতে, মানে ২৫ শে মার্চের রাতে কবর খোঁড়ার এই বাজে কাজের সমস্যাটা কারো মাথায় তেমন আসেনি। যুদ্ধের সময় এইসব  কাজের জন্য লোক থাকে। নির্দিষ্ট কাজ নির্দিষ্ট লোক। কিন্তু অপারেশন সার্চলাইটত আর শত্রু-দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। এটা নিজের দেশের সুস্বাস্থ্যের জন্য একটা ক্লিনজিং অপারেশন। যুদ্ধে ভয় থাকে। সেয়ানে সেয়ানে পাল্লা। হয় মর নয় মারো। এখানে শুধুই মারো। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনির কাছে এ এক অভিনব এসাইনমেন্ট। ভেরি সিম্পল। ধর মারো খাও লুটো, পারলে ফাক করো। তাতানো সৈন্যরা মধ্যরাতে বেশিমাত্রায় মদ খেয়ে নেমেছিল কিনা কে জানে—রাস্কেলগুলো হিউজ নাম্বার অফ পিপল কে ভোরের আলো ফোটার আগেই সট ডাউন করে ফেলেছে। ফেলেছে ভাল কথা—কিন্তু তারপর? এই ডেডবডির হ্যাপা কে সামলায়। শহরের মধ্যে ডেডবডি পড়ে থাকা ভেরি রিস্কি। মহামারী হতে পারে। এটাত শত্রু ভূ-খন্ড নয় যে লাশ ফেলে চলে গেলেই হলো। এখানে আমাদের ক্যান্টনমেন্ট আছে । আর লাশতো একটা দুটো নয়, শয়ে শয়ে। সামলানো বড় কঠিন।  তার পরের দিন তাই প্ল্যান একটু বদলে নেয়া হলো। ধরে ধরে প্রথমে গুলি নয়। এমন ভাব দেখানো যে তাদের এই কবর খোঁড়ার কাজের জন্য ধরা হয়েছে। তাদের দিয়ে গর্ত খোঁড়ানোর কাজটা করিয়ে নেয়া, তার পর  গতরাতের লাশগুলোকে টেনে এনে গর্তের মধ্যে ফেলা।রাইফেলের নলের মুখে যদিও কাজটা করানো তবু ভাব- ভঙ্গিতে একটা বাঁচার আশা জাগিয়ে রাখা। ব্লাডি বেঙ্গলি বলে একবারও গালি না দেয়া। সারাদিন এই কাজের মাঝে তাদের একটু বিশ্রাম এবং রিফ্রেশমেন্টের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। অবশেষে রাতের দিকে একটা অপূর্ণ গর্তের সামনে এনে তাদেরকে  গুলি করে ফেলে দেয়া হলো। ক্লান্ত, হতচকিত মানুষগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাজ সমাধা হয়ে গেল। সিপাইরা এবার নিজেরাই মাটি চাপা দেয়ার কাজটাও করে ফেলল দ্রুত।

এই ক’মাসে দেখা যাচ্ছে অপারেশন নেট ওয়ার্কে গ্রাউন্ড লেবেলে রাজাকার শান্তি বাহিনী ইত্যাদি রাখা হচ্ছে। সুক্ষ্ম গোয়েন্দা নেট  ওয়ার্কের টাইট বাঁধনে। কারণ এই রাজাকার মাজাকার যেই হোক সব শালা ব্লাডি বেঙ্গলি। যদিও গদ্দারির কোন রিপোর্ট তেমন নেই। ক্লিনজিং এর প্রাথমিক কাজ এখন ওরাই সারে। বড় কিছু করার থাকলে তবেই মিলিটারি নামে। মোহনগঞ্জের ভাটির দিকে তেমন ঝামেলা নেই। মানুষজন কিছুটা নির্বোধ প্রকৃতির। মিলিটারি আসার আগেই হিন্দুরা ঘরবাড়ি ছেড়ে অধিকাংশই চলে গেছে ইন্ডিয়ায় । এখন হাতে গোনা যে কয়টা আছে সেগুলো নাগালের মধ্যেই আছে। আন্তর্জাতিক চাপের জন্য কিছু হিন্দু ধরে রাখার দরকারও আছে। তাই কড়া নির্দেশ আছে হিন্দু সংরক্ষণ করার। দোসররা জানে নির্দেশ না পেলে মারা যাবে না। এখন যাদের খোঁজে সবাই অস্থির তারা হলো “মুক্তি”আর আওয়ামী লীগের আত্মগোপনকারী নেতা সদস্য। গোয়েন্দা রিপোর্টে এদের নাম ধামের লিস্ট আছে। কিন্তু মুক্তি দের ব্যাপার সবসময়ই ধোঁয়াশাপূর্ণ। হঠাৎ করে রাজাকার চার জনের মৃত্যু নিয়ে ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন খুব চিন্তিত।চিন্তিত থানার বড় বাবুও। এই ব্লাডি ওয়াটার কবে নামবে—জওয়ানরা বসে বসে বোর হয়ে যাচ্ছে—।

২১
নিয়তিরা রওনা হওয়ার পরদিন থানা থেকে একটা দল এলো গ্রামে। সবার ইউনিফর্মের প্যান্ট হাঁটু অবধি ভেজা। হাঁটতে হাঁটতে তারা শ্রীমন্তপুর পার হয়ে আমিত্তিপুরের দিকে গেল। রবীন্দ্র বাবুর ছোট ছেলে সুবল পুকুর পার থেকে দেখেছে তাদের। দলটা তাদের বাড়ি পার  হয়ে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরই সে উর্দ্ধশ্বাসে এক ছুটে বাড়িতে এসে ঢুকে পড়লো। খবরটা দেয়ার জন্য সে এঘর ওঘর তার মাকে খুঁজলো। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলনা। এ দিকে বড়ঘর রান্নাঘর সব খোলা। বুঝতে পারলো যে খবর আগেই পেয়ে গেছে সবাই। সে ধীরে ধীরে ঘরের পেছনের জঙ্গলে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সবাইকে পেল। সবাই বলতে বাবা মা ভাগ্নে আর ছোট এক বোন। কথা বলা বারণ—তবু তার মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেও তার গালটা নিঃশব্দে মুচড়ে দিলেন। অর্থাৎ গালে পিঞ্জা দিলেন। তাতে গাল ব্যাথায় টন টন করলেও মায়ের এই যুগপৎ আদর ও শাসন পাত্তা না দিয়ে সে মায়ের কানে কানে যা দেখেছে তাই বলতে লাগলো।  

কতক্ষণ এভাবে কেটেছে বা আরও কাটবে, কেউ জানে না, বা জানতে চায়ও না যেন। কারণ সবটাইত মৃত্যুর প্রহর গোনা। আর কান  খাড়া করা জন্তুর মত নিঃশব্দ জঙ্গলের অন্তঃস্থলে আরো গভীর কোন অন্তঃস্থল কামনা করা। যে অবস্থানে তারা আছে সেখান থেকে একটু এদিক সেদিক হলে  গাছ পালার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে তাদের বাড়ির পূব দিকের জঙ্গলের পথটা। একসময় সুবল এসে আবার একই ভাবে মায়ের কানে কানে  বললো--পুলিশ গুলা যাইতাছেগা—লগে মনে হয় আমিত্তিপুরের আকবর  চাচাও যাইতাছে--। রবীন্দ্রবাবুও জানলেন খবরটা। মনে হলো আকবর আলির খবরে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়লেন।  

একসময় ধীরে ধীরে সবাই বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। সুপ্রভা রান্না ঘরে গিয়ে নিভে যাওয়া উনুন ধরানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। রবীন্দ্রবাবু উঠোন থেকে বারান্দায় উঠে তার প্রিয় বেতের মোড়া্টায় বসে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন। জ্ঞাতি শরিকদের খা খা পরপর ঘর দুয়ার গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়াল করলেন কারোর বাড়ির উঠোনেই আর তুলসি গাছ নেই। বেদীগুলো ফাঁকা। লক্ষ্য করলেন তাদেরটাও নেই। সুপ্রভা হয়তো কোন আড়াল আবডালে পুঁতে রেখেছেন। এমন নয় যে এগুলো তিনি এই প্রথম দেখলেন। আগেও দেখেছেন। কিন্তু আজ যেন নতুন করে দেখলেন এবং উপলব্ধি করলেন তিনি সংসার জীবনে একজন ব্যর্থ মানুষ। তার অপরিসীম অজ্ঞতার পরিমাপ করার কে আছে নিজে ছাড়া! ভাবলেন বিকেলের দিকে একবার সাধুর বাড়িতে যাবেন।

কিন্তু সাধুর বাড়িতে আর যাওয়া হলোনা। যখন বের হতে যাবেন তখনই সালাউদ্দিন এসে উপস্থিত। তখন বিকেল গড়াচ্ছে। বড় ঘরের বারান্দায় অনেকদিন পর দুজনে বসলেন। এখনকার দিনকালে বাইরের কেউ এলে এ বাড়ির সবারই কেমন যেন মনে হয়  তারা বেঁচে আছে। তা না হলে এখনকার জীবন যাপনে তারাতো যন্ত্রবৎ শুধু মৃত্যুরই অপেক্ষা করে। সেখানে কথা খুব সামান্য এবং নিচু স্বরে সর্বদা।  দুই বন্ধুর কথার মাঝে একসময় সুপ্রভাও এসে একটা পিঁড়ি পেতে একটু তফাতে বসে। সালাউদ্দিন সৈয়দ আকবর আলিকে নিয়েই কথা বলছিলেন। এত বয়সের একজন মানুষকে থানায় নিয়ে যাওয়া নিয়ে আমিত্তিপুরেও যথেষ্ট আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সমস্যা হলো আকবর  আলির ছেলে লতিফকে নিয়ে। নানা কথা বা ধারণার মধ্য দিয়ে আজ সারাদিনে এটা সাব্যস্ত হয়েছে যে ঐদিনের গ্রামের পেছন দিকে ক্ষেতের হত্যা কান্ডটি ঘটিয়েছে লতিফের নেতৃত্বে একদল মুক্তি যোদ্ধা। এত কাছে এসে লতিফ কি আর বাড়ি যায়নি--নিশ্চই বাড়িতেও গেছে বা মাঝে মাঝে হয়তো যায়ও। লতিফ সম্পর্কে আকবর আলি ঠিক খবর পুলিশকে দিচ্ছেননা। দেবে্নই বা কী করে—শিক্ষিত মানুষ  --- সবই তিনি বোঝেন। সেই কারণে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হয়তো তাকে মিলিটারি ক্যাম্পেও হস্তান্তর করা হবে।   সালাউদ্দিনের এখন প্রশ্ন রবীন্দ্র কবে গ্রাম ছাড়বে। যে বিষয়টাতে রবীন্দ্রবাবু আপাতত চরম বিভ্রান্তির মধ্যে। একসময় সালাউদ্দিন প্রস্তাব দিলো যে তোমার বাড়িঘর জমিজমার দায়িত্ব আমার। যাওনের জন্য টাকা যা লাগব লইয়া যাও। দিন বদলাইলে সহি সালামতে ফিইরা আসবা। আসলে হিসেব নিকেশ পরে হইবো। নিশ্চিন্তে যাও। ভাবীও যখন চাইতাছেন—ছেড়াইনদের লগে একবার দেখা করনের--। এরপর রবীন্দ্র বাবুর আর কথা খাটে না। সন্ধ্যের মুখে সালাউদ্দিন চলেও গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল কী করবা কাইল জানাইও।  দেরী করনের উপায় নাই কইলাম।

গ্রামসমাজে রবীন্দ্রবাবুকে নিয়ে অমীমাংসিত কিছু বিষয় আছে। তার মধ্যে এই সময় যেটা সবচে আলোচ্য তা হলো যার চার চারটে ছেলে ইন্ডিয়ায় থাকে, তার ইন্ডিয়া যেতে এত চিন্তা কীসের। শুভাকাঙ্খী বন্ধুরাও তাই বলে। ছেলে হয়তো চার চারটা থাকে,হিন্দু হওয়ার কারণে সেখানে হয়তো তাদের প্রাণনাশ হবেনা, কিন্তু তারা কীভাবে কী অবস্থায় থাকে তাতো একমাত্র রবীন্দ্রবাবু নিজে ছাড়া আর কেউ   জানে না। বড় ছেলে সেখানে অতি কষ্টে দীর্ঘদিন এর ওর বাড়িতে থেকে  জীবন যাপন করে অবশেষে একটা কেরানীর চাকরি জুটিয়েছিল। তারপর করেছে বিয়ে । ছোট ছোট তিনটে বাচ্চা নিয়ে রয়েছে এখন তারও সংসার। বাকি ছেলেরাও সবাই তার উপরই গিয়ে পড়েছে। সঙ্গে ছিলেন তার মা। যদিও তিনি বছর দুই পরে মারা  যান। মেজটা এখনও বেকার। ছোট দুটি এখনো পড়াশোনা করে   শুনলাম। তাদেরত কোন রকম আর্থিক সাহায্য এখান থেকে করা হয়নি। এক চাকরির সামান্য অর্থে তাদের বেঁচে থাকা। বছর পাঁচেক আগে একবার গিয়ে অবস্থাটা তিনি নিজের চোখে দেখেও এসেছেন। তখন সরকারী সাহায্যের আশায় তার মা সহ  তিন ছেলে কিছুদিন রিফিউজি ক্যাম্পে ছিল । সে এক ভয়াবহ নরকবাস। না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। ফলে না পারতে একসময় সবাই গিয়ে বড় ছেলের কাছেই আশ্রয় নেয়। দারিদ্রও সঙ্গে যায়। কী করে সেই তিনিই আবার বাকি এই কজনকে নিয়ে তাদের বোঝা বাড়ান। শরণার্থী  ক্যাম্পে হয়তো গিয়ে উঠে আপাতত প্রাণ বাঁচানো যায়। কিন্তু সেটাই বা কতদিন সম্ভব হবে সংসার জীবনে একজন ব্যর্থ মানুষের পক্ষে। ফন্দি ফিকির তিনি জানেন না। কারোর কষ্ট লাঘবের ক্ষমতা তার নেই।
[চলবে...]

আপনার মন্তব্য