বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক মারা গেছেন

 প্রকাশিত: ২০২৬-০৭-০৫ ১৬:৩৯:০৬

সিলেটটুডে ডেস্ক:

বাংলা একাডেমির সভাপতি, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক মারা গেছেন।

রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার পুত্রবধূ প্রকাশক রাজিয়া রহমান জলি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মৃত্যুর আগে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল।

আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক এবং সমাজবিশ্লেষক হিসেবে দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চার ধারায় অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মা জাহানারা খাতুন। পারিবারিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা ফজলুল হক স্কুলজীবন থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখেন। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ ও নীলিমা ইব্রাহিমের মতো বরেণ্য শিক্ষাবিদদের সান্নিধ্য লাভ করেন, যা তার প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে ঋদ্ধ করে।

১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৬১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনের একটি বড় সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতায় অতিবাহিত করেছেন এবং বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

অধ্যাপনা ছাড়াও তিনি দেশের মানুষের মুক্তি, গণতন্ত্র ও অগ্রগতির প্রশ্নে সবসময় কলম ধরেছেন। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি ‘লোকায়ত’ নামক মননশীল পত্রিকা সম্পাদনা করছেন, যা সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এছাড়া আহমদ শরীফ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘ’-এর সভাপতি হিসেবে ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নয়নের জন্য ‘আটাশ দফা’ কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।

পারিবারিক জীবনে তিনি ফরিদা প্রধানের সঙ্গে দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন। তাদের দুই সন্তান- মেয়ে শুচিতা শরমিন ও ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন। শুচিতা শরমিন বর্তমানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, তার ছেলে জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন ২০১৫ সালে ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন, যা দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল।

তার লেখা বইয়ের সংখ্যা একুশটিরও অধিক। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘উনিশশতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’, ‘অবক্ষয় ও উত্তরণ’ এবং ‘মানুষের স্বরূপ’। এছাড়া বার্ট্রান্ড রাসেলের বেশ কিছু রচনার অনুবাদসহ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সাম্য’ গ্রন্থটির সম্পাদনাও তিনি করেছেন।

তার সৃজনশীল কর্ম ও রাষ্ট্রচিন্তার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৪), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৭) এবং অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (২০০৬)।

আপনার মন্তব্য